ক্ষণজন্মা এক খ্যাপাটে ফুটবলের ঈশ্বর, পর্ব-০২

ধরা পড়ে গেলেন ম্যারাডোনা, এবার?

ম্যারাডোনার খেলা দেখে কার্নেখো বললেন, আট বছর বয়সী কোনো ছেলের পক্ষে এই লেভেলের ফুটবল খেলা সম্ভব, এ-ও তুমি আমাকে বিশ্বাস করতে বলো? নিশ্চয়ই এই ছেলের বয়স বেশি। বয়স ভাঁড়িয়ে খেলতে এসেছে। কার্নেখোর এই অবিশ্বাসের পেছনে ছিল ডিয়েগোর ঐশ্বরিক ফুটবল। আর্জেন্টিনার ছোট্ট একটা ক্লাবের কোচ তিনি, ম্যারাডোনার অলৌকিক ফুটবল দেখে বিশ্বাস করতেই পারলেন না, কোনো মানুষের পক্ষে আট বছর বয়সে এত সুন্দর ফুটবল খেলা সম্ভব!

তবে হাল ছাড়লেন না ত্রোত্তাও। ম্যারাডোনার আইডি কার্ড নিয়ে এসে তুলে ধরলেন কার্নেখোর সামনে। আইডিতে স্পষ্ট লেখা, ডিয়েগো আরমান্ডো ম্যারাডোনা। বয়স: আট বছর। কার্নেখো একবার আইডির দিকে তাকান, আরেকবার তাকান মাঠে, যে মাঠে ডিয়েগো তখনো সাজিয়ে চলেছে সুন্দর ফুটবলের পসরা, যে পসরা এলোমেলো করে দিয়েছে কোচ কার্নেখোর সব হিসাব-নিকাশ।

তরুণ ডিয়েগো ম্যারাডোনা

হিসাব-নিকাশের পালা শেষ হলো। কার্নেখো ম্যারাডোনাকে তাঁর দলে নিয়ে নিলেন। ওই মুহূর্তে ডিয়েগোকে নিয়ে কার্নেখোর কল্পনা কতটুকু বড় ছিল, আমরা জানি না। তবে এই গাট্টাগোট্টা ছেলেটার জন্যই একদিন তাঁর নামটাও ইতিহাসে লেখা হয়ে যাবে, এইটা কি কার্নেখো স্বপ্নেও কোনো দিন ভেবেছিলেন?

আর্জেন্টিনার বুয়েনস এইরেসের ছোট্ট শহর ভিলা ফিওরিতো। সেখানেই ক্লাব ফুটবল। জন্মদিনে চাচার উপহার দেওয়া শখের ফুটবলই এনে দিল ছোট্ট ম্যারাডোনার প্রথম আয়। ফিওরিতোর সেই ধূসর জীবনে ম্যারাডোনা এনে দিলেন একটুখানি রঙের ছোঁয়া। সৃষ্টিকর্তা যখন ফুটবলের ইতিহাস পাল্টে দেওয়ার কাজে ব্যস্ত, ম্যারাডোনা পরিবারের চোখে তখন দিনবদলের স্বপ্ন। এই স্বপ্ন থেকেই ফুটবল শুধু ম্যারাডোনারই নয়, প্রিয় হয়ে উঠল ম্যারাডোনার মা আর বাবার কাছেও। কেননা, সেখান থেকেই ছোট্ট বয়সে পরিবার চালানোর উপার্জন করতে শুরু করেছিলেন ম্যারাডোনা।

কারখানা থেকে ফিরেই, ছোট্ট ডিয়েগোকে নিয়ে কার্নেখোর কাছে ট্রেনিংয়ে দিয়ে আসা চিতোরে নিত্যকার রুটিনই বানিয়ে ফেললেন। ছেলেকে একপ্রকার তুলেই দিলেন কোচ কার্নেখোর হাতে। এদিকে কার্নেখোও খুব ভালো করেই জানতেন, তিনি একটা হিরের টুকরো পেয়ে গেছেন। এখন এই হিরেটাকে পলিশ করে ঠিকঠাক গড়ে তুলতে পারলেই বদলে যাবে তাঁর জীবনও। কাজেই, কার্নেখোও পুরো মনোযোগ ঢেলে দিলেন ম্যারাডোনার ওপর।

তাঁকে বলা হয় ফুটবলের ঈশ্বর

ম্যারাডোনার ফুটবল নিয়ে কোনো প্রশ্ন বা সন্দেহ কারও মনে কখনো ছিল না। তবে শরীর নিয়ে প্রশ্ন সব সময়ই ছিল। ছোটখাটো, গাট্টাগোট্টা শরীর। মাথাটা বড়। দেখেই বোঝা যায়, ভালো খাবার বা যত্ন এই ছেলের ভাগ্যে জোটেনি। ঝাঁকড়া চুলের আড়ালে মলিন, ক্লান্ত মুখ। উচ্চতাও খুব একটা বেশি নয়। ফুটবলটা দিন শেষে শরীরেরই খেলা। ফিটনেসের খেলা। এই ছোট্ট শরীর কি পারবে, শীর্ষ পর্যায়ের ফুটবলের চাপ নিতে? কার্নেখোর মনে ভয়, প্রশ্ন এবং সন্দেহ।

কিন্তু তিনিই-বা কী করতে পারেন? আর্জেন্টিনার ছোট্ট একটা ক্লাবের বাচ্চাদের কোচ তিনি। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত ব্যাংকে ঝাড়ু দেওয়ার কাজ করেন। বিকেলের অবসরটুকু দেন ফুটবলে। দৈনিক আয় খুব বেশি নয়। সেই যৎসামান্য আয় থেকেই তিনি চেষ্টা করেন, ডিয়েগোর জন্য একটু ভালো খাবারের ব্যবস্থা করতে। কিন্তু টানাটানির সংসারে কত দিনই-বা সম্ভব? কার্নেখো বিকল্প উপায় ভাবতে শুরু করেন।
ভাবতে ভাবতেই তাঁর মনে পড়ে বন্ধু কাচো পালাদিনোর কথা। পালাদিনো একজন চিকিৎসক। তিনি বক্সার ও অ্যাথলেটিকদের বিভিন্ন ভিটামিন পুশ করে শারীরিক বৃদ্ধি নিশ্চিত করতেন। এবার কার্নেখো ম্যারাডোনাকেও নিয়ে গেলেন তাঁর কাছে।

পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বকালের সেরা একজন ফুটবলারকে ছোটবেলায় পর্যাপ্ত খাবারের অভাবে শরীরে স্টেরয়েডের সিরিঞ্জ ঢোকাতে হয়েছিল

ম্যারাডোনার শরীরে ঢুকল ভিটামিনের প্রথম ইনজেকশন।


পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বকালের সেরা একজন ফুটবলারকে ছোটবেলায় পর্যাপ্ত খাবারের অভাবে শরীরে স্টেরয়েডের সিরিঞ্জ ঢোকাতে হলো, এর চেয়ে বড় ট্র্যাজেডি আর কী হতে পারে?

কার্নেখো চেয়েছিলেন ম্যারাডোনাকে লুকিয়ে রাখতে। কিন্তু পুরো পৃথিবী একদিন যাকে চিনবে ফুটবলের সমার্থক শব্দ হিসেবে, তাঁর পক্ষে কি আর লুকিয়ে থাকা সম্ভব? পদ্ম ফুল, সে যত গোবরেই থাকুক, একদিন কি সে হুট করে কোনো এক মুগ্ধ পথিকের চোখে পড়ে যায় না?

ম্যারাডোনাও অমন করেই চোখে পড়ে গেলেন।


এক শনিবার আর্জেন্টিনার একটা জনপ্রিয় চ্যানেলে অনিবার্য কারণে নির্ধারিত অনুষ্ঠান বাতিল হলো। চ্যানেলের প্রযোজকের মাথায় হাত। ওই সময়ে দর্শকদের কী দেখানো যায়? হঠাৎ প্রযোজকের মাথায় চলে এল ডিয়েগো ম্যারাডোনার কথা। ওই সময়টুকু ডিয়েগোর বল পায়ে কারিকুরি দেখালে কেমন হয়?

যে-ই ভাবা, সেই কাজ। এক পায়ে বোতল, আরেক পায়ে ফুটবল আর কমলালেবু। টেলিভিশনের ক্যামেরার সামনে ম্যারাডোনা অবলীলায় দেখিয়ে গেলেন তাঁর ফুটবল-জাদু। আর্জেন্টিনার হাজারো মানুষ শনিবারের সেই বিকেলে তন্ময় হয়ে দেখেছিল ম্যারাডোনার ফুটবল-জাদু।

তখনো তারা জানত না, আজ থেকে ১৬ বছর পর এমনই এক রোববারে আবারও এই ছোট্ট ডিয়েগো ম্যারাডোনা টেলিভিশনের সামনে হাজির হবেন। সেদিনের ম্যারাডোনাতে শুধু আর্জেন্টিনা না, মুগ্ধ হবে পুরো বিশ্ব!

ছোটবেলায় ম্যারাডোনা অনেক কিছুই পাননি। সচ্ছলতা পাননি, শৌখিনতা পাননি, পাননি সহজ কোনো শৈশব বা কৈশোরও। তবে এত এত না পাওয়া সৃষ্টিকর্তা কোটি গুণে পুষিয়ে দিয়েছিলেন আরেক দিক থেকে। সেটা হলো, মানুষের ভালোবাসা। একেবারে ছোটবেলা থেকে মৃত্যুপর্যন্ত ম্যারাডোনার জীবনে স্থির বলতে কেবল একটা জিনিসই ছিল, তা আর কিছুই নয়, সাধারণ মানুষের ভালোবাসা। এই একটা জায়গাতে তিনি ছিলেন মুকুটহীন সম্রাট, সবার হৃদয়ের রাজপুত্র।

তিনি ছিলেন মুকুটহীন সম্রাট, হৃদয়ের রাজপুত্র

শনিবারের টেলিভিশন শোতে ঘটনাচক্রে একদিন গিয়েছিলেন। কিন্তু সেই একদিন আর একদিন থাকল না। দর্শকেরা দাবি করে বসল, এমন ভয়ংকর সৌন্দর্য একদিন দেখে তাদের হবে না, ডিয়েগোকে তাঁরা প্রতি শনিবারই চান।
টিভির পর্দার এই জনপ্রিয়তা প্রতিফলিত হলো মাঠেও।

জুলাই ১৯৭০। চলছে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দুই দল—বোকা জুনিয়র আর আর্জেন্টিনাস জুনিয়রের ম্যাচ। ম্যারাডোনা তখন অনেক ছোট। তাই স্বাভাবিকভাবেই সুযোগ পাননি। তবে ঠিকই নিজের খেল দেখিয়েছেন। হাফ টাইমের খেলা শেষ হলো। সেদিন গ্যালারিতে বসে থাকা দর্শকেরা হয়তো ভেবেছিলেন, ওই সময়টুকুতে একটু বিশ্রাম নেবেন।

কিন্তু না, ওই বিরতির সময়টুকু দর্শকের আর বিশ্রাম নেওয়া হয়নি, বরং ওই সময়টুকুতেই তাঁরা অসম্ভব সুন্দর এক ফুটবলীয় সৌন্দর্যের মুখোমুখি হয়েছিলেন।
ম্যাচ কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে ম্যারাডোনা বল পায়ে ঢুকে পড়লেন মাঠে। সবাই অবাক হয়ে দেখল, ঝাঁকড়া চুলের এক পিচ্চি ছেলের বাঁ পায়ে একটা ফুটবল। এবং সেই ফুটবল যেন তাঁর একান্তই বাধ্যগত। লম্বা সময় ধরে পায়ের ওপর ফুটবল ধরে রাখা, ড্যাজলিং করা বা মাথার ওপর বল নিয়ে তোলা ছন্দ! যেন ম্যারাডোনার পা একটা চুম্বক, যে চুম্বকের আকর্ষণ ভেদ করে চলে যাওয়ার সাধ্য ফুটবলের বাবারও নেই।

যেন ম্যারাডোনার পা একটা চুম্বক, যে চুম্বকের আকর্ষণ ভেদ করে চলে যাওয়ার সাধ্য ফুটবলের বাবারও নেই

এতক্ষণ ফুটবলের খেলা দেখা মাঠভর্তি দর্শক এবার দেখল ফুটবলের জাদু। এই জাদু দেখে আনন্দে হর্ষধ্বনি করে উঠল পুরো স্টেডিয়াম। সেদিন আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনস এইরেসের সেই স্টেডিয়ামের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া কোনো নীরস পথিক হয়তো তখন বিরক্ত হয়ে ভাবছিলেন, বিরতির সময়েও এত চিৎকার করে? এরা কি পাগল নাকি? এই প্রশ্নের উত্তর আমরা জানি না। শুধু জানি, একেবারে ছোটবেলা থেকেই ম্যারাডোনা মানুষকে মুগ্ধ করতেন না, একেবারে পাগল করে দিতেন।

বিরতির সময় শেষ হয়ে গেল। ম্যাচ রেফারি মাঠে ঢুকে বাঁশিতে ফুঁ দিলেন। ম্যারাডোনাকে বললেন, ‘এবার তুমি মাঠ থেকে বের হও, আমি খেলা শুরু করব।’ ম্যারাডোনা বল পায়ে নিয়েই মাঠ থেকে বের হয়ে আসতে লাগলেন। আর তখনই গ্যালারি থেকে ভেসে এল তীব্র প্রতিবাদ। না, দর্শক কোনোভাবেই ডিয়েগোকে মাঠের বাইরে বের করে দেওয়া মানবেন না।

শেষমেশ ম্যাচ রেফারি দর্শকদের দাবির কাছে হার মানলেন। ম্যারাডোনার জায়গা হলো সাইড বেঞ্চে। প্লেয়ারদের সঙ্গে। মাঠ থেকে তাঁকে সেদিন বের হতে হয়নি।
আগেই বলেছি, সৃষ্টিকর্তা মানুষের ভালোবাসা দেওয়ার বেলায় ডিয়েগোর প্রতি বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করেননি। তখন থেকে ২০ বছর পর, ফিফা যখন ডিয়েগোর ওপর নিষেধাজ্ঞা দেবে, তখনো, সাধারণ মানুষ ঠিক এভাবেই প্রতিবাদ জানাবে। তাদের প্রিয় ডিয়েগোর ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা তাঁরা মানতে চাইবেন না।

বুয়েনস এইরেসের গ্যালারির এই প্রতিবাদ একটা সময় আটলান্টিক পার হয়ে এসে পড়বে এশিয়ার ছোট্ট একটা দেশ বাংলাদেশের রাজপথেও। ম্যারাডোনাকে নিষিদ্ধের প্রতিবাদে ফিফার বিরুদ্ধে একদিন অজানা, অচেনা একটা দেশের মানুষ রাস্তায় পর্যন্ত নেমে পড়বে। সাধারণ মানুষের এমন নিঃশর্ত ভালোবাসা, এমন অন্ধ সমর্থন ফুটবল ইতিহাসের আর কে কবে পেয়েছে?

সাধারণ মানুষের এমন নিঃশর্ত ভালোবাসা, এমন অন্ধ সমর্থন ফুটবল ইতিহাসের আর কে কবে পেয়েছে?

ক্যান্ডেলা ট্রেনিং গ্রাউন্ড। মুখোমুখি বোকা জুনিয়র্স আর সেবোলিতা জুনিয়র টিম।
ম্যারাডোনা সেবোলিতার খেলোয়াড় হলেও এই ম্যাচে খেলা তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না। কারণ, ম্যারাডোনা তখনো অনেক ছোট। কাজেই, বৈধ পথে ম্যারাডোনাকে এই ম্যাচে খেলানো সম্ভব না। কিন্তু কার্নেখো বৈধ-অবৈধর ধার ধারলেন না। বোকা শক্তিশালী দল। এই দলের বিপক্ষে জয় তার চাই-ই চাই। আর এই জয় শুধু একটা উপায়েই সম্ভব। যেকোনো মূল্যে ডিয়েগোকে মাঠে নামানো।

মনট্যানিয়া নামের এক খেলোয়াড়ের নাম ভাঁড়িয়ে, স্বাক্ষর নকল করে ডিয়েগোকে ঢুকিয়ে দেওয়া হলো দলে। ম্যাচ রেফারি কোনো সন্দেহ করলেন না। ম্যারাডোনা চললেন দলের সঙ্গে। তবে প্রথম হাফে তাঁকে মাঠে নামানো হয়নি। সম্ভবত নিতান্তই বাধ্য না হলে ম্যারাডোনাকে মাঠে নামানোর প্ল্যান কার্নেখোর ছিল না।
প্রথম হাফের খেলা শেষ হলো। স্কোর লাইন বোকা জুনিয়র্স ৩-০ সেবোলিতা। তিন গোল পিছিয়ে থেকে ৪৫ মিনিটে ম্যাচ বের করে নিয়ে আসা মুখের কথা নয়। কার্নেখো এবার বের করলেন তাঁর তুরুপের তাস। মনট্যানিয়ার জার্সি গায়ে মাঠে নামলেন ম্যারাডোনাকে।

ডিয়েগো ম্যারাডোনা

মনে রাখতে হবে, ম্যারাডোনা তখন বাচ্চা ছেলে। অথচ খেলা চলছে সিনিয়রদের। বয়স কমের জন্য যার এই ম্যাচে খেলারই যোগ্যতা ছিল না, সেই তাঁর কাঁধেই কোচ তুলে দিলেন ম্যাচ বাঁচানোর দায়িত্ব। একই সঙ্গে, এই ম্যাচের মাধ্যমেই ম্যারাডোনার বিতর্ক এবং নিয়ম ভাঙার হাতেখড়ি হলো, যা বিতর্ক-পরবর্তী ৫০ বছরে ম্যারাডোনার পিছু ছাড়বে না, লেগে থাকবে ওই ফুটবলের মতোই।

ফার্স্ট হাফেই তিনটা গোল দিয়ে ফেলার পর বোকা জুনিয়র্সের কোচ স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন।

প্রথম হাফেই তিন গোল করে ম্যাচ বের করে ফেলা যা-তা ব্যাপার নয়। নেক্সট হাফটা তো অন্তত নির্ভার থেকে খেলা যাবে। বোকা জুনিয়র্স আর্জেন্টিনার দেশসেরা ক্লাবগুলোর একটা। এই দলকে ৪৫ মিনিটে তিন গোল দেওয়ার মতো দল আর্জেন্টিনাতে আছে নাকি?

সেকেন্ড হাফের খেলা শুরু হলো। বোকার কোচ অবাক হয়ে দেখলেন, ঝাঁকড়া চুলের একটা ছেলের দৌড়, অসাধারণ ড্রিবলিং, দুর্দান্ত জ্যাগলিং। তিনি আরও দেখলেন গোল। এরপর আরেকটা গোল। তারপর আরও একটা গোল।

ডিয়েগো ম্যারাডোনা

নির্ভার খেলার বদলে চোখের সামনে তিনি দেখলেন ধ্বংস। দেখলেন ফুটবলের ভয়ংকর সুন্দর দিক। দেখলেন, একটা ছেলের কাছে তাঁর পুরো দল, পুরো ট্যাকটিক্সের সমূলে ধ্বংস হয়ে যাওয়া। অবাক, বিস্মিত বোকা জুনিয়র্সের কোচের হিসাব মিলল না। তিনি রেফারির খাতায় আতিপাতি করে খুঁজতে শুরু করলেন নাম, দেখলেন সেখানে লেখা আছে মনট্যানিয়া, অথচ তাঁর সন্দেহ যায় না। বিপক্ষ দলের সঙ্গে খেলাতে হোমওয়ার্ক করে আসাই স্বাভাবিক। সেই হোমওয়ার্কে তিনি এত বড় ভুল করে বসলেন?
ঠিক সেই সময়, হ্যাটট্রিক করার আনন্দেই হোক, আর নিশ্চিত হেরে যাওয়া ম্যাচ ড্র করতে পারার খুশিতেই হোক, সেবোলিতা জুনিয়র টিমের একজন উত্তেজনায় ‘শাবাশ ডিয়েগো’ বলে চিৎকার করে উঠলেন। কাগজে-কলমে ডিয়েগো যে সেদিনের ম্যাচে নেই, আজকের ম্যাচে যে ডিয়েগো খেলছে মনট্যানিয়ার মুখোশ পরে, সেটা বেমালুম ভুলে তিনি জোরে ম্যারাডোনার নাম ধরে ডেকে উঠলেন! আর সবটা ধরা পড়ে গেল। এই একটা শব্দই বোকা জুনিয়র্সের কোচের সব অঙ্কের সমাধান করে দিল। তিনি দাঁতে দাঁত চেপে ম্যাচ শেষের অপেক্ষা করতে শুরু করলেন।

মায়ের সঙ্গে ম্যারাডোনা

বয়স ভাঁড়ানো জিনিসটা আর্জেন্টিনার ফুটবলে অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। কাজেই, এর বিরুদ্ধে ফেডারেশনও অনেক বেশি কঠোর ছিল। কোনো প্লেয়ারের বয়স লুকানোর কোনো প্রমাণ পাওয়া গেলেই কপালে জুটত সরাসরি নিষেধাজ্ঞা। নিয়মটা বোকা জুনিয়র্সের কোচেরও নিশ্চয়ই অজানা ছিল না।

নিশ্চিতভাবে জেতা ম্যাচ অনিয়মের কারণে তাঁকে ড্র করতে হলো। ম্যারাডোনার হ্যাটট্রিকে ম্যাচের স্কোরলাইন হলো ৩-৩। ম্যাচ শেষে সবাই যখন মাঠের আনুষ্ঠানিকতায় ব্যস্ত, বোকার কোচ আস্তে করে বের হয়ে পড়লেন। ম্যাচ শেষ হয়েছে, কিন্তু তখনো কার্নেখোর সঙ্গে তাঁর কিছু হিসাব মেলানো বাকি।

ধরা পড়ে গেলেন ম্যারাডোনা

হিসাবের শুরুতেই বোকার কোচ বললেন, আজকে যে প্লেয়ারটা হ্যাটট্রিক করল, সে কে? কার্নেখো বললেন, মনট্যানিয়া। চোখ মুখ শক্ত করে বোকা জুনিয়র্সের কোচ বললেন, ও যদি মনট্যানিয়া হয়, তাহলে আমি অন্য গ্রহ থেকে আসা এলিয়েন। কার্নেখো বুঝলেন, তিনি ধরা খেয়ে গেছেন। এবং এই মুহূর্তে তিনি শুধু নিজের কোচিং ক্যারিয়ারটাকেই খাদের কিনারে নিয়ে দাঁড় করাননি, বরং নিজের দল, আর ডিয়েগো ম্যারাডোনা নামের ওই হিরের টুকরা ছেলেটার ক্যারিয়ারকেও ফেলে দিয়েছেন খাদের কিনারে।

কার্নেখো কথা বলার চেষ্টা করেন। পারেন না। তাঁর কথা আটকে যায়।
ওদিকে বোকা জুনিয়র্সের কোচের ঠোঁটের কোণে একটু হাসি। মাঠের প্রতিশোধ তবে কি তিনি নিতে চলেছেন মাঠের বাইরে?

বি.দ্র: তিন পর্বে ম্যারাডোনার জীবনের তৃতীয় ও শেষ পর্ব প্রকাশিত হবে ১৬ ডিসেম্বর, পরবর্তী শুক্রবার সকাল ১০টায়।