
‘চোখের সামনে একটা রেকর্ড ভেঙে গেল!’ বলছিলেন শাফকাত সামিন আনোয়ার।
স্টেডিয়ামে সেদিন প্রায় ৭০ হাজার দর্শক। মুখোমুখি আর্জেন্টিনা ও অস্ট্রিয়া। বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনটি নিজের করে নিয়েছিলেন লিওনেল মেসি। ফটোসাংবাদিক হিসেবে সেদিন মাঠেই দায়িত্বে ছিলেন শাফকাত। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসভিত্তিক দৈনিক দ্য ডালাস মর্নিং নিউজ–এর হয়ে এবার ফুটবল বিশ্বকাপ কাভার করছেন তিনি।
শাফকাতের বেড়ে ওঠা ঢাকায়। পড়েছেন সেন্ট যোসেফ হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলে। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব হাওয়াইয়ের মানোয়া ক্যাম্পাসে মিডিয়া কমিউনিকেশন ও ব্যবসায় প্রশাসন—দুই বিষয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন তিনি।
নেদারল্যান্ডস বনাম জাপানের খেলায় ছবি তোলার দায়িত্ব পেয়েছিলেন শাফকাত। তবে মাঠে নয়, মাঠের বাইরে ফ্যানদের উদ্যাপনের চিত্র ক্যামেরাবন্দী করার ভার পড়েছিল তাঁর ওপর। শাফকাত বলছিলেন, ‘নেদারল্যান্ডসের সমর্থকেরা রীতিমতো মাথা থেকে পা পর্যন্ত কমলা রঙে ঢেকে আসে। সাগরের পানির মতো স্টেডিয়ামে ঢোকে। দেখে মনে হয় কমলা সমুদ্র। আমার সৌভাগ্য, এই দৃশ্য আমি দেখেছি!’
ইংল্যান্ড-ক্রোয়েশিয়ার ম্যাচের ছবিও তুলেছেন শাফকাত। এটিই ছিল মাঠ থেকে কাভার করা তাঁর প্রথম বিশ্বকাপ ম্যাচ। গোলের পর হ্যারি কেনের হাত মেলে উদ্যাপনের চিত্র ক্যামেরায় বন্দী করেছেন, পুরো বিষয়টিই নাকি অবিশ্বাস্য লাগছিল শাফকাতের কাছে। তিনি বলছিলেন, ‘চোখের সামনে বেলিংহামকে দেখলাম এক ফিট দূর থেকে দৌড় দিল। তখন টের পেলাম, ও আচ্ছা, আমি সত্যিই ওয়ার্ল্ড কাপ গেমে আছি!’
শাফকাতের আক্ষেপ আছে আর্জেন্টিনা-অস্ট্রিয়া ম্যাচ নিয়ে। মেসির রেকর্ড গড়া প্রথম গোলটি ক্যামেরায় ধরতে পারেননি তিনি। খেলা শুরুর ২৪ ঘণ্টা আগে সাংবাদিকদের অনলাইনে মাঠে আসন বরাদ্দ নিতে হয়। ৪০ সেকেন্ডের মধ্যে আসন পছন্দ করতে হয়। যথাসময়েই তিনি ওয়েবসাইটে ঢুকেছিলেন। তবে আসন বেছে নেওয়ার আগেই তাঁকে ওয়েবসাইট থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল। পরে ঢুকে তিনি আর পছন্দসই আসনটি পাননি। প্রথমার্ধে মেসি যে পাশে গোল দেয়, তিনি ছিলেন তার উল্টো দিকে। তবে দ্বিতীয় গোলটি ধরেছেন নিজের ক্যামেরায়। প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়ের পায়ের ফাঁক গলে মেসির শট নিখুঁতভাবে ধরা পড়েছে শাফকাতের ক্যামেরায়।
মেসিকে ক্যামেরায় ধরতে বেশ বেগ পেতে হয়, সেটাও বললেন এই আলোকচিত্রী, ‘মেসি ফড়িংয়ের মতো দৌড়ায়। এত ফাস্ট যে ধুম করে ক্যামেরা স্কিপ করে যায়।’
শাফকাত জানালেন, ফটোসাংবাদিক হিসেবে ইদানীং মাঠে বেশ চাপের মধ্যে থাকতে হয়। হাইড্রেশন ব্রেকে অফিসে ছবি পাঠাতে হয়। খেলার মুহূর্তগুলো ধরার পাশাপাশি ব্যতিক্রম কিছু ক্যামেরায় ধারণ করার চ্যালেঞ্জও থাকে।
ভিডিও কনফারেন্সিং প্ল্যাটফর্ম জুমে শাফকাতের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। নিজের পুরোনো একটি ডায়েরি দেখালেন তিনি। বাংলাদেশি ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান, মাহমুদউল্লাহ থেকে শুরু করে স্প্যানিশ ফুটবলার ডেভিড ভিয়া—পাতায় পাতায় খেলোয়াড়দের ছবি সাঁটানো। শাফকাত জানালেন, সবই প্রথম আলো থেকে কেটে সংগ্রহ করা।
অষ্টম শ্রেণি থেকে ‘পেপার কাটিং’ সংগ্রহ শুরু করেছিলেন তিনি। মূলত পছন্দের ক্রিকেটার আর ফুটবলারদের ছবি। শাফকাত বলছিলেন, ‘তখন তো ক্যামেরা ছিল না। এই পেপার কাটিংগুলো ছবি তোলার প্রতি আমার আগ্রহের একটা বহিঃপ্রকাশ বলতে পারেন। এই সংগ্রহ থেকেই ছবি দেখার শুরু।’
মাধ্যমিক পরীক্ষার পর লম্বা ছুটি পান শাফকাত। মায়ের কথায় ভর্তি হন পাঠশালা সাউথ এশিয়ান মিডিয়া ইনস্টিটিউটে। সেখানে তিন মাসের একটি মৌলিক ফটোগ্রাফি কোর্স করেন তিনি। নিজের ক্যামেরা ছিল না। ভাড়া করা, কিংবা বন্ধুদের ক্যামেরায় ছবি তুলতেন শাফকাত। কলেজে পড়ার সময় কয়েকটি প্রদর্শনীতেও অংশ নিয়েছিলেন।
প্রথম নিজের একটা ক্যামেরা হাতে পান উচ্চমাধ্যমিকের পর। শাফকাত বলছিলেন, ‘টিফিনের জমানো টাকার সঙ্গে ঈদের সালামির টাকা ছিল। জিপিএ–৫ পাওয়ায় আত্মীয়স্বজনেরা কিছু টাকা উপহার দিয়েছিলেন। বাবাও দিয়েছিলেন। সব মিলিয়েই ক্যামেরাটা কেনা।’
আলোকচিত্রী হবেন, এমনটা ভাবনায় ছিল না শাফকাতের। ছবি তোলা ছিল কেবলই শখ। তবে ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে পড়তে গিয়ে এর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে যান। প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয়ের পত্রিকার জন্য ছবি তুলতেন। পরে ধীরে ধীরে নিজের একটা ‘পোর্টফোলিও’ দাঁড়িয়ে যায়।
করোনা মহামারির সময় যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদ সংস্থাগুলো ফ্রিল্যান্স আলোকচিত্রী খুঁজছিল। এই সুযোগটাই কাজে লাগান শাফকাত। কাজ শুরু করেন। পরে শিক্ষানবিশি করেছেন আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এপিতে। এ নিয়ে অবশ্য বেশ ভয়ে ছিলেন শাফকাতের মা। ভেবেছিলেন ছেলেকে হয়তো মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের ছবিও তুলতে হবে। যুদ্ধের ছবি না তুললেও রাজনীতি–সংশ্লিষ্ট ছবি তুলতে ভালোবাসেন শাফকাত। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস ভবন ক্যাপিটল হিলে দাঙ্গার ছবি তুলেছিলেন তিনি। ২০২১ সালে শাফকাত যোগ দেন দ্য ডালাস মর্নিং নিউজ–এ। তিনি জানালেন, খুব পরিকল্পনা করে ফটোসাংবাদিকতায় তিনি আসেননি। সময়ের ওপর ছেড়ে দিয়ে শুধু নিজের কাজটি করে গেছেন।
‘অধিনায়কেরা যে আর্মব্যান্ডটা পরেন, ওখানে লেখা থাকে ফুটবল ইউনাইটস দ্য ওয়ার্ল্ড। অর্থাৎ ফুটবল সারা বিশ্বকে এক করে। আমার বেলায়ও কথাটা সত্য। ফুটবল আমাদের পুরোনো বন্ধুদের এক করে দিয়েছে।’ বলছিলেন শাফকাত। সেন্ট যোসেফে পড়ার সময় ফুটবল নিয়ে বন্ধুদের তর্কবিতর্ক হতো। সবাই ছড়িয়ে পড়েছেন একেক জায়গায়। তবে এখন আবার ভিডিও কলে যুক্ত হন। জমে ওঠে পুরোনো আড্ডা। বিখ্যাত খেলোয়াড়দের কাছ থেকে দেখার গল্প শোনান শাফকাত। বলছিলেন, ‘ছবি যখন আপলোড দিই, বন্ধুরা সেটা নিয়ে মাতামাতি করে। গর্ব করে। বলে যে আমার ছোটবেলার বন্ধু শাফকাত এই ছবি তুলেছে।’
শাফকাত হোয়াইট হাউসের ফটোগ্রাফার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের ছবি তুলতে চান। অ্যাশেজ সিরিজ, উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ এবং পুরো ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ মৌসুম ক্যামেরাবন্দী করার ইচ্ছে আছে তাঁর। তবে বরাবরের মতোই সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে চান না। কারণটা হয়তো বুঝতে পারবেন শাফকাতের এই বক্তব্য থেকে—‘আমার প্রিয় চলচ্চিত্রগুলোর একটি দ্য নেমসেক। প্রথম বর্ষে ছবিটা দেখেছিলাম। সেখানে একটি সংলাপ আছে, “প্যাক ইয়োর পিলো অ্যান্ড ব্ল্যাংকেট অ্যান্ড ট্রাভেল দ্য ওয়ার্ল্ড। ইউ ওন্ট রিগ্রেট ইট।” পেছনে তাকিয়ে বলতে পারি, সত্যিই কখনো আফসোস হয়নি।’