সবাই আমাদের বউ–শাশুড়ি ভাবত

সিদ্দিকা কবীর ছিলেন একজন রন্ধনশিল্পী, পুষ্টিবিদ ও অধ্যাপক। তাঁর সঙ্গে দীর্ঘদিন সিদ্দিকা কবীর’স রেসিপি নামে একটি অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেছেন উপস্থাপক শারমিন লাকি। অগ্রজকে নিয়ে লিখেছেন তিনি।

সিদ্দিকা কবীর’স রেসিপি অনুষ্ঠানের দৃশ্য
ছবি: সংগৃহীত

সিদ্দিকা কবীর বাইরে থেকে দেখতে যতটা কঠিন, ভেতরে ছিলেন ঠিক ততটাই নরম দিলের মানুষ। তাঁর সেই মনের খোঁজ পেতে আমাকে কিছুটা সময় নিতে হয়েছিল। আর ‘সিদ্দিকা কবীর’স রেসিপি’ অনুষ্ঠানটি যখন করি, তখন আমি নিজেও অনেক অপরিণত ছিলাম। তাঁর কাছ থেকে অনেক কিছু নেওয়ার ছিল। তখন বুঝতে পারিনি। এখন যত পরিণত বয়সের দিকে এগোচ্ছি, ততই বুঝতে পারছি, ‘আমি হারায়েছি কারে।’

স্কুলে গার্হস্থ্য অর্থনীতি আমার পাঠ্য ছিল। আর সে কারণে সিদ্দিকা কবীর নামটির সঙ্গেও পরিচয় ছিল। ‘সিদ্দিকা কবীর’স রেসিপি’তে যখন সিদ্দিকা আপার সহযোগী হয়ে কাজ করার সুযোগ পেলাম, আমার জীবনে একই সঙ্গে দুটি ঘটনা ঘটল: আপার সঙ্গে কাজ আর টেলিভিশনে প্রথম উপস্থাপনা। টেলিভিশন উপস্থাপনা নিয়েই বেশি উত্তেজিত ছিলাম। তখনো বুঝতে পারিনি সিদ্দিকা কবীর নিজেই কত বড় প্রতিষ্ঠান। তখন বিয়েবাড়িতে উপহারের তালিকায় থাকত আপার রান্না খাদ্য পুষ্টি। বাঙালি বিদেশে যাচ্ছে, সানন্দে তার লাগেজে চালান হয়ে যেত এই বই। অবশ্য ইউটিউবের এই যুগে, রান্না খাদ্য পুষ্টি নামের সেই অমর সৃষ্টির গুরুত্ব এই প্রজন্ম ঠিক কতটা বুঝবে, বলা কঠিন।

রবীন্দ্রনাথের ‘কৃপণ’ কবিতাটি পড়তে গেলেই তাঁর কথা মনে পড়ে যায়। আমি তো সেই কৃপণ মানুষ, যে এই অথই সাগর থেকে কিছুই নিতে পারিনি। বুঝতে পারিনি পরিশীলিত, মার্জিত এই মানুষটির কাছে কত–কী জানার আছে, বোঝার আছে।

বেকিংয়ের প্রতি আগে থেকেই আগ্রহ ছিল। যদিও এই অনুষ্ঠান করার আগে বেকিংয়ের তেমন কোনো অভিজ্ঞতাই ছিল না। সিদ্দিকা আপার কাছেই প্রথম বেকিং শিখেছি। মনে পড়ছে, অনুষ্ঠানে সিদ্দিকা আপা যেদিন প্রথম মাফিন বেক করলেন, সেদিন বেশ মুগ্ধ হয়ে দেখছিলাম। মনে হচ্ছিল যেন জাদু দেখাচ্ছেন কোনো জাদুকর। পুরো শুটিং স্পটে ছড়িয়ে পড়েছিল মাফিনের সুবাস। পরে তিনি এমন একটা কাণ্ড করলেন, যা আমি কোনো দিনও ভুলতে পারব না। আপার শুটিং শেষ হলে সাধারণত দেখা যেত সবাই খাবারের ওপর হামলে পড়ছে। এ জন্য সেদিনের শুটিং শেষে আপা আলাদা করে একটি টিস্যুতে মুড়িয়ে আমার হাতে এনে দিলেন মাফিন। বললেন, ‘পরে তো আর পাব না, এটা তোমার ছেলেকে দিয়ো।’

সিদ্দিকা কবীরের কাছ থেকেই প্রথম বেকিং শিখেছেন শারমিন লাকি

মজার ব্যাপার হলো, এই অনুষ্ঠানের শুটিং শুরু হওয়ার বেশ কিছুদিন পরও তিনি ভাবতেন, আমি একেবারেই অকর্মা। রান্নার কিছুই জানি না। একটা পর্বে আমার ওপর লুচি বানানোর ভার পড়ে। আমাকে দিয়ে কাজটা হবে কি না, এই নিয়ে তিনি বেশ সংশয়ে ছিলেন। আমার শ্বশুরবাড়ির লোকজন ভারতীয় বংশোদ্ভূত। লুচি তরকারি খাওয়ার একটা চল তাই বাড়িতে ছিল। যে কারণে লুচি বানানোয় বেশ দক্ষই ছিলাম।  শুটিংয়ে লুচি বেলার সময় যখন চাঁদের মতো গোল হয়ে গেল, সিদ্দিকা আপা আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠলেন। বললেন, ‘এই মেয়েকে দিয়ে হবে।’ সেটা ছিল ‘সিদ্দিকা কবীর’স রেসিপি’ অনুষ্ঠানের ৫০তম পর্বেরও পরের গল্প। তাহলেই বুঝুন, রান্নার ব্যাপারে কতটা খুঁতখুঁতে ছিলেন তিনি।

একটা সময় সম্পর্কটা এমন হয়ে গেল যে সবাই আমাদের বউ–শাশুড়ি ভাবত। তিনি আমাকে বলতেন সুহাসিনী। এই নিয়ে তাঁর ছেলেবউ শর্মির সঙ্গে চলত দুষ্টু–মিষ্টি খুনসুটি। শর্মিরও রান্নার হাত ছিল বেশ ভালো। একদিন শুটিং স্পটে অনেক মজার খাবার রান্না করে নিয়ে এসে সে বলল, দেখি তো কে কার ছেলেবউ।

ছয় বছরের বেশি সিদ্দিকা কবীর আপার সঙ্গে রেসিপির অনুষ্ঠানটা করি। একবার ছিল বিভাগীয় শহরগুলো ঘুরে সেখানকার ঐতিহ্যবাহী রান্না করার আয়োজন। আপার সঙ্গে অনেক জায়গায় ঘুরেছি, অনেক আনন্দ করেছি কিন্তু আফসোস, সেখানকার কোনো ছবি আজ আর আমার কাছে নেই।

একটা সময় মানুষের ভিড় এড়িয়ে চলতেন। বলতেন, ‘বিয়েবাড়িতে আর যাব না। সবাই ভিড় করে ছবি তুলতে আসে, কথা বলে খুব বিব্রত লাগে। আর বিয়েবাড়ির আনন্দও যেন ঠিকমতো উপভোগ করতে পারি না।’ কেন বলতেন, এখন বুঝি।

আমার ফ্যাশনরুচি তিনি পছন্দ করতেন। শুটিংয়ের আগে মেকআপ আর্টিস্টকে বলতেন, ‘কোন শাড়িটি পরব, মেকআপ কেমন হবে, সুহাসিনীকে জিজ্ঞাসা করে আসো।’

অনেক সময় দেখা যেত, আমি হয়তো খেয়ালই করিনি, ফোনে কথা বলছি। হয়তো তিনি তখন মনে মনে কষ্ট পেতেন। আমার সঙ্গে কেউ এমন করলে আমারও তা–ই মনে হতো।

আমার ছেলে তখন বেশ ছোট। শুটিং যত তাড়াতাড়ি শেষ হতো, তত তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে পারতাম। যেদিন দেরি করে শুটিং শেষ হতো, সেদিন হয়তো আমার মুখ গোমড়া দেখাত। সিদ্দিকা আপা ঠিকই বুঝতেন, শুটিং ইউনিটকে তাড়া দিতেন দ্রুত শুটিং শেষ করতে। তবে এখন মনে হয়, সেই সময় যদি আরও দীর্ঘ হতো বা আরও দীর্ঘ সময় তাঁর সঙ্গে কাটাতে পারতাম, কত কিছুই–না শিখতাম।

প্রতিবারই ঈদে তাঁর জন্য শাড়ি কিনতাম। তিনি চলে যাওয়ার পর প্রতিটি ঈদই খুব খালি খালি লাগে। বুকের ভেতর কেমন জানি হাহাকার করে, মনে হয় কেউ একটা যেন কোথাও নেই। যত দিন যাচ্ছে, ততই সেই হাহাকার প্রকট হচ্ছে। সিদ্দিকা আপা থাকতে সেটা বুঝিনি।