
একদিন মঙ্গল গ্রহে মানুষ বসবাস করবে—এই স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দিতে বিশ্বজুড়ে চলছে নানা গবেষণা। এর সঙ্গে তরুণদের সম্পৃক্ত করতে যুক্তরাষ্ট্রের দ্য মার্স সোসাইটি প্রতিবছর আয়োজন করে ইউনিভার্সিটি রোভার চ্যালেঞ্জ (ইউআরসি)। এটি বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ রোবোটিকস প্রতিযোগিতা। এ বছর চূড়ান্ত পর্ব অনুষ্ঠিত হলো যুক্তরাষ্ট্রের ইউটাহ স্টেটের হ্যাঙ্কসভিলে অবস্থিত মার্স ডেজার্ট রিসার্চ স্টেশনে (এমডিআরএস), ২৭-৩০ মে। অংশ নিয়েছে বিশ্বের ১৫টি দেশের ৩৮টি দল। সেখানে তৃতীয় হয়েছে বাংলাদেশের ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ‘ইউআইইউ মার্স রোভার টিম’।
২০২২ সালে প্রথমবার অংশ নিয়েই ইউটাহর মার্স ডেজার্ট রিসার্চ স্টেশনে পৌঁছে গিয়েছিল ইউআইইউর শিক্ষার্থীদের দল। মিশিগান আর মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের তৈরি রোভারে আটকে গিয়েছিল তাঁদের চোখ। দেখে মনে হয়েছিল, রোভারগুলো এতই উন্নত, যেন এক্ষুনি মঙ্গল গ্রহে পাঠানোর জন্য প্রস্তুত! সেবার ১৩তম হওয়া ইউআইইউর ছেলেমেয়েরা আগ বাড়িয়ে জানতে চেয়েছিলেন সিমুলেশন, মেকানিক্যাল সিস্টেম ডিজাইন আর পুরো সিস্টেম ডেভেলপের আদ্যোপান্ত। মনে মনে ভেবেছিলেন, আমরাও একদিন এমন রোভার বানাব।
আর এ বছর? পুরস্কার বিতরণের পর বারবিকিউ পার্টির একপর্যায়ে ইউআইইউর শিক্ষার্থীদের পাশে এসে দাঁড়ায় মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের দল। এবার তাঁদের চোখেমুখে কৌতূহল—‘সিমুলেশন কীভাবে করেছ? হুইলটা কীভাবে বানালে? আমরা এভাবে চেষ্টা করেছিলাম, হয়নি।’ আলাপ শেষে সিস্টেমটির ছবিও তুলেছেন তাঁরা!
২০২১ সালে ইউআইইউ মার্স রোভার দলের যাত্রা শুরু।
করোনাকাল। ক্যাম্পাসের একটা ছোট্ট ঘর। তিন-চারটি চেয়ার, দুটি টেবিল। বাইরে দোকানপাট বন্ধ, প্রয়োজনীয় সামগ্রী কেনার উপায় নেই। হাতে আধুনিক যন্ত্রপাতি নেই, বিশাল গবেষণাগার নেই, নেই বড় বাজেট। একদল সাহসী তরুণের সম্বল ছিল কেবলই স্বপ্ন। ধীরে ধীরে কাজের পরিসর বড় হয়েছে। শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। ভালো ফলও এসেছে ধাপে ধাপে। ২০২২ সালে বিশ্বে ১৩তম, ২০২৩ সালে নবম, ২০২৪ সালে পঞ্চম, ২০২৫ সালে ষষ্ঠ, আর এবার তৃতীয়।
এ বছর চ্যাম্পিয়ন হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের মিজৌরি ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি। দ্বিতীয় অস্ট্রেলিয়ার মোনাশ ইউনিভার্সিটি। এশিয়ার একমাত্র দেশ হিসেবে সেরা তিনে স্থান করে নিয়েছে ইউআইইউ। ‘বেস্ট অটোনমাস সিস্টেম’ স্বীকৃতিও তাঁদের।
প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া ইউআইইউর দলে সদস্যসংখ্যা ৩২। নেতৃত্বে ছিলেন সাইফ আল সাদ (টিম লিড), মো. মুশফিকুর রহমান (সিনিয়র লিড) এবং শেখ সাকিব হোসেন (কো-টিম লিড)। পরামর্শক হিসেবে পাশে ছিলেন স্কুল অব সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ডিন অধ্যাপক হাসান সারওয়ার এবং কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান সুমন আহমেদ। দলের মেন্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন একই বিভাগের প্রভাষক মো. আবিদ হোসেন।
এবারের প্রতিযোগিতায় মূল পর্বে জায়গা করে নিয়েছিল বাংলাদেশের আরও তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়—ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ‘ব্র্যাকইউ মঙ্গলতরী’(সপ্তম), মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির ‘এমআইএসটি মঙ্গলবার্তা’(১১তম) ও অ্যাভিয়েশন অ্যান্ড অ্যারোস্পেস ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের ‘রোভার ৭১’(৩৪তম)।
এ বছর ইউআইইউর রোভারের নাম রাখা হয়েছিল অরিয়ন। গ্রিক ভাষায় শব্দটির অর্থ ‘নতুন ভোর’ বা নতুন শুরু। দলটি সত্যিই এ বছর সব নতুন করে শুরু করেছিল। পুরো সফটওয়্যার আর হার্ডওয়্যার আর্কিটেকচার ছেঁটে ফেলে একেবারে গোড়া থেকে তৈরি করা হয়েছে নতুন সিস্টেম।
টিম লিড সাইফ আল সাদ বলেন, ‘আমাদের আগের সিস্টেমটি ভালো ছিল। অনেক সাফল্যের পেছনে এর বড় অবদান রয়েছে। কিন্তু প্রতিযোগিতার জন্য আমাদের আরও দ্রুততাসম্পন্ন, দক্ষ ও সম্পূর্ণ মিশনকেন্দ্রিক একটা সিস্টেম দরকার ছিল। তাই কঠিন হলেও সাহসী একটা সিদ্ধান্ত আমরা নিই। পুরোনো লিগ্যাসি ডিজাইন থেকে বের হয়ে সম্পূর্ণ নতুন সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যার আর্কিটেকচার তৈরি করি। ঝুঁকিটা অবশ্যই অনেক বড় ছিল। কিন্তু আমরা বিশ্বাস করেছিলাম, যদি আরও এক ধাপ এগোতে হয়, তাহলে পরিচিত ও নিরাপদ জায়গা থেকে বের হওয়ার সাহস করতে হবে। শেষ পর্যন্ত সেই বিশ্বাসই আমাদের পরিবর্তনের পথ দেখিয়েছে।’
এই বছরের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এসেছিল একেবারে শেষ সময়ে। স্বয়ংক্রিয় নেভিগেশন মিশন শুরু হওয়ার পর ইউআইইউ মার্স রোভার দল টের পায়, আইএমইউ (ইন্টারনাল মেজারমেন্ট ইউনিট, যা রোভারের অবস্থান আর দিকনির্ণয় করে) কাজ করছে না। হোটেল থেকে ফিল্ডের দূরত্ব প্রায় ৭০ মাইল, রাস্তাও ভাঙাচোরা। যাওয়ার পথেই হয়তো কোনোভাবে আইএমইউ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
সমস্যা বুঝে নতুন আইএমইউ লাগিয়ে, নতুন করে প্রোগ্রাম করতে চলে যায় ১৫ মিনিট। হাতে বাকি তখন মাত্র ২৫ মিনিট। তারপর শুরু হয় মিশন। রোভারকে কোনো মানুষের নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই মরুভূমির ভেতর নিজে নিজে পথ খুঁজতে হবে, বাধা এড়াতে হবে, নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করতে হবে—সব সিদ্ধান্ত রোভারের নিজের।
একে একে সব ধাপ সামলেছে অরিয়ন। সময় শেষ হওয়ার চার সেকেন্ড আগেই এটি চূড়ান্ত লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করে। উপস্থিত সবাই তো বটেই, বিচারকেরাও অবাক—এত কম সময়ে এটা কীভাবে সম্ভব! সাতটি লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ছয়টিতে পৌঁছে সর্বোচ্চ ৮৪ নম্বর পেয়ে অরিয়ন জিতেছে ‘বেস্ট অটোনমাস সিস্টেম’ পুরস্কার।
সিনিয়র লিডার মো. মুশফিকুর রহমান বলেন, ‘ফলাফল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে আমরা সবাই লাফিয়ে উঠি। এত মানুষের পরিশ্রম, ত্যাগ আর অপেক্ষা—সবকিছু যেন এক ঘোষণাতেই সার্থক হয়ে গেল।’
তৃতীয় হওয়ায় কি দলটি সন্তুষ্ট? উত্তর সহজ নয়। পরীক্ষার মধ্যে, উৎসবের দিনেও, রাতের পর রাত জেগে ল্যাব ছাড়েননি তাঁরা। একেকটি ভুল সংশোধন করে, একে একে সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে এই অর্জন শিক্ষার্থীদের কাছে গর্বের বটে, তবে স্বপ্নটা আরও বড়। দলের মেন্টর আবিদ হোসেন বলেন, ‘আমরা আমাদের সেরাটা দিয়েছি। তবে এখানেই থামতে চাই না। আমাদের লক্ষ্য একটাই, বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়া।’