পিঠাপিঠি দুই ভাই—শাফি বিন সুলতান ও সাবিক বিন সুলতান। ছোটবেলায় তাঁদের হাতে কোনো খেলনা গাড়িই নাকি ‘আস্ত’ থাকত না। দুজন মিলে গাড়ির কলকবজা খুলে আবার জোড়া লাগানোর চেষ্টা করতেন।
গল্পের শুরুটা বোধ হয় সেখান থেকেই। দুই ভাই এখন কলেজে পড়েন। এরই মধ্যে দাঁড় করিয়ে ফেলেছেন ‘এজেন্টিকহায়ার’ নামে একটি স্টার্টআপ। চাকরিদাতারা যেন এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে প্রার্থী যাচাই-বাছাইয়ের কাজটা সেরে ফেলতে পারেন, সেটিই এই উদ্যোগের মূল কাজ। স্টার্টআপের জন্য প্রায় ৩০ হাজার ডলারের বিনিয়োগও নিশ্চিত করেছেন দুই ভাই। তাঁদের বাবা সুলতান মহিউদ্দিন ভূঁইয়া ও মা রোখশানা আফরোজ।
রোবোটিকস নিয়ে দুই ভাইয়ের কাজের শুরু করোনাকালে। বাবা তখন করোনায় আক্রান্ত হয়ে আলাদা ঘরে ‘আইসোলেশনে’ ছিলেন। বাবার কাছে খাবার পৌঁছে দিতে দুই ভাই তখন তৈরি করে ফেলেন একটি ‘লাইন-ফলোয়িং’ রোবট। রান্নাঘর থেকে বাবার ঘর পর্যন্ত মেঝেতে কালো টেপ মেরে দিয়েছিলেন সেই সময়ের স্কুলপড়ুয়া দুই ভাই। ইনফ্রারেড সেন্সর রোবটকে পথ চিনিয়ে দিত। কালো টেপ অনুসরণ করে, খাবার নিয়ে সে পৌঁছে যেত গন্তব্যে।
করোনার সেই ঘরবন্দী সময়টাতেই ইউটিউব আর গিটহাব ঘেঁটে দুই ভাই শিখতে শুরু করেন সি++, জাভার মতো প্রোগ্রামিং ভাষা আর ওয়েব ডেভেলপমেন্ট। অন্যদের সঙ্গে মিলে প্রকল্পও বানাতে শুরু করেন তাঁরা। গড়ে তোলেন ‘টিম আকাশ পাঠাও’। বাংলাদেশে বিজ্ঞান উৎসব, প্রযুক্তি মেলা আর রোবোটিকসের নানা আয়োজনেও অংশ নিয়েছেন তাঁরা। ধীরে ধীরে পৌঁছে গেছেন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে।
২০২৫ সালে ডায়মন্ড চ্যালেঞ্জ নামে একটি প্রতিযোগিতায় অংশ নেন শাফি ও সাবিক। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ডেলাওয়ারের হর্ন এন্টারপ্রেনিউরশিপ এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করে, অংশ নেয় স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা। সেবার তাদের প্রকল্পের নাম ছিল ‘ব্লুশিল্ড ফিল্টার’। কার্বন ন্যানোপার্টিকেল দিয়ে পানি পরিশোধনের একটি ধারণা নিয়ে কাজ করে প্রতিযোগিতায় সেরা পাঁচে জায়গা করে নিয়েছিলেন দুই ভাই।
পরের গন্তব্য সিঙ্গাপুর। ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের (এনইউএস) সঙ্গে যুক্ত একটি ইয়ুথ ফেলোশিপে আমন্ত্রণ পান শাফি ও সাবিক। উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের ২০০ শিক্ষার্থীকে নিয়ে ছিল ১০ দিনের আয়োজন। নেতৃত্ব, উদ্ভাবন ও বাজার নিয়ে দুই ভাইয়ের আগ্রহ জন্মায় মূলত সেখানে। পরিচয় হয় নানা পর্যায়ের মানুষের সঙ্গেও।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তাঁরা সিঙ্গাপুরে ইয়ুথ ফাউন্ডার সামিট (ওয়াইএফএস) নামের একটি কর্মসূচির ফাউন্ডার একসিলারেটর প্রোগ্রামে যোগ দেন। বুটক্যাম্পসহ নানা কার্যক্রম চলে পাঁচ দিন। এশিয়ার ১১টি দেশের ৭০ জনের বেশি তরুণ এতে অংশ নেন। আয়োজক ছিল ওয়েভস্পার্কস, সিঙ্গাপুর ম্যানেজমেন্ট ইউনিভার্সিটির ইনস্টিটিউট অব ইনোভেশন অ্যান্ড এন্টারপ্রেনিউরশিপ এবং বিয়ন্ডএক্স ল্যাব। সহায়তায় ছিল সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইয়ুথ কাউন্সিল।
তরুণেরা যেন একে অপরের সঙ্গে পরিচিত হয়, মিলেমিশে কোনো একটা সমস্যার সমাধান খোঁজে, সেই অনুযায়ী একটা স্টার্টআপ সাজায়—সেটাই ছিল এই আয়োজনের মূল লক্ষ্য। আর এখান থেকেই জন্ম নেয় এজেন্টিকহায়ার।
বুটক্যাম্পেই শেষ হয়নি। ছয় মাসের কর্মসূচি ছিল বেশ দীর্ঘ। বিভিন্ন দেশের মোট সাতজনের দল নিয়ে এজেন্টিকহায়ারকে বাস্তবে রূপ দিতে হয়েছে। জোগাড় করতে হয়েছে সিড ফান্ডিংও। দুই ভাই মিলে নিশ্চিত করেছেন ৩০ হাজার ডলারের বিনিয়োগ। এগিয়ে এসেছে প্রাইম ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, গার্ডিয়ান লাইফ ইনস্যুরেন্স, স্পোর্টিফাই, ওয়েভস্পার্কস এবং ন্যাশনাল ইয়ুথ কাউন্সিল অব সিঙ্গাপুরের মতো বেশি কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। দলের অন্যান্য সদস্যরাও নিজেদের মতো করে বিনিয়োগ আনার চেষ্টা করছেন।
নানা ধাপ পেরিয়ে সিঙ্গাপুরের সেই আয়োজনে সেরা ৩-এ জায়গা করে নিয়েছে এজেন্টিকহায়ার। সাংহাই, ব্যাংকক ও হংকংয়ের প্রযুক্তি ও ব্যবসাবিষয়ক নানা আয়োজনেও অংশ নিয়েছেন তাঁরা।
অনেক স্টার্টআপের ক্ষেত্রেই লোক নিয়োগের জন্য আলাদা কোনো দল থাকে না। দেখা যায় প্রতিষ্ঠাতাকেই একটা একটা করে সিভি দেখতে হয়, প্রার্থীদের কল বা ই-মেইল করতে হয়। এই সমস্যাটাই সমাধান করার চেষ্টা করছে এজেন্টিকহায়ার। প্রার্থী বাছাইয়ের প্রাথমিক কাজটা এখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাই করে দেবে। শুধু যে সিভি পর্যালোচনা করবে তা নয়, ইন্টারভিউও নেবে। এরপর প্রত্যেক প্রার্থী সম্পর্কে তৈরি করে দেবে একটি লিখিত সারসংক্ষেপ। তবে চূড়ান্ত নিয়োগের সিদ্ধান্ত থাকবে মানুষেরই হাতে—সেটিও নিশ্চিত করে এই স্টার্টআপ। সাবস্ক্রিপশন নিয়ে যেকোনো প্রতিষ্ঠান এজেন্টিকহায়ারের গ্রাহক হতে পারে।
বর্তমানে এজেন্টিকহায়ারের সিইও ও সহপ্রতিষ্ঠাতা হিসেবে আছেন সাবিক বিন সুলতান। আরেক সহপ্রতিষ্ঠাতা ও সিওও শাফি বিন সুলতান। এ ছাড়া আছেন সিঙ্গাপুরের হাওয়াং উ (সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও সিটিও), কাজাখস্তানের দানিয়া তোখানোভা (হেড অব মার্কেটিং), থাইল্যান্ডের আপিউইট পাসুওয়াট (আউটরিচ প্রধান), কম্বোডিয়ার মোকা সোখা (অপারেশনস অ্যাসোসিয়েট) এবং মালয়েশিয়ার জেসি চু (প্রোডাক্ট অ্যাসোসিয়েট)।
সিইও সাবিক বিন সুলতান এখন পড়ছেন বিএএফ শাহীন কলেজ কুর্মিটোলার একাদশ শ্রেণিতে। অন্যদিকে সিওও শাফি বিন সুলতান সেন্ট যোসেফ উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র। পড়ালেখা, সঙ্গে স্টার্টআপ—এত কিছু কীভাবে সামলাচ্ছেন? জানতে চাইলে সাবিক বলেন, ‘সত্যি বলতে একেবারে নিখুঁতভাবে সব সামলে নিচ্ছি, বললে ভুল হবে। তবে হ্যাঁ, আমাদের দলের একেকজন একেক দেশের হওয়ায় একজন না থাকলেও বাকিরা ঠিক সামলে নিচ্ছে।’
পাঁচ বছর পর এজেন্টিকহায়ারকে কোথায় দেখতে চান? প্রশ্নের উত্তরে শাফি বলেন, ‘আমরা চাই এজেন্টিকহায়ার সারা বিশ্বে ইতিবাচক প্রভাব ফেলুক। বিশেষ করে ছোট ব্যবসা ও প্রাথমিক পর্যায়ের স্টার্টআপগুলোর ক্ষেত্রে, যাদের নিজস্ব এইচআর টিম নেই। আমরা এটাও চাই, মানুষ মনে রাখুক এর শুরু কোথায়—বাংলাদেশের দুই শিক্ষার্থীর হাত ধরে, যারা একটি একসিলারেটর কর্মসূচির মাধ্যমে অন্য দেশের সহযোগীদের সঙ্গে এক হয়ে একটা কিছু গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।’
দুই ভাই জানালেন, ভবিষ্যতে তাঁরা বিশ্বমানের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে চান। পাশাপাশি ব্যবসা তো চলবেই। তাঁদের মতে, উদ্যোক্তা হওয়া শেখা যায় পড়াশোনা ও বাস্তব অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে।
২০২৭ সালের জানুয়ারিতে এজেন্টিকহায়ারের বৈশ্বিক লঞ্চের পরিকল্পনা করছে দলটি। তার আগপর্যন্ত উদ্যোক্তাদের মনোযোগ এখন পণ্যটির মান উন্নয়ন ও সম্ভাব্য ব্যবহারকারীদের কাছে পৌঁছানো নিয়ে। এই পুরো যাত্রায় হার্ভার্ডের একজন প্রাক্তন শিক্ষার্থী তাঁদের পরামর্শদাতা হিসেবে দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন।