কোচ সহিদুল ইসলাম
কোচ সহিদুল ইসলাম

শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পারিশ্রমিক নেন না সহিদুল, জাতীয় ফুটবল দলে খেলছে তাঁর শিষ্যরা

জেএফএ কাপ সামনে রেখে মাগুরা জেলা স্টেডিয়ামে মেয়েদের অনুশীলন চলছে। মাঠের এক পাশে দাঁড়িয়ে নিবিড় মনোযোগে খেলা দেখছিলেন কোচ সহিদুল ইসলাম। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিলেন, অন্য কোচের তত্ত্বাবধানে তাঁর স্কুলের মেয়েরা কতটা ছন্দে থাকে। ফুটবল বিশ্বকাপের আবহে জানতে চাইলাম, ‘বিশ্বকাপে কোন দলকে সমর্থন করেন?’

সহিদুল ইসলাম একটু হেসে বললেন, ‘আমি ব্রাজিলের সমর্থক। তবে আর্জেন্টিনার ফুটবলও আমার ভালো লাগে। লাতিন আমেরিকার ফুটবলের শৈল্পিক ছন্দ, ইউরোপীয় ফুটবলের আধুনিক কৌশল—সবই আমাকে টানে।’ 

কথা বলতে বলতে বোঝা যায়, তিনি শুধু ফুটবল দেখেন না; ফুটবল থেকে শেখেনও। বিশ্বের সেরা খেলোয়াড় ও কোচদের কৌশল পর্যবেক্ষণ করেন। এরপর সেই অভিজ্ঞতা প্রয়োগ করেন নিজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে। 

মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার গোয়ালদহ গ্রাম এখন বাংলাদেশের নারী ফুটবলের অন্যতম আঁতুড়ঘর। জাতীয় দল, বিকেএসপি কিংবা বয়সভিত্তিক বিভিন্ন দলে খেলছেন এই গ্রামের অনেক মেয়ে। এই নীরব বিপ্লবের নেপথ্যে রয়েছেন ফুটবল কোচ ও শিক্ষক সহিদুল ইসলাম। 

গোয়ালদহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তিনি সহকারী শিক্ষক। বয়স ৪৪। শ্রেণিকক্ষে পাঠদান আর মাঠে ফুটবল প্রশিক্ষণ—এই দুই দায়িত্বই সমান নিষ্ঠায় পালন করেন। 

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেওয়ার তিন বছর পর, ২০১৩ সালে নিজের এলাকার স্কুল গোয়ালদহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি হয়ে আসেন তিনি। স্কুলটি তখন বিভাগীয় পর্যায়ে বিভিন্ন খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিত। কিন্তু ফুটবলের তেমন কার্যক্রম ছিল না। প্রধান শিক্ষকের উৎসাহে শিক্ষার্থীদের ফুটবল শেখানোর উদ্যোগ নিলেন সহিদুল। 

ছোটবেলায় নিজেও ফুটবল খেলতেন। খেলার প্রতি ছিল গভীর ভালোবাসা। কিন্তু ভালো খেলোয়াড় হওয়া আর ভালো কোচ হওয়া এক বিষয় নয়। তাই শুরু হয় তাঁর নতুন পথচলা। ইন্টারনেটে পড়াশোনা, ইউটিউবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কোচের প্রশিক্ষণপদ্ধতি দেখা—সবকিছু মিলিয়ে নিজেকে প্রস্তুত করতে থাকেন। এরপর ছোট ছোট শিক্ষার্থীর ওপর প্রয়োগ করতে শুরু করেন সেই জ্ঞান। 

শুরুর দিকে আধুনিক প্রশিক্ষণ সরঞ্জাম ছিল না। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও বাড়ির বাঁশ কেটে, রশি জুড়ে নিজেই বানিয়ে নেন অনুশীলনের বিভিন্ন উপকরণ। পরে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের গ্রাসরুট কোচিং কোর্স করে নিজের দক্ষতাকে আরও শাণিত করেন। 

সহিদুল ইসলাম বলেন, ‘কোচিংয়ের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো মাঠ। যেখানে আমি প্রতিদিন অনুশীলন করাই, সেটা আসলে একটা বাড়ির উঠানের মতো ছোট জায়গা।’ সেই ছোট উঠানই হয়ে উঠেছে স্বপ্নের কারখানা। 

এই সীমিত জায়গা থেকেই উঠে এসেছেন সাফ চ্যাম্পিয়নশিপজয়ী ফুটবলার ইতি রানী ও সাথী বিশ্বাস। তাঁর হাত ধরে ২২-২৩ জন শিক্ষার্থী বিকেএসপিতে পড়াশোনা ও প্রশিক্ষণের সুযোগ পেয়েছে। জাতীয় দলে খেলেছেন অর্পিতা বিশ্বাস, স্বর্ণা রানী মণ্ডল ও নবীরন খাতুনের মতো ফুটবলাররা। গ্রামের দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসা এসব মেয়ের কেউ কেউ এখন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী। 

গোয়ালদহের মতো গ্রামে হাফপ্যান্ট পরে মেয়েদের মাঠে নামাটা অনেক পরিবারের কাছেই একসময় ছিল অকল্পনীয় বিষয়। কিন্তু সময় বদলেছে। বদলেছে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি। 

সহিদুল ইসলাম বলছিলেন, তাঁর অনেক ছাত্রী এখন জাতীয় দলের হয়ে খেলে মাসে ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকা আয় করছেন। সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ের পর রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মানিত হওয়া, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত মাসিক আর্থিক প্রণোদনার ‘ক্রীড়া কার্ড’ও পেয়েছেন কেউ কেউ। যেসব পরিবার একসময় মেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল, সেই মেয়েরাই আজ সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিচ্ছে। এসব সাফল্য দেখে গ্রামের আরও অনেক পরিবার এখন মেয়েদের খেলাধুলায় উৎসাহিত করছে।

শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কখনো কোনো পারিশ্রমিক নেন না সহিদুল; বরং স্থানীয় মানুষের সহযোগিতায় তাদের জন্য জার্সি, বুট ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ব্যবস্থা করেন। 

সহিদুল ইসলাম চান, প্রতিবছর চার-পাঁচজন শিক্ষার্থী জাতীয় পর্যায় কিংবা বিকেএসপিতে সুযোগ পাক। তাঁর বিশ্বাস, একজন খেলোয়াড়কে বড় পর্যায়ে নিয়ে যেতে হলে খুব ছোট বয়স থেকেই পরিচর্যা শুরু করতে হয়। প্রতিভা আছে, আগ্রহও আছে, প্রয়োজন শুধু সঠিক দিকনির্দেশনা। 

আরও বড় মাঠ, আরও ভালো সুযোগ-সুবিধা পেলে ছেলেদের ফুটবল নিয়েও একইভাবে কাজ করতে চান সহিদুল।