‘বিদেশে বসে প্রথমবার ভোট দিলাম পছন্দের প্রার্থীকে’
‘বিদেশে বসে প্রথমবার ভোট দিলাম পছন্দের প্রার্থীকে’

পোস্টাল ব্যালট

১২ ফেব্রুয়ারির ভোট যেভাবে ২৪ জানুয়ারিতে দিলাম

প্রবাসীরাও এবার ভোট দিতে পারবেন, খবরটা জানার পর থেকেই মনে আশা, বিদেশে থেকেও এবার হয়তো ভোট দেওয়ার সুযোগ হবে। পরে পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে প্রবাসীদের ভোটদানের আনুষ্ঠানিক ঘোষণাও আসে।

তখন নিউ হ্যাম্পশায়ারের ডোভার শহরে আমাদের ছোট বাংলাদেশি কমিউনিটিতে আলোচনার বিষয় ছিল—পদ্ধতিটি কতটা কার্যকর হবে, তথ্য ঠিক থাকবে কি না, আদৌ ভোট গণনায় আসবে কি না। আমার খালি মনে হচ্ছিল, সত্যিই যদি ভোট দিতে পারি, তাহলে এটি হবে আমার ও আমার স্ত্রী শারমিন আক্তারের জীবনের প্রথম জাতীয় নির্বাচনে ভোটদান।

২০১৩ সালেই জাতীয় পরিচয়পত্র পাই। পরের বছর ২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচনে ভোট দিতে হয়নি! আর ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনের সময় দেশের বাইরে ছিলাম। এসব নির্বাচন সম্পর্কে যা জেনেছি, সবই দূর থেকে—সংবাদমাধ্যম বা পরিচিতজনদের কাছে। তাই প্রবাসে থেকেও জাতীয় নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাওয়ার বিষয়টি আমার কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছিল।

ভোট দিয়ে ছবি তোলা, ভিডিও কলে অন্যদের কাছে উচ্ছাস প্রকাশের সবটাই ঘটেছে

পোস্টাল বিডি অ্যাপ ইনস্টল করার পর জানতে পারি, আমাদের অঞ্চলে নিবন্ধনের সময়সীমা ২৪ থেকে ২৮ নভেম্বর। ২৫ নভেম্বর অ্যাপে ভোটার আইডি দিয়ে বারবার নিবন্ধনের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলাম। মনে হলো, আমাদের ভোটার আইডি যেহেতু পুরোনো, স্মার্ট কার্ড নয়, তাই হয়তো হচ্ছে না। তবু পরদিন নিউইয়র্কের বাংলাদেশ কনস্যুলেটে যোগাযোগ করলাম। তাদের কাছ থেকে জানা গেল, পুরোনো আইডি দিয়েও অনেকে সফলভাবে রেজিস্ট্রেশন করেছেন। আবার চেষ্টা করলাম। এবার ধাপে ধাপে এগিয়ে সেলফি ভেরিফিকেশনের পর স্ক্রিনে দেখাল, ‘৩৫ জয়পুরহাট-২ (কালাই-ক্ষেতলাল-আক্কেলপুর)’ এবং আমার গ্রামের ঠিকানা। আমাদের জন্য সেটা ছিল একেবারেই নতুন এক অভিজ্ঞতা।

এরপর প্রায় ২০ দিন অপেক্ষা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন সংবাদপত্রে দেখছিলাম, অনেক প্রবাসীই ব্যালট পাচ্ছেন। আমরা নিয়মিত অ্যাপে ট্র্যাকিং করতাম, ডাকবাক্স খুলে চেক দেখতাম। অবশেষে আমাদের ঠিকানায় আমার ও স্ত্রীর নামে দুটি সাদা খাম এল। নির্দেশনা অনুযায়ী সময়মতো ফেরত পাঠাতে ২৪ জানুয়ারি ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। ২৩ তারিখ রাতে যখন খাম খুলে সব নির্দেশনা মনোযোগ দিয়ে পড়ছিলাম, কী যে একটা অনুভূতি, বলে বোঝানো অসম্ভব। গণভোটের সব নির্দেশনা পড়ার পর আসল ব্যালট খুলে দেখি ১১৮টি প্রতীক! কৌতূহলবশে দেখছিলাম কোনটা কোন দলের প্রতীক!

সকালে বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনে ভোট দেব! কাকে ভোট দেব? কেউ তো সেভাবে ভোটও চাননি। কত চিন্তা মাথায় নিয়ে সকালে অ্যাপ বের করে দুই ধাপে সেলফি দিয়ে ব্যালট প্রাপ্তি কনফার্ম করলাম। একই কলমে দুজন দুইটায় ভোট দিলাম, তারপরও গোপনে! এরপর নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যালট দুটি সাদা খামে এবং অঙ্গীকারনামা হলুদ খামে ভরে সিল করলাম। এ সময় ছবি তোলা, ভিডিও কলে সবাইকে ভোটদান দেখানো, আনন্দ-উচ্ছ্বাস—কোনো কিছুই বাদ পড়ল না!

এরপর বড় চিন্তা পোস্ট অফিসে জমা দেওয়া। বাসা থেকে পোস্ট অফিস প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার। বাইরে তাপমাত্রা প্রায় মাইনাস ১৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস, তুষারপাত হচ্ছে। ভাবলাম, যে শীত, আজকে জমা না দিয়ে পরের দিন দিই। কিন্তু পরের দিন রোববার, পোস্ট অফিস বন্ধ! আবার নির্দেশনায় লেখা ছিল দেরিতে পৌঁছালে ভোটটা গণনায় ধরা হবে না! আবার আমাদের এক গ্রুপ থেকে জানানো হইছে, পাঠাতে ১ দশমিক ৭৫ ডলারের পোস্টাল স্ট্যাম্প লাগবে! অর্থাৎ দুজনের প্রায় ৪২০ টাকা খরচ হবে। তবু মনে মনে ঠিক করলাম, তুষারপাত উপেক্ষা করে মাইনাস ১৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার দূরের পোস্ট অফিসে গিয়ে দেশের জন্য ভোট দেব!

পোস্ট অফিসে গিয়ে জানতে পারি, আলাদা কোনো খরচ লাগবে না, বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যেই ডাক খরচ পরিশোধ করে দিয়েছে। পোস্ট অফিসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কয়েকবার কথা বলে বিষয়টি নিশ্চিত হই।

পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখলাম, বিশ্বের নানা প্রান্তের প্রবাসী বাংলাদেশিরাও একইভাবে ভোট দিয়েছেন। পুরো প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি কৃতজ্ঞতা বোধ করেছি। ভবিষ্যতেও প্রবাসী বাংলাদেশিদের জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ কর্মকাণ্ডে এভাবে যুক্ত রাখার ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে, এমনটাই প্রত্যাশা।