
২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালানোর পর থেকে অশান্ত হয়ে উঠেছে মধ্যপ্রাচ্য। কুয়েত, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছে সংঘাতের প্রভাব। চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন সেখানে কর্মরত প্রবাসী বাংলাদেশিরা। স্বজন হারানো দুই প্রবাসীসহ তিনজনের অভিজ্ঞতা প্রকাশিত হয়েছে প্রথম আলোর শনিবারের ক্রোড়পত্র ‘ছুটির দিনে’তে। এখানে নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক ইরানের তেহরানে বসবাসকারী একজন বাংলাদেশির মুখে শুনুন তাঁর অভিজ্ঞতা।
সকালে হাঁটতে বের হয়েছিলাম। হঠাৎ বিকট শব্দে আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখি, মাথার ওপর দিয়ে ছুটে যাচ্ছে একটি মিসাইল। কোথায় গিয়ে পড়ল, বুঝতে পারলাম না। সাইরেন বেজে উঠল। ইসরায়েল–আমেরিকার ছোড়া মিসাইল প্রতিহত করতে পাল্টা ইন্টারসেপ্টর মিসাইল ছোড়া হলো। রাস্তা থেকে দ্রুত ঘরে ফিরে এলাম।
২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ভয়ে–আতঙ্কে প্রায় ঘরবন্দী জীবন কাটছে।
তেহরানে আছি প্রায় ১০ বছর। এত দিনের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, ইরানিদের কাছে অন্য দেশের সঙ্গে আক্রমণ–পাল্টা আক্রমণের ঘটনা খুবই স্বাভাবিক বিষয়। এবারই দেখছি, হামলা শুরুর পর থেকে আমাদের মতো তাঁদেরও শঙ্কার মধ্যে দিন কাটছে।
ইন্টারনেট নেই বললেই চলে। আগে থেকেই একটি ভিপিএন প্যাকেজ কিনে রেখেছিলাম। দিনে দু–একবার সংযোগ পাওয়া যায়। তখনই জরুরি যোগাযোগগুলো সেরে নিই। দেশে পরিবারের সদস্যদের আশ্বস্ত করি, আমরা ভালো আছি। কিন্তু তারা তো সবই দেখছে। তাই আশ্বস্ত করেও উদ্বেগ দূর করা যায় না। খবর জানার জন্য এখানে কিছু নির্দিষ্ট অ্যাপ রয়েছে। সরকারি বরাতে সেসব মাধ্যমে তথ্য দেওয়া হয়। খামেনি মারা গেছেন বা স্কুলে অনেকে হতাহত হয়েছে, এমন তথ্যও প্রথমে এই মাধ্যমেই জানতে পেরেছি।
এসএমএসের মাধ্যমে জনগণকে আশ্বস্ত করছে ইরান সরকার, রেজিম চেঞ্জের কোনো সম্ভাবনা নেই। কয়েকজনের নেতার মৃত্যুতে রাষ্ট্র থেমে যাবে না, নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য আরও অনেকে প্রস্তুত। সম্ভাব্য হামলা সম্পর্কেও আগাম সতর্কবার্তা দেওয়া হচ্ছে। আজ বা কাল কোথায় আক্রমণ হতে পারে, জানানো হচ্ছে। আক্রান্ত হলে কোন পরিষেবার জন্য কোন নম্বরে যোগাযোগ করতে হবে, সেটিও জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
তবু কি ভয় কমে? গত কয়েক দিনে হাজারের বেশি মানুষ মারা গেছে। আপাতদৃষ্টিতে হামলাগুলো সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ, পারমাণবিক ও সরকারি স্থাপনা লক্ষ্য করে হচ্ছে। কিন্তু স্কুলসহ কিছু বেসামরিক স্থাপনাতেও হামলার খবর এসেছে। কখন কোন মিসাইল কোথায় এসে পড়বে, কেউ জানে না। সাধারণত দুপুরের পর থেকে শুরু হয় আক্রমণ। মিসাইলের শব্দ শুনলেই টান টান হয়ে ওঠে স্নায়ু। আকাশের দিকে তাকালে দেখা যায়, একের পর এক ছুটে যাচ্ছে মিসাইল। তেহরানের চেয়ে আশপাশের শহরগুলোতে এখন আক্রমণ হচ্ছে বেশি।
এর মধ্যে একদিন বের হয়ে কিছু খাবারদাবার কিনে এনেছি। কয়েক দিন চলবে। দু–একটি ওষুধের দোকান ছাড়া অধিকাংশ দোকানপাটই বন্ধ। চারদিকে অনিশ্চয়তা। গত বছর ১২ দিনের আক্রমণের সময় মনে হয়েছিল, এটা হয়তো সাময়িক সংঘাত। এবার বুঝতে পারছি না, যুদ্ধ কত দিন স্থায়ী হবে।
সবার মুখে একই প্রশ্ন, এই যুদ্ধ কবে থামবে?
অনুলিখন: সজীব মিয়া