আমার মঞ্চে ওঠার প্রথম স্মৃতি খুবই করুণ। তখন টু-তে পড়ি। স্কুলে সাংস্কৃতিক উৎসব হচ্ছে। জমজমাট অনুষ্ঠান। সন্ধ্যা ছয়টায় শুরু হয়ে শেষ হবে সাড়ে নয়টায়। নাচগান-আবৃত্তিতে অংশগ্রহণকারীদের পাশাপাশি আমরাও, সাধারণ ছাত্রেরা, যারা অনুষ্ঠানের কোনো কিছুতেই পুরস্কার পাব না, তারাও যাতে অন্তত মঞ্চে ওঠার সুযোগ পাই, তার জন্যে বুদ্ধি করে তাদের একটা জমকালো গানের আয়োজন করা হয়েছে।
ঠিক হয়েছে ওপরের ক্লাসের কিছু ছাত্র মঞ্চের এক পাশে দাঁড়িয়ে ব্যান্ডের সঙ্গে ‘ঊর্ধ্বগগনে বাজে মাদল’ গানটি গাইবে আর সেই ঝাঁজালো ছন্দের সঙ্গে পা মিলিয়ে আমরা ‘বাদ-পড়া’ ছাত্ররা কুচকাওয়াজের ভঙ্গিতে চার সারিতে হেঁটে মঞ্চের একদিক দিয়ে ঢুকে অন্যদিক দিয়ে বেরিয়ে যাব।
ছাত্রদের ওই ভিড়ের ভেতর দর্শকেরা কাকে কতটুকু দেখতে পাবে অতশত ঝামেলা নিয়ে মাথা গরম করার সময় নেই। ছাত্রদের সবার পরিবারের সদস্যরা অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়েছেন, তাঁরা সবাই সামনে থাকবেন। নিজেদের ছেলেটিকে মঞ্চের ওপর দিয়ে যে তাঁরা হেঁটে যেতে দেখবেন ওতেই তাঁরা খুশি।
আমার উৎসাহ কিন্তু অন্য কারণে। দর্শকদের চোখের সামনে দিয়ে সংগীতের তালে তালে আমি যে সদর্পে মঞ্চের ওপর দিয়ে হেঁটে যাব, সেই দুর্লভ মুহূর্তটির জন্যেই আমি রোমাঞ্চিত। ঘটনাটা টাঙ্গাইলের করটিয়ার, ১৯৪৫ সালের। অনুষ্ঠানের দিন আমার উদ্দীপনা তুঙ্গে উঠল। উত্তেজনার জোশে দুপুরের নিয়মিত ঘুমটা পর্যন্ত হলো না।
অনুষ্ঠান সন্ধ্যা ছয়টায় শুরু হলেও আমাদের পর্বটি সবশেষে—রাত নয়টায়। আমি অস্থিরভাবে সন্ধ্যার জন্যে অপেক্ষা করতে লাগলাম। দর্শকদের সামনে দিয়ে নায়কের দৃপ্তভঙ্গিতে মঞ্চের ওপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি—এই দুর্লভ দৃশ্যের কথা ভাবতেই শরীর শিউরে উঠছে।
সবই চলছে ঠিকমতো। কিন্তু দুপুরের ঘুম না হওয়ায় দেখা দিল আসল গন্ডগোল। ওটা ছিল আমাদের দৈনন্দিন রুটিন। ঘুমোতে না চাইলেও মা আমাদের মেরে পিটিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিতেন। এর সঙ্গে আমাদের শরীর এমনই অভ্যস্ত যে দুপুরে কোনো কারণে ঘুম না হলে বিকেল পেরোলেই শরীর ঘুমে এলিয়ে আসে।
তবু অনুষ্ঠানের টানটান উত্তেজনায় বিকেল পর্যন্ত সেদিন ভালোই কাটল। কিন্তু পাঁচটা সাড়ে পাঁচটা বাজতেই টের পেলাম, শরীর ভেঙে চোখ অন্ধকার হয়ে আসছে। অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই শরীর পুরো নেতিয়ে এল। কিন্তু ঘুমিয়ে পড়লে স্টেজে ওঠার সেই অবিশ্বাস্য সুযোগের হবেটা কী! প্রায় জোর করে চোখ খুলে রাখতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু কিছুতেই পেরে উঠলাম না।
একসময় বুঝলাম বেঞ্চিতেই যেন আর বসে থাকা যাচ্ছে না। বারকয়েক দুপাশের দুজন অভিভাবকের ওপর ঢলে পড়ায় কিছুক্ষণ তাদের গজর গজর শুনতে হলো। কাছেই বাসা। ভাবলাম হাতে সময় অনেক, বাসায় গিয়ে অল্প একটু ঘুমিয়ে ফিরে এলেই হবে। বাসায় ফিরে বিছানার ওপর চিত হয়ে শুয়ে নিচে পা ঝুলিয়ে দিলাম যাতে পুরোপুরি না ঘুমিয়ে পড়ি।
শোবার আগে মাকে বলে রেখেছিলাম, রাত সোয়া আটটার আগে অবশ্যই যেন আমাকে ডেকে দেন। মা মাথা নেড়ে নিশ্চিত আশ্বাস দিলেন। আমার শরীর একেবারেই এলিয়ে পড়েছিল। শোয়ামাত্র গভীর ঘুমে ডুবে গেলাম।
কিসের শব্দে ধড়মড় করে ঘুম থেকে উঠেই দেখি চারধার সুনসান। অনেক আগেই রাত দশটা পেরিয়ে গেছে। অর্থাৎ দর্শক-সম্প্রদায়ের সামনে দিয়ে মঞ্চের ওপর নায়কের মতো হেঁটে যাওয়ার সেই দুর্লভ সুযোগ অনেকক্ষণ আগেই হাতছাড়া হয়েছে। দুঃখে অভিমানে বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠল।
কল্পনায় আমি চোখের সামনে সমবেত কণ্ঠে ‘চল্ চল্ চল্’ গানটির সঙ্গে ছাত্রদের কুচকাওয়াজ করে মঞ্চ পার হওয়ার বর্ণাঢ্য দৃশ্যটি দেখতে পেলাম, যেখানে আর সবাই আছে, কেবল আমি নেই। মাকে আমার কাছে পৃথিবীর নিষ্ঠুরতম মানুষ বলে মনে হতে লাগল। মা হয়ে এত বড় একটা সুযোগ থেকে আমাকে তিনি কী করে বঞ্চিত করতে পারলেন! আমার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।
মা কেন ডেকে দেননি, বোঝা কঠিন নয়। একটা তুচ্ছ কারণে আমার রাতের ঘুম নষ্ট হোক, এটা হয়তো তিনি চাননি। কিন্তু তিনি কী করে বুঝবেন কত বড় গৌরবের স্বর্গ থেকে তিনি আমাকে বঞ্চিত করেছেন!
জীবনের মঞ্চে ওঠার প্রথম সুযোগটি আমার এভাবে হাতছাড়া হয়ে যায়। সারাটা স্কুলজীবন ধরেই চলেছে এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। তবু যে কারণে গল্পটা এত করে বললাম, তা এটুকু বোঝানোর জন্যে যে মঞ্চে সাফল্য পাওয়ার যোগ্যতা থাক না-থাক, নিজের অজান্তে মঞ্চের জন্যে ছেলেবেলা থেকে আমার ছিল দুরপনেয় আকুতি।
এ ছিল আমার রক্তের ভেতরকার কান্নার মতো। হাজার হাজার বা শত শত দর্শকের সামনে উজ্জ্বলিত নাট্যশালায় আমি দাঁড়িয়ে আছি, এ স্বপ্ন নিজের অগোচরে শৈশব থেকে দেখতে আমি ভালোবেসেছি। জানি না সব মানুষই এভাবে দীপান্বিত মঞ্চে নিজেকে দেখতে চায় কি না। কিন্তু আমার মধ্যে নিদ্রাহীনভাবে এই স্বপ্ন যে কাজ করত, এ আমি সেই ছোট্ট শৈশব থেকেই বুঝতে পেরেছিলাম।
আমার বোকা শৈশব থেকে