
আবহাওয়ার পরিবর্তন হলে, শ্যাম্পু বদলালে বা দুশ্চিন্তায় থাকলে অনেক সময় স্বাভাবিকের তুলনায় চুল বেশি পড়ে। আবার এসব কারণ ছাড়াও হুট করে বেশি বেশি চুল পড়তে পারে। হঠাৎ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি চুল পড়ার সাধারণ কারণগুলো কী হতে পারে, চলুন জেনে নিই।
প্রতিদিন কিছু চুল পড়া স্বাভাবিক। কিন্তু যদি হঠাৎ করে চুল পড়ার পরিমাণ বেড়ে যায়—বালিশে, গোসলের সময়, মাথার ব্যান্ডে বা চিরুনিতে অতিরিক্ত চুল দেখা যায়, তাহলে সেটিকে এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়।
অনেক সময় শরীরের ভেতরে থাকা কিছু পুষ্টির ঘাটতিই চুল পড়ার আসল কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আর দুঃখজনক বিষয় হলো, এসব সংকেত আমরা প্রায়ই উপেক্ষা করি। এটি হতে পারে শরীরের ভেতরের কোনো সমস্যার প্রথম লক্ষণ।
আমাদের চুল স্বাভাবিকভাবে একটি চক্রের মধ্যে থাকে—বাড়ে, স্থির থাকে, তারপর পড়ে যায়। কিন্তু শরীরে কোনো বড় পরিবর্তন হলে অনেক চুল একসঙ্গে ‘রেস্টিং ফেজ’-এ চলে যায়। কয়েক সপ্তাহ বা মাস পর হঠাৎ ঝরতে শুরু করে। একেই বলা হয় ‘টেলোজেন ইফলুভিয়াম’।
চিকিৎসকদের মতে, চুল পড়ার অন্যতম ও অবহেলিত কারণ হলো আয়রনের ঘাটতি। শরীরে আয়রন কমে গেলে রক্তে অক্সিজেন বহনের ক্ষমতা কমে যায়, ফলে চুলের গোড়া পর্যাপ্ত পুষ্টি পায় না। ফলে চুল দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ঝরতে শুরু করে।
আর কোন কোন কারণে হঠাৎ চুল পড়তে পারে?
১. পুষ্টির ঘাটতি
আয়রনের পাশাপাশি ভিটামিন ডি, বি ১২ বা প্রোটিনের অভাব হলেও চুল দুর্বল হয়ে পড়ে।
২. হঠাৎ ওজন কমানো বা ডায়েট কন্ট্রোল করলে
ক্র্যাশ ডায়েট বা হঠাৎ করে খাবার খাওয়া কমিয়ে দিলে শরীর প্রয়োজনীয় পুষ্টি পায় না। ফলে চুল বেশি বেশি পড়তে শুরু করে।
৩. অতিরিক্ত মানসিক চাপ বা অসুস্থতা
বড় ধরনের স্ট্রেস, জ্বর, অপারেশন–পরবর্তী সময়ে বা দীর্ঘ অসুস্থতার পর স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি চুল পড়তে পারে।
৪. থাইরয়েড সমস্যা
থাইরয়েড হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হলে চুল পাতলা হয়ে যায় এবং ঝরে পড়ে।
৫. পিসিওএস
মেয়েদের ক্ষেত্রে হরমোনের অসামঞ্জস্য (বিশেষ করে অ্যান্ড্রোজেন বেশি হলে) চুল পড়ার কারণ হতে পারে।
৬. ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
কিছু ওষুধ, যেমন অ্যান্টিডিপ্রেস্যান্ট, ব্লাড থিনার বা হরমোনাল পিল চুল পড়া বাড়াতে পারে।
৭. কোভিড বা বড় ইনফেকশনের পর
অনেকেই কোভিড-১৯ বা অন্য বড় অসুখের পর কয়েক মাস ধরে চুল পড়ার সমস্যায় ভোগেন।
শরীর যখন প্রয়োজনীয় পুষ্টির ঘাটতিতে ভোগে, তখন সে প্রথমে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো—যেমন হৃৎপিণ্ড, মস্তিষ্ককে আগে পূর্ণ ‘সাপোর্ট’দেয়। চুল তখন শরীরের কাছে ‘অগ্রাধিকারহীন’হয়ে পড়ে। ফলে চুলের বৃদ্ধি কমে যায় এবং ঝরতে শুরু করে।
গর্ভাবস্থায় হরমোন, বিশেষ করে এস্ট্রোজেন বেশি থাকায় চুল কম পড়ে, ঘন দেখায়। তাই গর্ভাবস্থায় চুল সুন্দর হয়ে যায়। কিন্তু সন্তান জন্মের পর এই হরমোন দ্রুত কমে যায়। ফলে একসঙ্গে অনেক চুল পড়তে শুরু করে; এটাকে বলে ‘পোস্টপার্টাম হেয়ার লস’।
এটি সাধারণত সন্তান জন্মের ২ থেকে ৪ মাস পর শুরু হয়। ১২ মাসের মধ্যে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে যায়। এটি খুবই সাধারণ ও সাময়িক একটা ব্যাপার।
অস্বাভাবিক ক্লান্তি
দুর্বলতা
ত্বক ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া
মাথা ঘোরা বা শ্বাসকষ্ট
নখ ভঙ্গুর হয়ে যাওয়া
অনিয়মিত পিরিয়ড
কয়েক দিন বেশি চুল পড়লে এত ভাবার কিছু নেই। তবে সেটি যদি তিন মাসের বেশি সময় ধরে চলে, চুল পাতলা হয়ে মাথার ত্বক দেখা যায়, সঙ্গে ওপরের একাধিক লক্ষণ থাকে, তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রয়োজন হলে রক্ত পরীক্ষা করে আয়রন ও ভিটামিনের মাত্রা জেনে নিন। পুষ্টিকর খাবার খান। কোনো অবস্থাতেই নিজে নিজে অনুমান করে চিকিৎসা শুরু করবেন না।
তবে...
হঠাৎ চুল পড়া ভয় পাওয়ার মতো কিছু হলেও, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এটি সাময়িক এবং শরীরের ভেতরের পরিবর্তনের একটি প্রতিক্রিয়া। বিশেষ করে গর্ভাবস্থা বা সন্তান জন্মের পর এটি একেবারেই স্বাভাবিক। কারণ বুঝে সঠিক সময়ে ব্যবস্থা নিলে সমস্যা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
সূত্র: মেডিক্যাল নিউজ টুডে