ছোট্ট তিসিবীজে থাকে প্রোটিন, ওমেগা–৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, আঁশ ও অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট। অনেকেই একে পুষ্টির ভান্ডার বলেন। শতাব্দী ধরে স্বাস্থ্যকর খাবার হিসেবে এটি স্বীকৃত। আবার চুলের যত্নেও তিসিবীজ বেশ আলোচিত।

দুই ভাবে তিসিবীজ ব্যবহার করা যায়। তিসির তেল সরাসরি চুলে দিতে পারেন। আবার গুঁড়া করা তিসিবীজ খাবারের পদেও রাখা যায়। খাবার হোক বা বাহ্যিক ব্যবহার—অনেকের বিশ্বাস, এতে চুল লম্বা আর মজবুত হয়।
ঘন ও ঝলমলে চুল পেতে তিসিবীজের তেল, জেল কিংবা মাস্ক ব্যবহারের পরামর্শ দেন অনেকেই। তিসিবীজ কি চুলের জন্য সত্যিই এতটা উপকারী?
উদ্ভিজ্জ তেলগুলো চুলের কিউটিকেলকে সিল (আবরণ) করতে সাহায্য করে। এসব চুলের রুক্ষতা এবং ভেঙে যাওয়া রোধ করে চুলের বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। সামগ্রিক পুষ্টিগুণের কারণে অন্যান্য উদ্ভিজ্জ তেলের তুলনায় তিসির তেল বেশি উপকারী।
ওমেগা–৩ ফ্যাটি অ্যাসিড: তিসিবীজে থাকা ফ্যাটি অ্যাসিডের সঙ্গে মাছে পাওয়া ফ্যাটি অ্যাসিডের মিল আছে। তিসিবীজে থাকে আলফা–লিনোলেনিক অ্যাসিড (এএলএ); আর মাছে থাকে ডকোসাহেক্সায়েনোইক অ্যাসিড (ডিএইচএ) ও আইকোসাপেন্টায়েনোইক অ্যাসিড (ইপিএ)। উদ্ভিজ্জ এএলএ হৃদ্যন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। এটি শরীরের প্রদাহ কমায়। রোগ প্রতিরোধ এবং চুলের বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।
ভিটামিন বি: তিসিবীজ ভিটামিন বি–এর নির্ভরযোগ্য উৎস। ভিটামিন বি চুল মজবুত করে এবং স্বাস্থ্যকর বৃদ্ধিতে সাহায়ক।
ভিটামিন ই: এই অ্যান্টি–অক্সিডেন্টটি বাদাম ও উদ্ভিজ্জ তেলে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। ভিটামিন ই মাথার ত্বকে ফ্রি র্যাডিকেলের (অক্সিজেন বিপাকক্রিয়ায় সৃষ্ট বিষাক্ত উপজাত) প্রভাব কমায়। এতে চুলের বৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয়। পর্যাপ্ত পরিমাণে ভিটামিন ই চুলের গোড়া মজবুত করে।
চুলের পরিচর্যায় নানা উপায়ে তিসিবীজ ব্যবহার করা যায়। তবে আস্ত বা গুঁড়া করা বীজ সরাসরি ব্যবহার করা উচিত নয়। এ ক্ষেত্রে তিসির তেল ব্যবহার করতে হবে। মুদিদোকানগুলোয় তিসির তেল পাওয়া যায়।
চুলের মাস্ক হিসেবে তিসির তেল ব্যবহার করা যায়। এ জন্য হাতে অল্প পরিমাণ তেল নিয়ে চুলে মালিশ করতে হবে। এরপর ১৫ মিনিট অপেক্ষা করে শ্যাম্পু দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে।
শ্যাম্পু করার পর কন্ডিশনার ব্যবহারের আগে এটি ব্যবহার করা যায়। এ জন্য চুলে তিসির তেল লাগিয়ে কিছুক্ষণ রেখে দিতে হবে। কন্ডিশনার ব্যবহারের ঠিক আগে পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে।
তিসিবীজ দিয়ে জেলও তৈরি করা যায়। এই জেল শ্যাম্পু করার আগপর্যন্ত সারা দিন চুলে রেখে দিতে হবে।
পুষ্টিকর সাপ্লিমেন্ট হিসেবে তিসির তেলের ক্যাপসুল পাওয়া যায়। তবে ক্যাপসুলের কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। এ জন্য অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
তিসিবীজ গুঁড়া করে খাওয়া যায়। ওটমিল, সালাদ এবং অন্যান্য দানাদার খাবারের সঙ্গে এটি খেতে পারেন।
তিসিবীজে থাকা ফ্যাটি অ্যাসিড এবং অ্যান্টি–অক্সিডেন্টের কারণে চুল ধীরে ধীরে মজবুত ও মসৃণ হয়। অন্যান্য সুপারফুডের মতো তিসিবীজও সুষম খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
তিসির তেল প্রাকৃতিক হলেও এর কিছু ঝুঁকি বা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে—
পেটফাঁপা, গ্যাস, ডায়রিয়া ও কোষ্ঠকাঠিন্যর মতো হজমের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
অপরিপক্ব বা আস্ত বীজ খেলে বিষক্রিয়া হতে পারে।
রক্তচাপ কমে যেতে পারে।
প্রোস্টেট ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়।
শরীরে ইস্ট্রোজেনের মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে। গর্ভবস্থায় ভ্রূণের ক্ষতি করে।
রক্ত পাতলা করার ওষুধ, কোলেস্টেরলের ওষুধ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে ইনসুলিনের কার্যকারিতায় বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
সরাসরি ত্বকে ব্যবহারে প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।
তিসির তেল ওমেগা–৩ ফ্যাটি অ্যাসিডের ভালো উৎস। তবে তিসিবীজ থেকে পাওয়া ওমেগা–৩ শরীর সরাসরি শোষণ করতে পারে না। প্রথমে এটি ডিএইচএ এবং ইপিএতে রূপান্তরিত হয়। রূপান্তরের পর ওমেগা–৩–এর একটি ক্ষুদ্র অংশ শরীরে শোষিত হয়।
খাদ্যতালিকায় ওমেগা–৩–এর পরিমাণ বাড়াতে চাইলে চর্বিযুক্ত মাছ খেতে হবে। শরীরে ওমেগা–৩ এর চাহিদা পূরণে কেবল তিসির তেলের ওপর নির্ভর করা ঠিক নয়।
তিসিবীজ ও তিসির তেল—দুটিই স্বাস্থ্যকর উদ্ভিজ্জ উপাদান। এটি প্রতিদিনের খাবারের তালিকায় যোগ করা যেতে পারে। তবে কারও কারও ক্ষেত্রে এটি সমস্যা তৈরি করতে পারে। তাই নিয়মিত গ্রহণের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
তিসির তেল চুলকে তাৎক্ষণিকভাবে মসৃণ ও কোমল করে। তবে চুলের যত্নে কেবল তিসির তেলের ওপর নির্ভর করা যাবে না।
সূত্র: হেলথলাইন