‘মোটু’, ‘অপয়া’, ‘দুর্ভাগা’ থেকে ব্যালন ডি’অরজয়ী হ্যারি কেইন
বাংলাদেশ সময় আজ মঙ্গলবার ভোরে ব্যালন ডি’অর জিতে নিলেন ইংলিশ ফুটবলার হ্যারি কেইন। ৩৩ বছর বয়সী হ্যারি কেইনের বিশ্বজয়ের গল্পে একদিকে আছে হতাশা, আরেক দিকে আছে হার না–মানার প্রত্যয়। ছবিতে ছবিতে সদ্য ব্যালন ডি’অরজয়ীর জীবনের গল্পটি জেনে নিন।
জীবনযাপন ডেস্ক
লামিনে ইয়ামাল, কিলিয়ান এমবাপ্পে, রদ্রিদের মতো তারকাকে পেছনে ফেলে প্রথমবারের মতো ব্যালন ডি’অর জিতে নিলেন ইংলিশ ফুটবলার হ্যারি কেইন। আজ ভোর পাঁচটায় লন্ডনের প্যলাডিয়াম থিয়েটারে হ্যারি কেইন উঁচিয়ে ধরলেন ব্যালন ডি’অরের সোনালি শিরোপা ৯ বছর আগে একই মঞ্চে প্রথমবারের মতো ব্যালন ডি’অরের মনোনয়ন পেয়েছিলেন হ্যারি কেইন। সেখান থেকে মঞ্চে এসে রোনালদো নাজারিওর হাত থেকে শিরোপা নেওয়ার পথটা সহজ ছিল না
ছোটবেলায় কেইনকে বয়সভিত্তিক দল থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল ‘নাদুসনুদুস’ বলে। ও রকম শরীর নিয়ে ফুটবল নাকি খেলা যায় না। আর্সেনালের পর টটেনহাম থেকেও বাদ পড়েছিলেন তিনি। ১১ বছর বয়সে ওয়াটফোর্ডের হয়ে টটেনহামের বিপক্ষে ভালো খেলে দেখিয়ে দেন কেইন। ভুল বুঝতে পেরে তাঁকে দলে টানে টটেনহাম সেই থেকে শুরু হয় টটেনহাম ও কেইনের জুটি। প্রথম প্রথম তাঁর ওপর খুব একটা ভরসা করতেন না কোচরা। কিন্তু আর্জেন্টাইন কোচ মাউরিসিও পচেত্তিনো ভরসা রেখেছিলেন। সেখান থেকেই বদলে যায় তাঁর ক্যারিয়ার। হ্যারি কেইন পরিণত হন ইংল্যান্ডের সবচেয়ে ‘ভয়ংকর’ গোলদাতায় প্রতি মৌসুমেই গোলের বন্যা বইয়ে দিতেন কেইন। ভালো খেলার সুবাদে ইংল্যান্ড দলেও ডাক পান। কিন্তু বিপত্তি বাধে এক জায়গায়। কেইন যতই ভালো খেলেন না কেন, দল তো শিরোপার দেখা পায় না
কথায় আছে, ‘অভাগা যেদিকে চায়, সাগরও শুকায়ে যায়’। হ্যারি কেইন ছিলেন তার সেরা উদাহরণ। টটেনহাম ও ইংল্যান্ড, এমন দুই দুর্ভাগা দল, যেখানে নিজের সর্বোচ্চ দিয়েও পেতেন না শিরোপার দেখা। সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার নিয়ে বাড়ি ফিরতেন, কিন্তু শিরোপা থাকত অধরা টটেনহাম ও ইংল্যান্ডের হয়ে মোট ছয়বার রানার্সআপ হয়েছেন কেইন। ফাইনাল হেরেছেন ৫টি, ২০১৮ বিশ্বকাপে হয়েছেন চতুর্থ আর ২০২৬ বিশ্বকাপে তৃতীয়। এককথায়, শিরোপার কাছে এলেই খেই হারাত তাঁর দল সেখান থেকেই কেইন সিদ্ধান্ত নেন দল বদলানোর। টটেনহাম ছেড়ে যোগ দেন জার্মানির সবচেয়ে বড় দল বায়ার্ন মিউনিখে। এখানে এসেও চলতে থাকে গোলবন্যা। সেই সঙ্গে যুক্ত হতে থাকে একের পর এক শিরোপা
ফুটবলে দিন শেষে শিরোপার মূল্য বাকি সবকিছু থেকেই বেশি। কেইন যখন থেকে জিততে শুরু করলেন, স্পটলাইটও পরতে শুরু করল তাঁর ওপর। একসময় পুরো বছর সেরা পারফরম্যান্স দিয়েও যেখানে নজরে আসতেন না, সেখানে এখন এক পারফরম্যান্সেই তাঁকে নিয়ে কথা হয় মাসের পর মাস সেটাই যেন শাপে বর হলো কেইনের। এই মৌসুমে তাঁর পারফরম্যান্সকে টেক্কা দেওয়ার মতো ছিল না কেউ। যেমন ক্লাবের জার্সিতে দুর্দান্ত, তেমনই বিশ্বকাপেও। তাই তো কেইনের হাতে ব্যালন ডি’অর দেখে কারও কোনো অভিযোগ নেই কেইনের জীবনে এই চড়াই–উতরাই সামনে থেকে দেখেছেন স্ত্রী কেইট গুডল্যান্ড। কেইনের সবচেয়ে বড় অণুপ্রেরণার নামও গুডল্যান্ড। একেবারে প্রাইমারি স্কুলে থাকতে তাঁদের পরিচয়, দুজনেরই বয়স তখন মাত্র ৪! কেইন মজা করে তাই বলেন, তাঁরা দুজন ‘চাইল্ডহুড সুইটহার্ট’
৩৩ বছরের জীবনের ২৯ বছরই কেইন কাটিয়েছেন কেইট গুডল্যান্ডের সঙ্গে। একই পাড়ায় বড় হয়েছেন। স্কুল, কলেজ থেকে শুরু করে খেলার মাঠ—সব জায়গায়ই সঙ্গী ছিলেন তিনি। যদিও গুডল্যান্ডের ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন সত্যি হয়নি, হয়েছেন ফিজিক্যাল এডুকেশনের শিক্ষক। পড়াশোনা শেষ করে গুডল্যান্ড এখন পেশাদার ফিটনেস কোচ ১৬ বছর বয়স থেকে দুজনের প্রেম, ২০১৯ সালে বিয়ে করেন। তাঁদের চার সন্তান। দুই মেয়ে আইভি ও ভিভিয়ান কেইন এবং দুই ছেলে লুইস ও হেনরি কেইন ব্যালন ডি’অর জেতার পর কেইন প্রথমে জড়িয়ে ধরলেন নিজের স্ত্রীকে। ভাষণেও তাঁকে সবচেয়ে বড় ধন্যবাদ দিতে ভুল করেননি। ধন্যবাদ জানিয়েছেন নিজের সব কোচ আর ভক্তদের, যাঁরা তাঁর ওপর আশা হারাননি কখনো ‘চুপিসারে নিজের কাজটা ঠিকঠাক করে যাও, সাফল্যই তোমার হয়ে কথা বলবে’—ব্যালন ডি’অর জেতার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেইনের এই বক্তব্যই যেন দশ কথার এক কথা। বছরের পর বছর করা পরিশ্রমের ফল কেইন পেলেন ৩৩ বছর বয়সে এসে। একসময়ের ‘মোটু’, ‘অপয়া’ আর ‘দুর্ভাগা’ কেইনই ব্যালন ডি’অর হাতে আজ সেরাদের কাতারে