
মিলেনিয়াল ও জেন–জি প্রজন্মের মাঝখানে যে একটি ছোট প্রজন্ম রয়েছে, সেটি কি জানেন? সেই প্রজন্ম হলো জিলেনিয়াল। সাধারণত ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৯ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া মানুষদের বলা হয় জিলেনিয়াল। তাঁরা এমন এক সময়ে বড় হয়েছেন, যখন পৃথিবী দ্রুত বদলে যাচ্ছিল। অর্থাৎ ইন্টারনেট আসছিল, কিন্তু তখনো জীবন পুরোপুরি ডিজিটাল হয়ে ওঠেনি। ফলে তাঁদের অভিজ্ঞতা যেন মিলেনিয়াল ও জেন–জি—এই দুই প্রজন্মের মাঝামাঝি। চলুন, শুনি এই প্রজন্মের গল্প।
বাংলাদেশের অনেক জিলেনিয়ালের শৈশব কেটেছে এমন এক সময়ে, যখন স্মার্টফোন বা দ্রুতগতির ইন্টারনেট ছিল না। বিকেলে মাঠে ক্রিকেট বা ফুটবল খেলা, টিভিতে কার্টুন দেখা কিংবা ভিসিডি–ডিভিডিতে সিনেমা দেখা—এসবই ছিল বিনোদনের প্রধান মাধ্যম। বিটিভিতে কার্টুন দেখার সেই দিনগুলো, স্কুল শেষে বন্ধুদের সঙ্গে মাঠে দৌড়ঝাঁপ কিংবা সাইবার ক্যাফে গিয়ে জীবনের প্রথম ইন্টারনেট ব্যবহার করার অভিজ্ঞতা—এসব স্মৃতি এখনো অনেকের মনে স্পষ্ট।
কিন্তু কৈশোর বা বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে এসে এই প্রজন্ম একেবারে ভিন্ন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে। ফিচার ফোনের জায়গা নিয়েছে স্মার্টফোন; আর ফেসবুক, ইউটিউবসহ নানা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যেন হঠাৎ জীবনের কেন্দ্রে চলে এসেছে। ফলে অনেক জিলেনিয়ালের মনে হয়, তাঁরা যেন দুই যুগের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছেন—একদিকে অ্যানালগ ও অফলাইন শৈশব, অন্যদিকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল এক যৌবন। এই দুই অভিজ্ঞতার মিশ্রণই তাঁদের প্রজন্মগত পরিচয়কে আলাদা করে তোলে।
বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম জনপ্রিয় হওয়ার শুরুটিও এই প্রজন্মের সময়ে। একসময় অনেকেই ইয়াহু মেসেঞ্জার ব্যবহার করতেন, যেখানে বন্ধুদের সঙ্গে চ্যাট বা ছবি শেয়ার করা ছিল মজার ও গুরুত্বপূর্ণ কাজ। পরে ধীরে ধীরে সবাই ফেসবুকে স্থানান্তরিত হন।
ফেসবুকের সেই দিনগুলোয় দীর্ঘ স্ট্যাটাস লেখা, ব্লগধর্মী অভিব্যক্তি শেয়ার করা অথবা ব্যক্তিগত ছবির অ্যালবাম পোস্ট করা ছিল খুবই স্বাভাবিক। এখনকার জেন–জি প্রজন্ম যেখানে টিকটক, ইনস্টাগ্রাম বা ছোট ভিডিওর দুনিয়ায় অভ্যস্ত, সেখানে জিলেনিয়ালদের ডিজিটাল যাত্রা শুরু হয়েছে তুলনামূলকভাবে ধীরগতির ও চিন্তাশীল সময় থেকে। এ কারণে অনেক জিলেনিয়াল মনে করেন, তাঁরা পুরোপুরি জেন–জি নন, আবার পুরোনো মিলেনিয়ালদের মতোও পুরোপুরি নন। তাঁরা যেন দুই ডিজিটাল যুগের সন্ধিক্ষণ।
বাংলাদেশের অনেক জিলেনিয়াল বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করেছেন গত এক দশকের মধ্যে। এ সময়ে চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা বেড়েছে, নতুন দক্ষতার প্রয়োজন তৈরি হয়েছে, আর প্রযুক্তিনির্ভর কাজের সুযোগও বেড়েছে। একদিকে করপোরেট চাকরি, অন্যদিকে ফ্রিল্যান্সিং, স্টার্টআপ বা অনলাইন পেশা—সব মিলিয়ে তাঁদের সামনে তৈরি হয়েছে নতুন বাস্তবতা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে করোনাভাইরাসের মহামারি, যা অনেকের শিক্ষা ও ক্যারিয়ারের পরিকল্পনা বদলে দিয়েছে। অনেকেই তখন অনলাইন ক্লাস, অনিশ্চিত চাকরির বাজার বা নতুন করে দক্ষতা শেখার চাপে পড়েছেন। ফলে এই প্রজন্মকে অনেক সময় বলা হয়—পরিবর্তনের প্রজন্ম।
জিলেনিয়ালদের মধ্যে একটি বিষয় খুব স্পষ্ট—নস্টালজিয়া। তাঁরা এমন একটি সময় দেখেছেন, যখন শিশুদের জীবন ছিল তুলনামূলক অফলাইন। বন্ধুত্ব মানে ছিল একসঙ্গে খেলাধুলা বা আড্ডা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চাপ তখনো তেমন ছিল না। অনেকেই মনে করেন, সেই সময়ের স্মৃতিগুলো তাঁদের কাছে বিশেষ মূল্যবান। এ কারণে প্রায়ই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা যায়, শৈশবের কার্টুন, পুরোনো খেলাধুলা বা ২০০০ দশকের স্মৃতি নিয়ে নানা আলোচনা।
তবে সমাজবিজ্ঞানীদের অনেকেই মনে করেন, প্রজন্মের এই বিভাজন সব সময় খুব স্পষ্ট নয়। একই প্রজন্মের মানুষের অভিজ্ঞতা ভিন্ন হতে পারে, বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে শহর ও গ্রামের জীবনধারা বা সামাজিক বাস্তবতা অনেক আলাদা। তাই অনেক গবেষকের মতে, প্রজন্মের লেবেলগুলো অনেক সময় আলোচনার জন্য আকর্ষণীয় হলেও এগুলো সব সময় মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতাকে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করতে পারে না।
বাংলাদেশের তরুণসমাজের ভেতর জিলেনিয়ালরা যেন একধরনের সেতুবন্ধ। তাঁরা এমন এক সময়ে বড় হয়েছেন, যখন পৃথিবী দ্রুত বদলাচ্ছিল—অফলাইন শৈশব থেকে ডিজিটাল জীবনে প্রবেশের সেই পরিবর্তনের সাক্ষী তাঁরা। এ কারণে অনেকের কাছে জিলেনিয়ালরা শুধু একটি প্রজন্ম নয়; বরং একটি পরিবর্তনের সময়ের গল্প।
সূত্র: ট্রিল