
এ দেশে নাকফুল শুধুই একটি গয়নার নাম নয়। স্মৃতিমধুর কিছু উদাস সময়েরও নাম। মায়ের নাকে দুপুরের রোদ পড়ে ঝিক করে ওঠা আলোর নাম নাকফুল। কিংবা পথের পাঁচালিতে দুর্গার আনমনে বলে যাওয়া ‘হলুদ বনে বনে, নাকচাবিটি হারিয়ে গেছে, সুখ নেইকো মনে’ ছড়া পড়ে উদাস হয়ে যাওয়া কিশোরীটির ছেলেবেলার নামও নাকফুল। আকৃতি, নকশা বা রং বদলে নাকফুল বারবার ঠাঁই করে নিয়েছে এ দেশের সাধের গয়নার তালিকায়। নতুন চেহারা আর ধারা নিয়ে নাকফুল এখন আবার জনপ্রিয়।
নাক ফোঁড়ানো নেই, তাই পরা হয় না নাকফুল। এ কথাকে বিদায় দেওয়া যায়। এখনকার নাকফুলগুলোর সুবিধাই হলো এটা। বানানোই হচ্ছে এমনভাবে যে কেউ পরতে পারবেন। নকশাগুলোতেও বেশ ভিন্নতা পেয়ে যাবেন। কখনো থাকছে দেশীয় নকশার ছোঁয়া, কখনো বা পেয়ে যাবেন অন্য দেশের নকশার ছোঁয়া। গয়না নির্মাতা কনকের প্রধান ডিজাইনার ও স্বত্বাধিকারী লায়লা খায়ের জানালেন, দেড় বছর ধরেই বড় নাকফুলের প্রতি আগ্রহ তৈরি হচ্ছিল সবার। আজকাল পোশাক ও অনুষঙ্গে পড়েছে পশ্চিমা প্রভাব। সেখানে কান-গলা-হাতের গয়না পুরোপুরি মানায় না। তিনি বললেন, ‘আমাদের দেশি নাকফুল অদ্ভুত সুন্দর লাগে। পশ্চিমেরই আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, অতিরিক্ত ঝলমলে ধাতু যেমন সোনা, হিরার ব্যবহার এড়িয়ে চলা। সেই চাহিদা পূরণ করছে রুপা। অতিরিক্ত ঝলমলও করে না, আবার ঐতিহ্যবাহী নকশা ফোটালেও দারুণ মানায় যেকোনো পোশাকের সঙ্গে। অবশ্য এটি যে সম্পূর্ণ পশ্চিমের রীতি, তা কিন্তু নয়।’ আমরা যারা রবিঠাকুরের ছোটবেলার স্মৃতিচারণা পড়েছি, সেখানে দেখেছি, সেই সময়ের নারীরাও সোনার গয়নার ওপরে একটি আলাদা কাপড় জড়িয়ে রাখতেন, যেন অতিরিক্ত চকচক না করে। গয়নার চাকচিক্য কমিয়ে অভিজাত রূপ দেওয়ার চর্চা আমাদের প্রাচীন রীতির অংশ।
একটু সাদাটে ধরনের ধাতুতে তৈরি এই নতুন ধাঁচের নাকফুলগুলো মূলত তৈরি হয় দেশি ও জার্মান রুপায়। পাশাপাশি অন্য ধাতু যেমন পিতল বা দস্তায়ও তৈরি হচ্ছে। ধাতু যা-ই হোক, তাতে অক্সির কাজ বেশি দেখা যাচ্ছে। আড়ংয়ের অ্যাকসেসরিজ বিভাগের প্রধান নির্বাহী শাহীনা রাব্বি বলেন, ‘আমরা মূলত রুপার নাকফুলগুলোই রাখি। অন্যান্য ধাতুতে নাক পেকে যাওয়ার কিংবা দাগ হওয়ার শঙ্কা থেকে যায়। বিশেষ কিছু আয়োজনে এই নাকফুলগুলো খুব মানায়। গায়েহলুদ, মেহেদি উৎসব, পূজা কিংবা যেকোনো দেশি সাজের সঙ্গে পরতে এই নাকফুলগুলো কিনছেন তরুণীরা। তবে যাঁরা কৈশোরের সীমা পেরিয়েছেন, তাঁদের মধ্যেই এগুলোর কদর বেশি।’
একই কথা বলছিলেন অনলাইনভিত্তিক দোকানের উদ্যোক্তা হাটবাজারের অন্যতম স্বত্বাধিকারী ফাতেহা আক্তার। তিনি বললেন, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া তরুণী, কর্মজীবী ও সদ্য বিবাহিতা নারীদের মধ্যে ভীষণ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে বড় নাকফুল। এগুলোর ডিজাইনে থাকছে জয়পুরি কাজ, ফুল, পাতা ও তারার আকৃতি এবং নকশা। জ্যামিতিক ধাঁচের মাঝে আছে গোল, তিনকোনা কিংবা রেখার বিভিন্ন আকৃতি। শুধু নকশা নয়, কিছু নাকফুলে থাকছে রং ও পাথরের কারুকাজও।
এই নাকফুল খুঁজতে গিয়েছিলাম চাঁদনি চকের গয়নাগুলোর দোকানে। নাচের ও অক্সি ধাঁচের গয়নার বিশেষায়িত দোকানগুলোতে পাওয়া গেল এমন নাকফুলগুলো। পায়েল জুয়েলার্সের অন্যতম নির্বাহী মো. রিপন বললেন, এই নাকফুলগুলোতে মাদ্রাজি একটা প্রভাব আছে। শুধু পাথর বা রুপার বসানো বা টিপ নাকফুল নয়; দক্ষিণ ভারতের ঝোলা, ভারী কাজ করা নাকফুলগুলোও অনেকে খুঁজছেন এখন। সামনে ওগুলোর জনপ্রিয়তাও বাড়বে বলে ধারণা করছেন তিনি। আরও বললেন, নকশাগুলো মূলত প্রভাবিত হতে পারে, ম্যাটেরিয়াল তো দেশেই পাওয়া যায়।
সাজ
নাকফুল নিয়ে সবচেয়ে সত্যি কথাটা সম্ভবত এই যে সবার নাকে সব নাকফুল মানায় না। নাক ও মুখের আকৃতির সঙ্গে নাকফুলের সমীকরণ মেলাতে পারলেই আপনার লুক বদলানো সম্ভব। এই যেমন মুখ ছোট হলে নাকফুল ছোট হবে, মুখ বড় হলে নাকফুলও বড়। সমীকরণ না মিললেও সমস্যা নেই, শখ তো শখই। মেকআপ আর পোশাকের জ্যামিতিতেও কিন্তু নাকফুল ফুটিয়ে তোলা সম্ভব। কিউবেলার প্রধান রূপবিশেষজ্ঞ ফারজানা মুন্নি বললেন, নাকফুল ফোটাতে মেকআপ হালকা হওয়া চাই। শীতের সময় উজ্জ্বল বেগুনি, বারগেন্ডি রংগুলো চলছে। তবে দিন ও রাত বুঝে রং বাছাই করতে হবে। কাজল অবশ্যই পরবেন। সঙ্গে সুতির সালোয়ার-কামিজ আর শাড়ি পরতে পারেন। সুতির পোশাক আর কাজলের প্রতি যাঁদের আসক্তি প্রবল, তাঁদের কাছে ঝোলা নোলক সব সময়ই পছন্দের। নাকফুল বা নথ ছাড়াও এই সময়ে আবার শুরু হয়েছে নথের চল। বলে রাখা ভালো, নোলক ও নথে ঠাঁই করে নিচ্ছে সোনালি রং ও পাথরের কারুকাজ। ওখানে রুপার রংটা নেই বললেই চলে।
দরদাম
এই নাকফুলগুলোর দাম বেশি না। আড়ং, দেশি দশের মতো ব্র্যান্ডের দোকানে দাম শুরু হবে ৩০০ কি ৫০০ টাকায়। অনলাইনে ফরমাশ দিলে ২৫০ টাকা থেকে শুরু হবে দাম। চিরচেনা নিউমার্কেট ও চাঁদনীচকে ১০০ কি ২০০ টাকার মধ্যেই পেয়ে যাবেন একটি নাকের ফুল। দামি পাথর যেমন হিরা, জিরকনের কাজ করা নাকফুল চান? তবে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা খরচ হয়ে যাবে। তবে কোনো দামই যে নাকফুলের জন্য নারীর চিরায়ত আবেগের কাছে কিছু না, এ বিষয়ে নিশ্চিত থাকতে পারেন।