ঘরে অনেক কাপ–মগ থাকলেও চা বা কফি খাওয়ার সময় অজান্তেই কি বারবার একই মগ হাতে তুলে নেন? সেটি হয়তো সবচেয়ে দামি নয়, সবচেয়ে সুন্দরও নয়। কোথাও সামান্য চিড় ধরেছে, রংও কিছুটা ফিকে হয়ে গেছে। তবু সেটিই যেন সবচেয়ে আপন লাগে। কেন?
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি কাকতালীয় নয়। মানুষের মস্তিষ্কের দুটি সুপরিচিত মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব—‘এনডাউমেন্ট ইফেক্ট’ ও ‘মিয়ার এক্সপোজার ইফেক্ট’ এর পেছনে কাজ করে।
১৯৯০ সালে মনোবিজ্ঞানী ড্যানিয়েল কাহনেম্যান এবং অর্থনীতিবিদ জ্যাক নেটশ ও রিচার্ড থ্যালার এক গবেষণা চালান। তাতে অংশগ্রহণকারীদের হাতে একটি কফির মগ তুলে দেওয়া হয়।
এরপর তাঁদের জিজ্ঞেস করা হয়, মগটি ছেড়ে দিতে কত টাকা চাইবেন? অন্যদিকে যাঁদের কাছে মগটি ছিল না, তাঁদের জিজ্ঞেস করা হয়, একই মগ কিনতে কত টাকা দিতে রাজি।
ফল ছিল চমকপ্রদ। যাঁদের হাতে মগটি ছিল, তাঁরা সেটি ছাড়তে অনেক বেশি টাকা দাবি করেন। অর্থাৎ কোনো বস্তু আমাদের নিজের হয়ে গেলে মস্তিষ্ক সেটিকে আগের তুলনায় বেশি মূল্যবান বলে মনে করতে শুরু করে। মনোবিজ্ঞানে এটিই এনডাউমেন্ট ইফেক্ট নামে পরিচিত।
আরেকটি ব্যাখ্যা আসে মিয়ার এক্সপোজার ইফেক্ট থেকে। মনোবিজ্ঞানী রবার্ট জায়ন্স দেখিয়েছিলেন, কোনো বস্তু, মুখ বা শব্দের সঙ্গে আমরা যত বেশি পরিচিত হই, ততই সেটির প্রতি আমাদের পছন্দ বাড়তে থাকে।
আপনি প্রতিদিন একই মগে চা খেলে ধীরে ধীরে সেটিই আপনার কাছে সবচেয়ে স্বাভাবিক ও আরামদায়ক মনে হবে। সেটি অন্য মগের চেয়ে ভালো বলেই নয়, বরং বারবার ব্যবহার করার কারণেই।
প্রথমে মগটি নিজের হওয়ায় তার মূল্য আপনার কাছে বেড়ে যায়। এরপর প্রতিদিনের ব্যবহারে সেটির সঙ্গে তৈরি হয় পরিচিতি ও স্বস্তির অনুভূতি। সময়ের সঙ্গে মগটির ছোটখাটো দাগ, চিড় বা রং ফিকে হয়ে যাওয়াও আর ত্রুটি মনে হয় না; বরং সেটিই হয়ে ওঠে আলাদা পরিচয়।
এ কারণেই বহু বছর ব্যবহার করা একটি সাধারণ মগ অনেক সময় নতুন ও দৃষ্টিনন্দন মগের চেয়ে বেশি প্রিয় হয়ে ওঠে।
তাই প্রিয় মগটি বদলে নতুন একটি মগ ব্যবহার করতে গেলে অনেকের অস্বস্তি লাগে। নতুন মগটির সঙ্গে এখনো কোনো স্মৃতি বা পরিচিতি তৈরি হয়নি। ফলে সেটি দেখতে যত সুন্দরই হোক, পুরোনো মগের মতো আপন লাগে না।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি অতিরিক্ত আবেগ নয়। বরং মানুষের মস্তিষ্ক পরিচিত ও নিজের বলে মনে হওয়া জিনিসের প্রতি স্বাভাবিকভাবেই বেশি আকৃষ্ট হয়।
তাই প্রতিদিন সকালে একই মগে চা বা কফি খাওয়ার অভ্যাসের পেছনেও কাজ করে মানুষের মনস্তত্ত্বের সুপ্রতিষ্ঠিত কিছু বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা।
সূত্র: জার্নাল অব পলিটিক্যাল ইকোনমি ও জার্নাল অব পারসোনালিটি অ্যান্ড সোশ্যাল সাইকোলজি