
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আসা অজ্ঞাতনামা রোগীদের শুশ্রূষা দেন আলিয়া বেগম। তাঁরা সুস্থ হয়ে উঠলে ঠিকানা খুঁজে বাড়ি পৌঁঁছে দেওয়ারও ব্যবস্থা করেন। এ উদ্যোগ অব্যাহত রাখতে হাসপাতালে তাঁকে একটি কক্ষও দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। আলিয়ার মানবপ্রেমের গল্প শোনাচ্ছেন আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ
মেয়েকে নিয়ে বাবার বাড়িতে থাকতেই রওশন আরা জানতে পারেন, আরেকটা বিয়ে করেছেন তাঁর স্বামী। আর কোনো দিন স্বামীর বাড়িতে ফিরে যাননি তিনি। একসময় জীবিকার প্রয়োজনে মেয়ে আলিয়াকে নিয়ে সিরাজগঞ্জ থেকে চলে আসেন রাজশাহী। শহরে শুরু হয় মা–মেয়ের সংসার।
১৯৯৯ সালে আলিয়াকে বিয়ে দেন তাঁর মা। তখন তাঁর বয়স মোটে ১৩ বছর। কিন্তু চাহিদামতো যৌতুকের টাকা দিতে না পারায় তিন বছরের মাথায় আলিয়াকে ফেলে চলে যান তাঁর স্বামী। তত দিনে তাঁর একটা মেয়ে হয়েছে, নাম টুম্পা। খোঁজখবর নিতে গিয়ে দেখেন, মোটা অঙ্কের যৌতুক নিয়ে আরেকজনকে বিয়ে করেছেন স্বামী। মেয়েটা আবার প্রতিবন্ধী। মামলা করলে প্রতিবন্ধী মেয়েটা বিপদে পড়বে ভেবে ফিরে
আসেন আলিয়া।
দেড় বছর বয়সের মেয়েকে নিয়ে তো চলতে হবে। বই বাঁধাইয়ের কাজ নিলেন আলিয়া। এক হাজার পৃষ্ঠা বাঁধাই করলে পান ২৫ টাকা। তাতে সংসার চলে না। এ সময় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স নূরজাহান বেগমের সঙ্গে পরিচয়। তিনিই তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যান। সেই থেকে হাসপাতালে ট্রলি ঠেলতে শুরু করেন আলিয়া।
একদিন আলিয়ার চোখের সামনেই মারা যায় দুজন মানুষ। তাদের কোনো পরিচয় জানা গেল না। বিষয়টি তাঁকে চরমভাবে নাড়া দিল। তখন থেকে অভিভাবকহীন রোগী হাসপাতালে এলেই ছুটে যান আলিয়া। মুখে একটু পানি দেন, নিজের টাকা দিয়ে হলেও কিনে আনেন জরুরি ওষুধ। মানুষকে সুস্থ করে তুলতে পারলেই মুখে হাসি ফোটে। রোগী সুস্থ হয়ে উঠলে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। দুই যুগে কয়েক শ মানুষকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন আলিয়া।
আলিয়ার বয়স এখন ৩৯। রাজশাহী নগরের হেতেম খাঁ এলাকায় থাকেন। ভাড়া বাড়িতে তাঁর সঙ্গেই থাকেন মা রওশন আরা ও মেয়ে টুম্পা। সম্প্রতি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাঁকে দৈনিক মজুরিভিত্তিক কর্মচারী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। এখন আর রাতে বাড়ি গিয়ে বই বাঁধাইয়ের কাজ করতে হয় না। তাঁর মেয়েটা নার্সিংয়ে ডিপ্লোমা করছে।
আলিয়ার মানবিক উদ্যোগের সঙ্গী হয়েছে সমাজসেবা অধিদপ্তর। আলিয়ার রোগীদের চিকিৎসা ও তাঁদের বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার খরচ তারাই বহন করে। বিনিময়ে আলিয়া কারও কাছ থেকে কিছু নেন না। শুধু পথ হারানো এসব মানুষকে পরিবারে পৌঁছে দেওয়ার আনন্দটুকু উপভোগ করেন।
আগে অসুস্থ রোগী সুস্থ হলে ঠিকানা শুনে অথবা বাক্প্রতিবন্ধী হলে মৃত্যুর পর ‘ফিঙ্গারপ্রিন্ট’ বের করে লাশ পৌঁছে দিতেন। এটা তাঁর একটা নেশা। এবার উদ্যোগ নিয়েছেন, মৃত্যুর পর নয়, আগেই ফিঙ্গারপ্রিন্ট নিয়ে তাঁদের পরিচয় বের করবেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাঁর প্রস্তাব গ্রহণ করেছে। এখন কথা বলতে পারুক আর না পারুক, সুস্থ করে সব রোগীকেই বাড়ি পৌঁছে দিচ্ছেন আলিয়া। এই রোগীদের বাড়ি পৌঁছে দিতে গিয়েও কত অভিজ্ঞতা।
নভেম্বর ২০২৪। পারুল বেগম নামের প্রতিবন্ধী এক নারীকে সুস্থ করার পর ফিঙ্গারপ্রিন্টের মাধ্যমে তাঁর ঠিকানা বের করেন। যশোরে বাড়ি গিয়ে পারুলের জীবনের গল্প শুনে হতভম্ব হয়ে যান। সাত ভাইয়ের এক বোন পারুল। তাঁদের মা স্ট্রোক করার পর পারুলকে তাঁর ফুফুর কাছে রাখা হয়েছিল। ঝামেলা এড়াতে পারুলকে একটা ট্রেনে তুলে দেন তাঁর ফুফু। সেই পারুল দুর্ঘটনায় আহত হয়ে কীভাবে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন, জানা যায়নি। তাঁকে সুস্থ করে আলিয়া যখন বাড়ি নিয়ে গেলেন, তখন বোনকে পেয়ে ছোট ভাই খুব খুশি। কিন্তু বোন এখন কার কাছে থাকবেন, এ নিয়ে তাঁর সামনেই ভাইদের মধ্যে দ্বন্দ্ব লেগে গেল। আলিয়া বলছেন, তাঁর বাড়িতে রাখার জায়গা থাকলে পারুলকে ফিরিয়ে নিয়ে আসতেন। তাঁর ঠিকানা খুঁজে পেয়ে খুব খুশি হয়েছিলেন, কিন্তু এই পরিস্থিতি দেখে আসার সময় খুব দুঃখ নিয়ে
বাড়ি ফিরেছেন।
ঈশ্বরদীর একটি সিএনজি স্টেশনের পাশ থেকে গুরুতর জখম ও পোড়া এক নারীকে উদ্ধার করে ঈশ্বরদী হাসপাতালে ভর্তি করেন এক রিকশাওয়ালা। সেখান থেকে সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে পাবনা হাসপাতাল হয়ে গত আগস্টে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আসেন। ফিঙ্গারপ্রিন্ট থেকে জানা যায়, তাঁর নাম পারভীন। বয়স ৪৮। বাড়ি দিনাজপুর। ঠিকানা জোগাড়ের পর পারভীনের মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেন আলিয়া। তাঁর মা বলছেন, ৯ বছর আগে হারিয়ে গেছে তাঁর মেয়ে। তাঁরা ধরে নিয়েছেন, মেয়ে মারা গেছেন। এখন তাঁরা মনে করছেন, মেয়ের নামে টাকাপয়সা নেওয়ার জন্য ফাঁদ পেতেছে একটা চক্র। এ জন্য তাঁরা মেয়েকে নিতেও আসছেন না। আলিয়ার পরিচর্যায় প্রায় সুস্থ হয়ে উঠেছেন পারভীন। আরেকটু সুস্থ হলেই তাঁকে বাড়ি দিয়ে আসবেন আলিয়া।
২০১২ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ট্রেনে ১০ বছর বয়সী এক শিশুর হাত-পা কাটা পড়ে। পরে চিকিৎসা ও আলিয়ার শুশ্রূষায় সে সুস্থ হয়ে ওঠে। কোনো ঠিকানা না পাওয়ায় ১৩ বছর ধরে তাকে নিজের কাছেই রেখে দিয়েছিলেন আলিয়া। গত ২৭ জানুয়ারি মারা গেছে ছেলেটা।
আর্জিনা নামের ২৫ বছর বয়সী এক মেয়ে এখন হাসপাতালে আছেন। তাঁর একটা পায়ে পচন ধরেছে। মা–বাবা নেই। চাচারা এনে হাসপাতালে রেখে গেছেন। প্রাণপণে তাঁকে সুস্থ করার চেষ্টা করছেন আলিয়া। একটু সুস্থ হয়ে আর্জিনা বলছেন, ‘জীবনে কখনো মায়ের আদর পাইনি। আপনিই আমার মা।’ আলিয়া বলেন, ‘মানুষের মুখ থেকে এই কথাগুলো শুনলে আমার আর কোনো কষ্ট থাকে না।’
*লেখাটি প্রথম আলোর বিশেষ ম্যাগাজিন ‘বর্ণিল ভালো থাকুন ২০২৫’ থেকে নেওয়া।