সম্প্রতি ফেসবুকে একটি ভিডিও চোখে পড়ল—প্রেশার কুকারে তেজপাতা দিয়ে রান্না করলে নাকি বিস্ফোরণ হতে পারে! দাবি করা হচ্ছে, রান্নার সময় তেজপাতা ভেসে ওপরে উঠে আসে এবং প্রেশার কুকারের ঢাকনার ছিদ্র (যেখান দিয়ে বাতাস বা স্টিম বের হয়) পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। ফলে ভেতরের বাষ্প বের হতে না পেরে কুকারটি বোমার মতো বিস্ফোরিত হয়। তথ্যটি কি নিছক গুজব, নাকি এর পেছনে সত্যিই কোনো বৈজ্ঞানিক কারণ লুকিয়ে আছে? চলুন, বিস্তারিত জানা যাক।

শুরুতেই বলে রাখি, তথ্যটি ভুল নয়। প্রেশার কুকারে আস্ত তেজপাতা ব্যবহারের কারণে সত্যিই বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে এবং এটি সম্পূর্ণ বিজ্ঞানসম্মত একটি বিষয়।
প্রেশার কুকার কীভাবে কাজ করে, তা আমরা সবাই কমবেশি জানি। এর ভেতরে পানি ফুটে প্রচুর পরিমাণে বাষ্প তৈরি হয়। এই বাষ্প ভেতরের চাপ বাড়িয়ে দিয়ে খাবার দ্রুত সেদ্ধ করে। অতিরিক্ত এই বাষ্প বের হওয়ার জন্য ঢাকনার ওপরে একটি ছোট ছিদ্র থাকে, যার ওপর বসানো থাকে হুইসেল।
ধরুন, আপনি রান্নার সময় একটি আস্ত তেজপাতা কুকারের ভেতর ছেড়ে দিলেন। তেজপাতার গঠনটা একটু খেয়াল করুন, বেশ হালকা, চওড়া ও শক্ত। পানিতে ফুটলে এটি গলে যায় না বা অন্যান্য মসলার মতো মিশেও যায় না।
রান্নার সময় যখন তরল ফুটতে থাকে, তখন ভেতরের বুদ্বুদ এবং বাষ্পের ধাক্কায় এই হালকা তেজপাতা সহজেই ভেসে একেবারে ওপরের দিকে চলে আসতে পারে।
দুর্ভাগ্যবশত, পাতাটি যদি ঠিক ওই ছিদ্রের মুখে গিয়ে আটকে যায়, তবে পাতার চওড়া ও সমতল পৃষ্ঠটি একদম নিখুঁত ছিপির মতো কাজ করবে।
ছিদ্র বন্ধ হয়ে গেলে ভেতরের বাষ্প আর বের হতে পারবে না। এদিকে চুলার তাপে ভেতরের চাপ জ্যামিতিক হারে বাড়তেই থাকবে।
আধুনিক প্রেশার কুকারগুলোয় সেফটি ভালভ নামের একটি অতিরিক্ত সুরক্ষাব্যবস্থা থাকে, যা এমন পরিস্থিতিতে গলে গিয়ে বাষ্প বের করে দেয়।
কিন্তু সেফটি ভালভটি যদি পুরোনো হয়, ঠিকমতো কাজ না করে, অথবা ভেতরের চাপ যদি এত দ্রুত বেড়ে যায়, যা সেফটি ভালভ সামলাতে ব্যর্থ হয়, তবে সেই প্রেশার কুকার আস্ত একটি বোমায় পরিণত হতে পারে এবং ভয়ংকর বিস্ফোরণও হতে পারে।
বিশ্বের নামীদামি প্রেশার কুকার প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলোও এই বিপদের কথা স্বীকার করে। তাদের ব্যবহারিকায় স্পষ্ট করে সতর্কবাণী দেওয়া থাকে। সেখানে বলা হয়, ফেনা তৈরি করে এমন খাবার কিংবা বড় পাতা রান্নার ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। কারণ, এসব ভেন্ট পাইপ ব্লক করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
তেজপাতা ছাড়া কি আর মাংসের স্বাদ জমে? অবশ্যই তেজপাতা দেবেন, তবে কিছু সহজ সতর্কতা মেনে।
আস্ত পাতা নয়: তেজপাতা সব সময় মাঝখান থেকে ছিঁড়ে বা ছোট টুকরা করে কুকারে দেবেন। এতে এটি ছিদ্রের মুখে আটকে যাওয়ার মতো বড় থাকবে না।
উপাদানের নিচে চাপা দিন: তেজপাতাটি কুকারের তরলের ওপর না ভাসিয়ে মাংস, আলু বা অন্যান্য ভারী উপাদানের নিচে চাপা দিয়ে দিন।
তেলের ব্যবহার: ফেনা হয়, এমন কিছু রান্নার সময় এক চামচ তেল বা মাখন দিয়ে দিন। এতে ফেনা কম হবে এবং তেজপাতা বা অন্য কিছু ওপরে ভেসে ওঠার সুযোগ কম পাবে।
কুকার ভর্তি করবেন না: কখনোই প্রেসার কুকারের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি খাবার বা পানি দিয়ে ভর্তি করবেন না।
ইন্টারনেটের সব তথ্য যেমন মিথ্যা নয়, তেমনি সব তথ্য না বুঝে বিশ্বাস করাও ঠিক নয়। প্রেশার কুকারে তেজপাতা আটকে বিস্ফোরণের ঘটনা হয়তো প্রতিদিন ঘটে না, কিন্তু এর বৈজ্ঞানিক সম্ভাবনা শতভাগ সত্যি। তাই রান্নাঘরে একটু সতর্কতা আপনাকে এবং আপনার পরিবারকে বড় কোনো বিপদের হাত থেকে রক্ষা করতে পারে।
সূত্র: দ্য ফিজিকস অব প্রেশার কুকার, হকিন্স কুকারস ইনস্ট্রাকশন ম্যানুয়াল ও ন্যাশনাল সেন্টার ফর হোম ফুড প্রিজারভেশন ফুড প্রিজারভেশন