‘পড়ালেখার জন্য অস্ট্রেলিয়া যাব’—ভাবতেই আমাদের অধিকাংশ শিক্ষার্থীর চোখে ভাসে সিডনির জমকালো অপেরা হাউস অথবা মেলবোর্নের ব্যস্ত সড়কের ছবি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আবেদনের ক্ষেত্রেও শিক্ষার্থীরা এ দুই শহরের নামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোই বেছে নেন। কিন্তু এর বাইরেও অস্ট্রেলিয়ার একটা ভিন্ন জগৎ আছে। অল্প পরিচিত বিভিন্ন এলাকার নামী বিশ্ববিদ্যালয়েও এখন পড়ছেন, ভালো করছেন বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা। তাঁদের অভিজ্ঞতা কেমন?

ছবির মতো সুন্দর পার্কল্যান্ড আর ঐতিহাসিক স্থাপত্যে ঘেরা শান্ত শহর অ্যাডিলেড। বাংলাদেশের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতে স্নাতকোত্তর শেষে ফাহমিদা আক্তার এখন এ শহরেরই ইউনিভার্সিটি অব অ্যাডিলেডে ডেটা সায়েন্সে মাস্টার্স করছেন। সিডনি বা মেলবোর্নের মতো ঝলমলে শহর ছেড়ে কেন অ্যাডিলেডকে বেছে নিলেন তিনি?
মুঠোফোনের ওপারে ফাহমিদার কণ্ঠে আত্মবিশ্বাসটা টের পাওয়া গেল। বলছিলেন, ‘সিডনিতে আমার এক আত্মীয় থাকেন। তাঁর পরামর্শেই এখানে আসা। সত্যি বলতে, প্রথম কারণটা ছিল স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ। অ্যাডিলেড একটি আঞ্চলিক শহর হওয়ায় এখানে পড়াশোনা করলে স্থায়ীভাবে বসবাসের আবেদনে অতিরিক্ত কিছু পয়েন্ট পাওয়া যায়, যা স্বপ্নের পথকে অনেকটাই মসৃণ করে দেয়। তবে শুধু এটাই একমাত্র কারণ ছিল না।’
অস্ট্রেলিয়ার সেরা ৮ বিশ্ববিদ্যালয় ‘গ্রুপ অব এইট’ নামে পরিচিত। ইউনিভার্সিটি অব অ্যাডিলেডও এর অংশ। অ্যাডিলেডে পড়তে যাওয়ার পেছনে এটিও একটা কারণ বলে জানান ফাহমিদা। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ নিয়ে তিনি বেশ সন্তুষ্ট। জানান, তাঁর ডেটা সায়েন্সের ক্লাসে প্রায় ২০ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী আছেন। ফাহমিদা বলেন, ‘এখানে পড়াশোনার পরিবেশটা খুবই আন্তরিক। বড় শহরের বাণিজ্যিক মনোভাবের চেয়ে প্রকৃত জ্ঞানচর্চার দিকেই কর্তৃপক্ষের ঝোঁকটা বেশি। শিক্ষকদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সুযোগ পাওয়া যায়, যা বড় শহরের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় সব সময় সম্ভব হয় না।’
অনেকের ধারণা, আঞ্চলিক শহর মানেই হয়তো সুযোগ-সুবিধার অভাব। এ ধারণাও পুরোপুরি ঠিক নয়, দাবি করলেন ফাহমিদা। বলছিলেন, ‘আমি বলব, বরং বড় শহরের কোলাহল এড়িয়ে এখানে একটা শান্ত ও পরিচ্ছন্ন জীবন পাওয়া যায়। জীবনযাত্রার খরচও সিডনি বা মেলবোর্নের চেয়ে কম।’
প্রবাসে দেশি খাবারের জন্য মন কাঁদে না—এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া কঠিন। ফাহমিদা জানান, অ্যাডিলেডে এ নিয়েও খুব একটা ভাবতে হয় না, ‘অনেকেই ভাবে, ছোট শহরে হয়তো দেশের খাবার পাওয়া যায় না। কিন্তু এখানে বাংলাদেশি মুদিদোকান আছে, মোটামুটি সবই মেলে। দেশের মাছ, সবজি—সবই পাওয়া যায়।’ ২০২৭ সালে তাঁর পড়াশোনা শেষ হবে বলে জানান ফাহমিদা আক্তার।
ফাহমিদার অ্যাডিলেড যদি হয় প্রশান্তির নগর, তবে কাজী সাদের আরমিডেল যেন প্রকৃতির কোলে গড়ে ওঠা এক নিবিড় শিক্ষাঙ্গন। নিউ সাউথ ওয়েলস রাজ্যের নিউ ইংল্যান্ড হাইল্যান্ডসের বুকে, সিডনি বা ব্রিসবেনের কোলাহল থেকে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার দূরে ছবির মতো সাজানো এ শহর। অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে উঁচু শহর বলা হয় একে। উঁচু শহরে মাথা আরও উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে ইউনিভার্সিটি অব নিউ ইংল্যান্ড (ইউএনই)। এখানেই পড়েন ঢাকার ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র কাজী সাদ।
সাদ বলেন, ‘এখানে আসার পেছনে আমার বড় ভাইয়ের একটা ভূমিকা ছিল। তিনি সিডনিতে পড়াশোনা করেছেন। তিনিই আমাকে জানান যে সিডনির বাইরেও ভালো সুযোগ-সুবিধাসহ চমৎকার কিছু বিশ্ববিদ্যালয় আছে। খোঁজ নিয়ে দেখলাম, ইউএনইর কৃষি বিভাগ অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম সেরা। বাংলাদেশ থেকে অনেক শিক্ষার্থী এখানে কৃষি বিষয়ে পিএইচডি করতে আসেন। এখন ব্যাচেলর বা মাস্টার্স করতেও অনেকে আসছেন।’
তবে শুধু পড়াশোনার মানই একমাত্র কারণ নয়। বড় শহরগুলোর তুলনায় এখানকার জীবনযাত্রার খরচে অনেক তফাত। সাদের দেওয়া তথ্যটা একটু অবাক করল বটে, ‘আমি যখন প্রথম এলাম, তখন সপ্তাহে মাত্র ১৬০ থেকে ১৭০ ডলারেই একটি বাড়ির মধ্যে নিজের জন্য আলাদা ঘরে থাকতাম। এর মধ্যেই ইন্টারনেট, বিদ্যুৎসহ সব বিল অন্তর্ভুক্ত ছিল। অথচ সিডনিতে এমন একটি ব্যবস্থার জন্য সপ্তাহে গুনতে হতো ৫০০ থেকে ৬০০ ডলার। একটা সময় তো বিশ্ববিদ্যালয় নতুন শিক্ষার্থীদের জন্য প্রথম সাত মাস ডরমিটরিতে থাকার ব্যবস্থা একদম ফ্রি করে দিয়েছিল। এখনো সম্ভবত সেই সুবিধা চালু আছে।’
এই বিশাল আর্থিক সুবিধা অনেক বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর জন্যই বড় স্বস্তির কারণ। তবে আরমিডেলের আকর্ষণ শুধু কম খরচে সীমাবদ্ধ নয়। এখানকার বাংলাদেশি কমিউনিটি ছোট হলেও ভীষণ আন্তরিক। সাদের ভাষ্য, ‘আমরা এখানে সব মিলিয়ে জনা ত্রিশ-চল্লিশেক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী আছি। সংখ্যায় কম হওয়ায় সবাই সবাইকে চিনি। আমাদের একটা বাংলাদেশি স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন আছে। নতুন কেউ এলে আমরা তাঁদের স্বাগত জানাই, থাকার ব্যবস্থা করতে সাহায্য করি। যাঁদের গাড়ি নেই, প্রয়োজনে তাঁদের গাড়িতে করে পৌঁছে দিই। সিডনির মতো বড় শহরে এই পারিবারিক আবহটা পাওয়া কঠিন।’
তবে মুদ্রার অপর পিঠও আছে। আরমিডেল সিডনির মতো বড় শহর না হওয়ায় এখানে খণ্ডকালীন কাজ পাওয়া বেশ কঠিন। সাদ বলেন, ‘এখানে এসে প্রথমেই কাজ পাওয়াটা একটু চ্যালেঞ্জিং। শহরের পরিধি ছোট, তাই কাজের সুযোগও সীমিত। তা ছাড়া এখানে একটাই মাত্র দোকান আছে, যেখানে সপ্তাহে এক দিন কিছু বাংলাদেশি শাকসবজি পাওয়া যায়। মাছ বা অন্যান্য জিনিসের জন্য আমাদের বড় সুপারমার্কেটগুলোর ওপরই নির্ভর করতে হয়। প্রথম প্রথম দেশের মাছের জন্য খুব মন খারাপ হতো।’
জীবনযাত্রার এই ছোটখাটো চ্যালেঞ্জগুলো এখানকার শিক্ষার্থীরা মানিয়ে নিয়েছেন। আরমিডেলের আবহাওয়া বেশ ঠান্ডা, কিছুদিন আগেই বরফ পড়েছে, যা ছিল এক নতুন অভিজ্ঞতা। বিশাল ড্যামে পানি ধরে রাখায় পানির সংকট নেই বললেই চলে, যদিও খরার সময় বাড়তি সতর্কতা নেওয়া হয়।