
পিএইচডিকে বলা হয় সর্বোচ্চ একাডেমিক ডিগ্রি। শিক্ষার্থীরা সাধারণত অনার্স, মাস্টার্স শেষে পিএইচডির প্রস্তুতি নেন। তবে মাস্টার্সের আগেও কিন্তু চাইলে পিএইচডির ট্রেনে চড়ে বসা যায়। বাংলাদেশে অনেক শিক্ষার্থীই স্নাতক শেষে পিএইচডি শুরু করছেন। তাঁদের একজনের গল্প শোনাচ্ছেন ফুয়াদ পাবলো।
বুয়েটে তখন শেষ সেমিস্টারের ব্যস্ততা। ক্লাস, প্রজেক্ট, থিসিস…সব মিলিয়ে একাডেমিক জীবনের সবচেয়ে চাপের সময়টা পার করছিলেন আবরার রহমান। ঠিক সেই সময়ই ই–মেইলে আসে সুখবর। অনার্স শেষ হওয়ার আগেই যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডির অফার (প্রস্তাব) পেয়ে যান তিনি। পরে আরও ছয়টি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফুল ফান্ডেড (পূর্ণ অর্থায়নসহ) পিএইচডির অফার আসে বুয়েটের কম্পিউটারবিজ্ঞান ও প্রকৌশলের এই শিক্ষার্থীর কাছে।
বুয়েটে ভর্তি হওয়ার সময় থেকেই আবরার জানতেন, অনার্সের চতুর্থ বর্ষে উঠলে যুক্তরাষ্ট্রে সরাসরি পিএইচডির জন্য আবেদন করা যায়। তাই পরিকল্পনাও ছিল দীর্ঘমেয়াদি। তিনি আরও বলেন, ‘শুরু থেকেই ঠিক করে রেখেছিলাম, মাস্টার্স না করে সরাসরি পিএইচডিতে যাব। প্রথম বর্ষ থেকেই তাই নিজের প্রস্তুতি সেভাবে সাজিয়েছি। আমি জানতাম, শুধু ভালো ফল করলেই হবে না। গবেষণায় নিজেকে প্রমাণ করতে হবে, আন্তর্জাতিক মানের কাজ করতে হবে।’
আবরারের গবেষণার ক্ষেত্র মেশিন লার্নিং ও কম্পিউটেশনাল বায়োলজি, যার ভিত্তি মূলত গণিত। গণিতের প্রতি ভালোবাসাই তাঁকে এই পথে টেনে আনে। ছোটবেলা থেকেই গণিতে আগ্রহী ছিলেন তিনি। আবরার বলেন, ‘ম্যাথমেটিক্যাল অ্যানালাইসিস আমার সব সময়ই প্রিয় ছিল। ছোট থেকেই খুব আগ্রহ নিয়ে করতাম। বুয়েটে ভর্তি হওয়ার পর ক্লাস শুরুর সময় মেশিন লার্নিং নিয়ে পড়া শুরু করি। প্রথম বর্ষের শেষ দিকে প্রথম গবেষণার সুযোগ পাই। তখন বুঝতে পারি, এই জায়গাই আমার জন্য।’ প্রথম গবেষণার সুযোগটি আসে বড় ভাইয়ের মাধ্যমে। সেই অভিজ্ঞতা থেকে গবেষণায় সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন তিনি।
আবরারের সিজিপিএ ৪-এর মধ্যে ৩ দশমিক ৯৬। তবে শুধু একাডেমিক ফল নয়, গবেষণাতেও ছিল তাঁর দখল। এখন পর্যন্ত এই তরুণ গবেষকের সাতটি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। আবরার বলেন, ‘শুধু সংখ্যায় প্রকাশনা বাড়ালেই হয় না, কাজের মান গুরুত্বপূর্ণ। আমি সব সময় পদ্ধতিগত নতুনত্বের দিকে জোর দিয়েছি। গবেষণায় নতুন কিছু যোগ করতে পারাটাই আসল। আর যারা কম্পিউটার সায়েন্স বা মেশিন লার্নিংয়ে কাজ করতে চায়, তাদের শক্ত গাণিতিক ভিত্তি থাকা খুব জরুরি।’
আবরারের একাডেমিক গবেষণায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা। তৃতীয় বর্ষ থেকেই তিনি বাইরের দেশের গবেষকদের সঙ্গে কাজ শুরু করেন। এ কারণে পরে সুপারিশপত্র (রিকমেন্ডেশন লেটার) পেতেও সুবিধা হয়েছে। আবরার বলেন, ‘শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সুযোগ পেতে হলে একাডেমিক ফলাফল, গবেষণা, সুপারিশপত্র—সবই গুরুত্বপূর্ণ। এখন প্রতিযোগিতা এতটাই বেশি যে কোনো এক জায়গায় দুর্বলতা থাকলেই সেটা চোখে পড়ে যায়। আমার ক্ষেত্রে বিদেশি অধ্যাপকদের সুপারিশ কাজে এসেছে।’
এসবের বাইরে ভালোভাবে সাক্ষাৎকার দেওয়াটাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে মনে করেন আবরার। বিশেষ করে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলির ক্ষেত্রে তাঁকে পাঁচ দফা সাক্ষাৎকার দিতে হয়েছে। আবরার বলেন, ‘আবেদনপ্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ, কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো সাক্ষাৎকার। নিজের গবেষণা সম্পর্কে গভীর ধারণা না থাকলে সেখানে টিকে থাকা কঠিন।’