
চোখ আমাদের শরীরের সবচেয়ে সুন্দর ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংবেদনশীল অঙ্গ। তাই চোখের বিভিন্ন রোগ সম্পর্কে প্রত্যেকের প্রাথমিক ধারণা থাকা উচিত। সবচেয়ে বড় ব্যাপার চোখে কোনো সমস্যা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ড্রপ দেবেন না।প্রথমেই জেনে নেওয়া যাক চোখের সাধারণ সমস্যা কী কী?
চোখ লাল হওয়া: বিভিন্ন কারণে চোখ লাল হতে পারে। যেমন চোখ ওঠা, চোখে কোনো কিছু পড়া, চোখের মণিতে (কর্নিয়া) ঘা হওয়া ও চোখের প্রদাহ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে। এ ক্ষেত্রে চোখ লাল হওয়ার পাশাপাশি খচখচ করে, চোখ থেকে পানি পড়ে, পুঁজ পড়ে এবং সকালে চোখের পাতা লেগে থাকে ও খুলতে অসুবিধা হয়। তবে যদি চোখে ব্যথা অনুভব, দৃষ্টি ঝাপসা ও আলোতে তাকাতে অসুবিধা হয়, সে ক্ষেত্রে গুরুত্ব দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। অনেকে দোকান থেকে অ্যান্টিবায়োটিক ড্রপ নিয়ে ব্যবহার করেন। অপচিকিৎসার ফলে রোগটি জটিল আকার ধারণ করে।
এ ছাড়া চুন বা কোনো কেমিক্যাল চোখে পড়লে মারাত্মক ÿক্ষতি হতে পারে। এ ক্ষেত্রে খুব দ্রুত প্রচুর পানি বা নরমাল স্যালাইন দিয়ে চোখ ধুয়ে ফেলতে হবে। দ্রুত নিয়ে যেতে হবে চিকিৎসাকেন্দ্রে।
দৃষ্টিশক্তির সমস্যা ও ট্যারা চোখ: দৃষ্টিশক্তির সমস্যা থাকলে দূরে কিংবা কাছে দেখতে অসুবিধা হয়। দূরে দেখে না বলেই শিশুরা কাছে গিয়ে টেলিভিশন দেখে। অনেক সময় দৃষ্টিশক্তির সমস্যার কারণে চোখ ও মাথায় ব্যথা অনুভব হয়। সময়মতো চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ না নিলে দৃষ্টিশক্তির সমস্যার কারণে চোখ ট্যারা হয়ে যায়। অনেক সময় চোখ অলস হয়ে যায়। তাই দৃষ্টিশক্তির সমস্যা থাকলে তা চিকিৎসা করতে হবে শিশু বয়সেই অর্থাৎ দুই থেকে চার বছরের মধ্যে।
যাদের চোখের মাইনাস পাওয়ার বেশি তাদের চোখের রেটিনা অনেক সময় পাতলা হয়, এ কারণে চোখের অপূরণীয় ÿক্ষতি হতে পারে। তাই নিয়মিত রেটিনা বিশেষজ্ঞ দিয়ে পরীক্ষা করলে ঝুঁকি কমে যায়।
ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ: ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ থাকলে চোখের রেটিনার রক্তনালি বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় চোখ দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে চোখের ভেতর রক্তক্ষরণসহ নানা রকম জটিলতা হতে পারে। এ ক্ষেত্রে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কোলেস্টেরল ও রক্তশূন্যতা পরীক্ষা করে নিয়ন্ত্রণে রাখা যেমন জরুরি তেমনি অন্তত ছয় মাস অন্তর রেটিনা বিশেষজ্ঞ দিয়ে চোখ পরীক্ষা করানো উচিত। প্রাথমিক অবস্থায় প্রয়োজনীয় চিকিৎসার মাধ্যমে দৃষ্টিশক্তি ধরে রাখা সম্ভব।
গ্লুকোমা: গ্লুকোমা রোগ চোখের নীরব ঘাতক। এই রোগের কারণে চোখের নার্ভ দুর্বল হয়ে যায় এবং চোখের দৃষ্টিশক্তির স্থায়ী ক্ষতি হয়, যা কোনোভাবেই ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। যেকোনো বয়সেই এই রোগ হতে পারে। তবে চল্লিশের পর প্রবণতা বেশি থাকে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এই রোগের কোনো উপসর্গ থাকে না। তাই রোগী বুঝতে পারেন না। প্রাথমিক অবস্থায় চিকিৎসা করালে অনিবার্য অন্ধত্বের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।
ছানি পড়া: ক্যামেরার ভেতরে যেমন লেন্স থাকে, ঠিক তেমনি চোখের ভেতরেও লেন্স থাকে। যদি কোনো কারণে এই স্বচ্ছ লেন্স অস্বচ্ছ হয়ে পড়ে একে ছানি বলে। অনেকগুলো কারণে চোখে ছানি পড়তে পারে। তবে বেশি ছানি হয় বার্ধক্যজনিত কারণে। বার্ধক্যজনিত কারণে ছানি পড়লে রোগী দূরে ধীরে ধীরে কম দেখেন। কিন্তু অনেক সময় ছানির কারণে কাছে ভালো দেখেন, যা রোগীকে বিভ্রান্ত করে। অস্ত্রোপচারই ছানির একমাত্র চিকিৎসা। কোনো ওষুধ কিংবা চশমা দিয়ে এর প্রতিরোধ কিংবা প্রতিকার সম্ভব নয়। ফ্যাকো সার্জারি ছানির আধুনিক চিকিৎসা। এই অস্ত্রোপচার সম্পূর্ণ ব্যথামুক্ত। কোনো ইনজেকশন কিংবা ব্যান্ডেজের প্রয়োজন হয় না।
সতর্কতামূলক কিছু পদক্ষেপ: শিশুদের স্কুলে দেওয়ার আগে চোখ পরীক্ষা করা উচিত। চুনকে চোখের নাগালের বাইরে রাখতে হবে এবং বয়স চল্লিশের বেশি হলে বছরে অন্তত একবার চক্ষু বিশেষজ্ঞ দ্বারা চোখ পরীক্ষা করা দরকার।
প্রকাশ কুমার চৌধুরী
বিভাগীয় প্রধান, চক্ষু বিভাগ ইউএসটিসি