অ্যাজমার উপসর্গ, কারণ ও প্রতিকার নিয়ে প্রথম আলো আয়োজন করে এসকেএফ নিবেদিত স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ অনুষ্ঠান ‘সজীব নিশ্বাস সুস্থ দেহ’। অনুষ্ঠানটির প্রথম পর্বে আলোচনা করা হয় অ্যাজমা দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় ‘আনকভারিং অ্যাজমা মিসকনসেপশন’ নিয়ে।
ডা. মো. মুরাদ হোসেনের সঞ্চালনায় অতিথি ছিলেন ডা. মো. আলী হোসেন, অধ্যাপক, রেসপিরেটরি মেডিসিন ও সভাপতি, বাংলাদেশ লাং ফাউন্ডেশন; ডা. আসিফ মুজতাবা মাহমুদ, কনসালট্যান্ট, রেসপিরেটরি মেডিসিন ও মহাসচিব, বাংলাদেশ লাং ফাউন্ডেশন এবং ডা. কাজী সাইফউদ্দিন বেননুর, সহকারী অধ্যাপক, রেসপিরেটরি মেডিসিন ও যুগ্ম সম্পাদক, বাংলাদেশ লাং ফাউন্ডেশন।
অনুষ্ঠানটি ৫ মে প্রথম আলোর ফেসবুক পেজ থেকে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। এ ছাড়া সম্প্রচারিত হয় এসকেএফের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজ থেকেও।
অনুষ্ঠানের শুরুতে অধ্যাপক ডা. মো. আলী হোসেন অ্যাজমা এবং বিশ্ব অ্যাজমা দিবসের প্রতিপাদ্য নিয়ে বলেন। অ্যাজমা শ্বাসনালির প্রদাহজনিত অসুখ। এটি ক্রনিক ডিজিজও বটে। এটি ইনফেক্টরি ডিজিজ না। অসুখটি যেকোনো বয়সে হতে পারে। শিশু, বৃদ্ধ যে কেউ যেকোনো সময় এই অসুখে আক্রান্ত হতে পারে। বিশ্ব অ্যাজমা দিবস পালনের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে রোগটি নিয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন করা। এ কারণেই এ বছরের দিবসটির প্রতিপাদ্য ধরা হয়েছে, আনকভারিং অ্যাজমা মিসকনসেপশন।
সাধারণভাবে দেখা যায়, আমাদের দেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানুষের মধ্যে অ্যাজমা নিয়ে নানা ধরনের ভুল ধারণা রয়েছে। যেমন অনেকে মনে করেন এটি বংশগত অসুখ, এটি একটি ছোঁয়াচে অসুখ আবার অনেকে মনে করেন এটি খাবার থেকে হয়। শুধু যে অ্যাজমা নিয়ে ভুল ধারণা রয়েছে, তা নয় এর ওষুধ নিয়েও নানা ধরনের ভুল ধারণা রয়েছে। যেমন ইনহেলার কখন ব্যবহার করবে, কখন করবে না এবং এর কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে কি না। এ বছর দিবসটি বিশেষভাবে পালন করা হচ্ছে, কারণ এই যে করোনা মহামারি চলছে এর মধ্যে অ্যাজমা রোগীদের কী কী ধরনের বিশেষ সতর্কতা পালন করতে হবে। আরও একটি বিষয় হচ্ছে, অ্যাজমা আর সিওপিডির পার্থক্য নির্ণয় করতে হবে। এটি যদিও চিকিৎসক নির্ণয় করবেন, তবুও সাধারণভাবে জানা থাকা উচিত, সাধারণত ধূমপান, বায়ুদূষণ, পরিবেশদূষণ থেকে মানুষ সিওপিডিতে আক্রান্ত হয়। দুটির চিকিৎসাপদ্ধতি একদমই আলাদা।
এরপর কনসালট্যান্ট ডা. আসিফ মুজতাবা মাহমুদ আলোচনা করেন করোনার সময় অ্যাজমা-আক্রান্ত রোগীরা কী কী সতর্কতা মেনে চলবেন। প্রথমেই তিনি আলোচনা করেন ইনহেলার ব্যবহার নিয়ে। যেমন অ্যাজমা রোগীরা সাধারণত যে ইনহেলার ব্যবহার করে আরাম পায়, তারা সেটিই ব্যবহার করতে চায়। অন্য কোনো ওষুধ তারা ঠিক গ্রহণ করতে চায় না।
ইনহেলার হচ্ছে অ্যাজমা চিকিৎসার মূল ভিত্তি। বর্তমানে মূলত দুই ধরনের ইনহেলার পাওয়া যায়, এর মধ্যে একটি সব সময় চলতে থাকবে। তবে অ্যাজমার সঠিক চিকিৎসা করাতে হলে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দিয়ে পূর্ণাঙ্গ একটি চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরি করে নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, আমাদের দেশে বর্তমানে অ্যাজমার সব চিকিৎসাই রয়েছে। শুধু প্রয়োজন একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ।
সহকারী অধ্যাপক ডা. কাজী সাইফউদ্দিন বেননুর আলোচনা করেন অ্যাজমা নিয়ে আমাদের কী কী ধরনের ভুল ধারণা রয়েছে, তা নিয়ে। এবং চলতি বছর বিশ্ব অ্যাজমা দিবসের প্রতিপাদ্যে মূলত চারটি ভুল ধারণা নিয়ে বেশি আলোচনা করা হয়েছে। এসব ভুল ধারণার জন্য যা হয় তা হচ্ছে, রোগী সুস্থ থাকতে পারে না এবং সঠিক চিকিৎসা থেকে দূরে থাকে। যে কারণে রোগটি দিন দিন ভয়াবহ আকার ধারণ করে।
এর মধ্যে প্রথম বড় ভুল ধারণাটি হচ্ছে, অ্যাজমা কোনো নির্দিষ্ট বয়সের রোগ না। অনেকে মনে করেন, এটি শিশু বা কিশোরদের একটি অসুখ, যা তরুণ বয়সে আর থাকে না। এর মূল কারণ হচ্ছে, অ্যাজমা মূলত শিশুদের বেশি আক্রান্ত করে। পরবর্তী সময়ে এটি আর থাকে না। এ কারণেই এই ভুল ধারণার জন্ম হয়।
দ্বিতীয় ভুল ধারণাটি হচ্ছে, অ্যাজমা একটি সংক্রামক রোগ। অনেকেই মনে করেন রোগটি ছোঁয়াচে। একজন থেকে অন্যজনে ছড়ায়। এ ধরনের ভুল ধারণার জন্য অনেকে একঘরে হয়ে পড়েন। গ্রাম অঞ্চলে অনেক সময় অনেকের বিয়েতেও সমস্যা হয়।
তৃতীয় ভুল ধারণাটি হচ্ছে, অ্যাজমা রোগীরা ভারী কাজ করতে পারে না, খেলাধুলা করতে পারে না। চিকিৎসকদের মতে, অ্যাজমা রোগীরা যদি সঠিকভাবে চিকিৎসা গ্রহণ করে এবং কিছু নিয়মকানুন মেনে চলে, তবে তারাও একজন স্বাভাবিক মানুষের মতো জীবন যাপন করতে পারবে।
তিনি বলেন, এমনকি অ্যাজমা রোগীরা ক্রীড়াবিদও হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা চলে, এক সময়ের জনপ্রিয় ক্রিকেটার ইয়ান বোথাম, বাংলাদেশের জনপ্রিয় ফুটবলার আসলাম এবং ভীষণ জনপ্রিয় বাংলাদেশ ক্রিকেট টিমের সাবেক অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা অ্যাজমা রোগী। জনপ্রিয় এই খেলোয়াড়েরা অ্যাজমা নিয়ন্ত্রণে রেখেই সফলতা অর্জন করেছেন। আরও একটি ভুল ধারণা রয়েছে এর চিকিৎসাপদ্ধতি নিয়ে।
অনেকে মনে করেন, অ্যাজমার চিকিৎসা অনেক ব্যয়বহুল এবং অনেক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে। এ ধরনের ভুল ধারণার জন্য অনেক রোগীর চিকিৎসা মারাত্মক ব্যাহত হয়। অ্যাজমার চিকিৎসায় যে একেবারেই কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই, তা বলা যাবে না। তবে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার পরিমাণ খুবই সামান্য। যেমন দীর্ঘদিন ইনহেলার ব্যবহারে উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিস সামান্য পরিমাণে বাড়তে পারে।