
অনেকক্ষণ একটানা বসে থাকলে বা অন্য কোনো কাজ করলে আমরা অনেক সময় আড়মোড়া ভাঙি। কেউ কেউ কোমর মোচড়াই। এ সময় মটমট শব্দও হয়। একে ইংরেজিতে বলে ‘ব্যাক ক্র্যাকিং’। আর এতে যে আরাম লাগে, তা কে না জানেন! জড়তাও কাটে। কিন্তু এটা কি মেরুদণ্ডের জন্য নিরাপদ? বিজ্ঞান এ বিষয়ে কী বলে?
বলা হচ্ছে, হালকা আরামের জন্য মাঝেমধ্যে কোমর মোচড়ানোয় তেমন ক্ষতি নেই। তবে প্রায়ই কোমর মোচড়ামুচড়ি করা বা জোর করে এ ধরনের কাজ দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষতির কারণ হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনে কোমর মোচড়ানো নিয়ে ২০০৭ সালে একটি গবেষণা প্রকাশিত হয়। এর শিরোনাম ছিল ‘জার্নাল অব মেনিপুলেটিভ অ্যান্ড ফিজিওলজিক্যাল থেরাপিউটিকস’।
ওই গবেষণাপত্রে বলা হয়, মেরুদণ্ডে চাপ প্রয়োগ করে নড়াচড়া করানো হলে তাতে সাময়িক স্বস্তি পাওয়া যেতে পারে, অল্প সময়ের জন্য কোমর ও পিঠব্যথা কমতেও পারে। কিন্তু এটা যথাযথভাবে করা না হলে পেশিতে টান পড়তে পারে, এমনকি স্নায়ুতে লাগতে পারে আঘাত।
কোমর মোচড়ালে তা মেরুদণ্ডের বিভিন্ন হাড়ের সন্ধির ভেতর থাকা তরলকে নাড়িয়ে দেয়। এ সময় তরল সরে গিয়ে অস্থিসন্ধির ভেতরে বাতাসের বুদ্বুদ তৈরি করে, যা মটমট শব্দ হয়ে আমাদের কানে আসে। পরে তরল সেই শূন্যস্থান পূরণ করে এবং হাড় আবার তার যথাস্থানে ফিরে যায়। কিন্তু সব সময় কি হাড় সঠিক জায়গায় ফিরতে পারে? না-ও তো পারে!
তাই বারবার কোমর মোচড়ানো হালকা আরাম দিলেও এতে পেশিতে টান পড়ে লিগামেন্ট ছিঁড়ে যেতে পারে। এমনকি হাড় যথাযথ জায়গায় না বসে অস্বস্তি তৈরি করতে পারে।
বোঝা যাচ্ছে, মাঝেমধ্যে কোমর মোচড়ানো ভালো হলেও দীর্ঘ মেয়াদে নিরাপদ নয়। এতে আরও যেসব ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, সেসব হলো—
এতে স্নায়ু চাপ খেয়ে যেতে পারে। ফলে পিঠব্যথা, শারীরিক দুর্বলতা এমনকি অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটতে পারে।
মাংসপেশি টান খেয়ে ছিঁড়ে যেতে পারে।
লিগামেন্ট ছিঁড়ে যেতে পারে। দীর্ঘ মেয়াদে হাড় ও অস্থিসন্ধির বাতজনিত অস্টিওআর্থ্রাইটিস রোগ দেখা দিতে পারে।
অনেক সময় ধমনিতে আঘাত লেগে তা ফুলে যেতে পারে। এমনকি স্ট্রোকের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
আগেই বলা হয়েছে, মাঝেমধ্যে কোমর মোচড়ানো যেতে পারে। কিন্তু কখন বুঝবেন এটা বন্ধ করার সময় হয়েছে?
মোচড়ানোর সময় বা পরে ব্যথা বা অস্বস্তি অনুভব করলে।
যদি কারও অস্টিওপোরোসিস বা হার্নিয়েটেড ডিস্কের মতো হাড়ক্ষয় বা এ–জাতীয় রোগ থাকে।
এ ছাড়া যথাযথ কৌশল জানা না থাকলে তাঁরও কোমর মোচড়ানোর মতো কাজ করা উচিত নয়।
কোমর মোচড়ানোয় অস্বস্তি দূর হয়, আরামও লাগে। কিন্তু এটা যেহেতু নিরাপদ নয়, তবে এসব সুবিধা পেতে বিকল্প কী করা যেতে পারে?
কোমর ও পিঠের হাড় বা মাংসপেশি আস্তেধীরে টেনে হালকা স্ট্রেচিং করা যেতে পারে। এতে শরীরের নমনীয়তা বাড়ে এবং পেশির অস্বস্তি কমায়।
শরীরের মূল মাংসপেশি অর্থাৎ পেট, কোমর ও নাভিকে ঘিরে থাকা পেশিগুলো শক্তিশালী করা। এসব আমাদের শরীরকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে সাহায্য করে এবং অস্বস্তিও প্রতিরোধ করে।
আমাদের শরীরের স্বাভাবিক ভঙ্গি ধরে রাখা। অর্থাৎ মাংসপেশি ও হাড়ের ভারসাম্য বজায় রাখা। এটি পেশি টান খাওয়া প্রতিরোধ করে ও জড়তা দূর করে।
মাঝেমধ্যে গরম ও শীতল থেরাপি নেওয়া যেতে পারে। এতে পেশি শান্ত থাকে এবং প্রদাহ কমে।
সর্বোপরি অস্বস্তি বেশি হলে একজন পেশাদার হাড়বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।
মনে রাখতে হবে, এই লেখা কোনোভাবেই পেশাদার চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়। এখানে শুধু বিষয়টি সম্পর্কে সাধারণ ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
সূত্র: ওয়েব এমডি