৪০-এর আগেই মেনোপজ? জানুন কারণ ও চিকিৎসা

অধিকাংশ নারীর ক্ষেত্রে ৪৫ থেকে ৫৫ বছর বয়সের মধ্যে মেনোপজ বা স্থায়ীভাবে মাসিক বন্ধ হয়ে যায়। তবে ৪৫ বছরের আগে মেনোপজ শুরু হলে তাকে ‘আর্লি মেনোপজ’ বা সময়ের আগেই মেনোপজ বলা হয়। আর ৪০ বছর বয়সের আগে এমনটি ঘটলে তাকে ‘প্রিম্যাচিউর মেনোপজ’ বা ‘প্রিম্যাচিউর ওভারিয়ান ইনসাফিসিয়েন্সি’ বলা হয়।

মেনোপজ শুরুর অনেক আগে থেকেই শরীরে হট ফ্ল্যাশের মতো উপসর্গ দেখা দেয়
ছবি: পেক্সেলস

মূলত যখন ডিম্বাশয় থেকে ডিম্বাণু উৎপাদন বন্ধ হয় এবং এর ফলে শরীরে প্রজনন চক্র নিয়ন্ত্রণকারী হরমোন ইস্ট্রোজেনের মাত্রা কমে, তখন মেনোপজ ঘটে। টানা ১২ মাসের বেশি সময় ধরে ঋতুস্রাব না হলে একজন নারীকে মেনোপজ পর্যায়ে আছে বলে ধরা হয়।

তবে মেনোপজ শুরুর অনেক আগে থেকেই শরীরে হট ফ্ল্যাশের মতো উপসর্গ দেখা দেয়। স্থায়ীভাবে মাসিক বন্ধের পূর্ববর্তী এই পর্যায়কে বলে পেরিমেনোপজ। ডিম্বাশয়ের ক্ষতি করে বা ইস্ট্রোজেন উৎপাদন বন্ধ করে দেয়, এমন কোনো কারণে সময়ের আগেই মেনোপজ হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে ক্যানসারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত কেমোথেরাপি অথবা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ডিম্বাশয় অপসারণ ইত্যাদি। তবে ডিম্বাশয় শরীরে থাকা সত্ত্বেও অকালে মেনোপজ শুরু হতে পারে।

অকাল মেনোপজের লক্ষণগুলো কী কী?

অনিয়মিত মাসিক অথবা স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে মাসিক চক্র দীর্ঘ বা কম হলে তা অকাল মেনোপজের লক্ষণ হতে পারে। অকাল মেনোপজের অন্যান্য লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে:

  • অতিরিক্ত রক্তপাত

  • স্পটিং

  • এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে মাসিক চলা

  • দুটি মাসিকের মধ্যবর্তী সময়ের ব্যবধান বেড়ে যাওয়া

মেনোপজের অন্যান্য লক্ষণগুলোর হলো

  • মেজাজের পরিবর্তন

  • যৌন অনুভূতি বা ইচ্ছার পরিবর্তন

  • যোনিপথের শুষ্কতা

  • ঘুমের সমস্যা

  • হট ফ্ল্যাশ

  • রাতে ঘাম হওয়া

  • মূত্রাশয়ের নিয়ন্ত্রণ হারানো

অকাল–মেনোপজের কিছু সাধারণ কারণ

১. জিনগত কারণ

অল্প বয়সে মেনোপজ বা রজোনিবৃত্তির যদি কোনো স্পষ্ট চিকিৎসাগত কারণ না থাকে, তবে এটি সম্ভবত জিনগত। মেনোপজ শুরুর বয়সটি সাধারণত বংশগতভাবে নির্ধারিত হয়। নিজের মা, খালা, ফুফু অথবা পরিবারের নিকট নারী সদস্যের কখন মেনোপজ শুরু হয়েছিল জানলে নিজের ক্ষেত্রেও এটি কখন শুরু হতে পারে, সে সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব। যদি তাঁদের ক্ষেত্রে মেনোপজ আগে শুরু হয়ে থাকে, তবে আপনার ক্ষেত্রেও তা আগে হওয়ার আশঙ্কা বেশি।

২. জীবনযাত্রার প্রভাব

ধূমপান ইস্ট্রোজেনের মাত্রাকে প্রভাবিত করে। এটি অল্প বয়সে মেনোপজ হওয়ার পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, অধূমপায়ীদের তুলনায় ধূমপায়ী নারীদের মেনোপজ এক থেকে দুই বছর আগে শুরু হতে পারে।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে নিরামিষ খাদ্যাভ্যাস, শরীরচর্চার অভাব এবং পর্যাপ্ত সূর্যালোকের সংস্পর্শে না আসা—এসব বিষয়ও মেনোপজ আগে শুরু হওয়ার কারণ হতে পারে।

৩. ক্রোমোজোম বা জিনজনিত সমস্যা

টার্নার সিনড্রোম মহিলাদের একটি জিনগত রোগ। এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি একটি অসম্পূর্ণ ক্রোমোজোম নিয়ে জন্মগ্রহণ করেন। ডিম্বাশয় প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ না করার কারণে টার্নার সিনড্রোমে আক্রান্ত নারীদের বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অকালে মেনোপজ হয়।

অন্যান্য ক্রোমোজোমজনিত সমস্যার কারণেও অকালে মেনোপজ হতে পারে এবং তা বংশপরম্পরায় ছড়িয়ে পড়ে। জিনগত কারণে অকাল মেনোপজ ঘটেছে কি না, তা জেনেটিক টেস্টিং বা জিনগত পরীক্ষার মাধ্যমে জানা সম্ভব।

৪. অটোইমিউন রোগ

কিছু অটোইমিউন রোগ যেমন থাইরয়েড বা রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের কারণেও সময়ের আগে মাসিক বন্ধ হয়ে যেতে পারে। অটো ইমিউন রোগের ক্ষেত্রে শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা শরীরেরই কোনো অংশকে বহিরাগত ক্ষতিকর উপাদান মনে করে তার ওপর আক্রমণ চালায়। এসব রোগের কারণে সৃষ্ট প্রদাহ ডিম্বাশয়কে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। ডিম্বাশয় কাজ করা বন্ধ করে দিলে মেনোপজ শুরু হয়।

৫. মৃগীরোগ

মৃগীরোগে আক্রান্ত নারীদের ডিম্বাশয়ের কার্যকারিতা অকালে কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে, যা শেষ পর্যন্ত মেনোপজের দিকে নিয়ে যায়।

কীভাবে নির্ণয় করা হয়?

মেনোপজ শনাক্তের জন্য কোনো পরীক্ষার প্রয়োজন হয় না। অধিকাংশ নারীই নিজেদের শারীরিক লক্ষণ দেখে এটি বুঝতে পারেন। তবে শারীরিক পরিবর্তন অকাল মেনোপজের দিকে যাচ্ছে নাকি অন্য কোনো শারীরিক সমস্যার কারণে হচ্ছে, তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

অধিকাংশ নারীই নিজেদের শারীরিক লক্ষণ দেখে মেনোপজ হবে কি না, বুঝতে পারেন

চিকিৎসা বা ব্যবস্থাপনা কী?

সাধারণত অকাল মেনোপজ বা আর্লি মেনোপজের জন্য কোনো চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না। তবে ‘প্রিম্যাচিউর মেনোপজ’ যেহেতু অত্যন্ত কম বয়সে ঘটে, তাই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এর চিকিৎসা করা হয়।

চিকিৎসার মাধ্যমে শরীরকে সেই হরমোনগুলো সরবরাহ করা হয়, যা স্বাভাবিক মেনোপজের বয়স পর্যন্ত শরীর প্রাকৃতিকভাবে তৈরি করত। সবচেয়ে প্রচলিত চিকিৎসার মধ্যে রয়েছে হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি। তবে হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি হৃদ্‌রোগ, স্ট্রোক ও স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে।

সূত্র: হেলথ লাইন