স্কুলে খাবার ও পানি নেওয়ার জন্য প্লাস্টিক পণ্য অনেকটাই সুবিধাজনক। তবে রোজকার ব্যবহৃত প্লাস্টিকের টিফিন বক্স ও পানির বোতল থেকেও ছড়াতে পারে মাইক্রোপ্লাস্টিক।
রোজকার প্রয়োজনে টিফিন বক্স ও পানির বোতল ব্যবহার করেন নানান বয়সী মানুষ। বাদ যায় না শিশুরাও। প্লাস্টিকের তৈরি টিফিন বক্স ও পানির বোতল থেকে অজান্তেই আপনার সন্তানের শরীরে প্রবেশ করতে পারে মাইক্রোপ্লাস্টিক।
প্রশ্ন হলো, তাহলে টুকটাক নাশতা, দুপুরের খাবার কিংবা পানীয় পরিবহনের জন্য কি প্লাস্টিকের পণ্য একেবারেই বাদ দেওয়া জরুরি? এ বিষয়ে বিস্তারিত জানালেন ধানমন্ডির পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মেডিসিনবিশেষজ্ঞ ও সহকারী অধ্যাপক ডা. সাইফ হোসেন খান।
খাবার ও পানি পরিবহনে প্লাস্টিক পণ্য যদি ব্যবহার করতেই চান, তাহলে নিচের বিষয়গুলো খেয়াল রাখুন।
বিশ্বস্ত ব্র্যান্ডের পণ্য কিনুন।
কেনার সময় পণ্যটি ভালোভাবে দেখে নিন। প্লাস্টিক পণ্যে ত্রিভুজাকৃতিতে রেজিন শনাক্তকরণ সংকেত দেওয়া থাকে। সংখ্যাটা যদি হয় পাঁচ, তাহলে তা প্লাস্টিক পণ্যের মধ্যে তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। তবে এটিও সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত নয়।
পণ্যে বিসফেনল থাকলে তা ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। বিসফেনল মনুষ্যসৃষ্ট রাসায়নিক পদার্থ, যা মূলত পলি কার্বোনেট প্লাস্টিক ও ইপোক্সি রেজিন তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। তাই বিপিএ (বিসফেনল এ) মুক্ত প্লাস্টিক পণ্য বেছে নিন। তবে পণ্যের গায়ে ‘বিপিএ ফ্রি’ লেখা থাকলেও তাতে অন্য ধরনের বিসফেনল থাকতে পারে।
কোনো প্লাস্টিক পণ্যেই গরম খাবার বা পানীয় রাখবেন না।
প্লাস্টিক পণ্য বাইরে নেওয়ার আগে পুরু কাপড়ের স্তর দিয়ে মুড়িয়ে নিন, যাতে রোদের তাপে সহজে গরম হয়ে না যায়।
গাড়িতেও লম্বা সময় প্লাস্টিক পণ্য রেখে দিতে নেই।
প্লাস্টিক পণ্য পরিষ্কার করার সময় গরম পানি ব্যবহার না করাই ভালো। ডিশওয়াশারের মতো উচ্চ তাপে এ ধরনের পণ্য ধোয়া ঠিক নয়।
শক্ত, খসখসে কিছু দিয়ে এগুলো পরিষ্কার করবেন না।
ক্ষয়ে যাওয়া বা চিড়ে যাওয়া প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহার করবেন না।
প্লাস্টিকের চেয়ে কাচ অনেক বেশি নিরাপদ। বোরোসিলিকেট কাচ (একধরনের বিশেষ ও মজবুত কাচ) আরও ভালো। কারণ, এটি গরম ও ঠান্ডা জিনিস বহন করলেও সহজে ভেঙে যায় না। তবে কাচের জিনিস বহন করা কঠিন, বিশেষত শিশুদের জন্য।
বিকল্প হিসেবে ফুড-গ্রেড ধাতব পণ্য বেছে নেওয়া যেতে পারে। স্টেইনলেস স্টিল সবচেয়ে ভালো। এর মধ্যে এসএস ৩০৪ বা এসএস ৩১৬ (স্টেইনলেস স্টিলের দুটি জনপ্রিয় ও সেরা গ্রেড) বেছে নিতে পারেন। এসএস ৩১৬-এর সুবিধা হলো, লম্বা সময় টকজাতীয় বস্তু রাখা হলেও তা সহজে ক্ষয়ে যায় না।
তবে এসএস ৩১৬ বেশ দামি। প্রায়ই টকজাতীয় খাবার বা পানীয় বহন করার প্রয়োজন না হলে এসএস ৩০৪ বেছে নিতে পারেন। তুলনামূলক কম খরচে অ্যালুমিনিয়ামের পণ্য ব্যবহার করতে পারেন। তবে এটি কিছুটা কম টেকসই।
যেকোনো ধাতব পণ্য কেনার সময় এটাও খেয়াল রাখুন, যেন ভেতরে বা ঢাকনায় প্লাস্টিকের আবরণ না থাকে। প্লাস্টিকের আবরণ থাকলেও খাবার বা পানীয় রাখার সময় যেন তা ওই প্লাস্টিকের সংস্পর্শে না আসে।
বাতাস, ধুলা, মাটি, পানি, নদীর মাছ—কোথায় নেই মাইক্রোপ্লাস্টিক? বুঝতেই পারছেন, মাইক্রোপ্লাস্টিক পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব নয়। তবু যতটা সম্ভব, মাইক্রোপ্লাস্টিকের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা উচিত।
মাইক্রোপ্লাস্টিকের স্বাস্থ্যঝুঁকি বিষয়ে এখনো গবেষণা চলমান। গবেষণার চূড়ান্ত ফলাফল পাওয়া না গেলেও এটুকু নিশ্চিত যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের কারণে মানবদেহে নানান নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই খাবার ও পানীয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ জিনিস বহন করার ব্যাপারে একটু সচেতন থাকুন। আজকের এই সচেতনতার কল্যাণে হয়তো ভবিষ্যতে আপনি এবং আপনার শিশু বড় কোনো বিপদ থেকে বেঁচে যাবেন।