‘ওখানে যেয়ো না, পড়ে যাবে’, ‘ওটা ধোরো না, হাতে ময়লা লাগবে’, ‘এটা কোরো না, মানুষ কী বলবে’—এ কথাগুলো আমাদের সমাজে খুব পরিচিত। বেশির ভাগ মা–বাবা সন্তানকে সারাক্ষণ আগলে রাখাকে ভালোবাসা বলে বোঝেন। ওভার প্রটেকটিভ বা অতিরিক্ত সুরক্ষা দিতে চান। কিন্তু মনোবিজ্ঞান বলছে, এই ‘অতিরিক্ত সুরক্ষা’ প্রকৃতপক্ষে শিশুর আত্মবিশ্বাস আর স্বাবলম্বী হওয়ার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
মনস্তত্ত্বের ভাষায়, এ ধরনের অতি–সতর্ক বা অতি-নিরাপত্তামূলক অভিভাবকত্বকে বলা হয় ‘হেলিকপ্টার প্যারেন্টিং’। নাম থেকেই বোঝা যাচ্ছে, হেলিকপ্টার যেমন মাথার ওপর সব সময় ঘুরপাক খায়, এই মা–বাবারাও ঠিক তেমনি সন্তানের ওপর ২৪ ঘণ্টা নজরদারি করেন।
হেলিকপ্টার প্যারেন্টিং ধরনে অভ্যস্ত অভিভাবকেরা সন্তানের প্রতিটি কাজে অত্যধিক হস্তক্ষেপ করেন। সন্তানের ছোটখাটো সমস্যা সমাধান করে দেন। কোনো ঝুঁকি বা ভুল করতে দিতে চান না। সন্তানের সাফল্যের জন্য এতটা মরিয়া থাকেন যে সন্তানের নিজস্ব ইচ্ছা বা গতির কথা ভুলে যান।
এই প্রবণতার নেতিবাচক প্রভাব
গবেষণা বলছে, যে শিশু অতি-সুরক্ষায় বড় হয়, তাদের মধ্যে কিছু নির্দিষ্ট সমস্যার প্রবণতা বেশি। আসুন এমন কিছু সমস্যা দেখে নেওয়া যাক।
সিদ্ধান্তহীনতা; যেহেতু সব সিদ্ধান্ত বাবা-মা নিয়ে দেন, তাই বড় হয়ে এই শিশুরা ছোটখাটো বিষয়েও সিদ্ধান্ত নিতে ভয় পায়।
মানসিক চাপ ও বিষণ্নতা; হেলিকপ্টার প্যারেন্টিংয়ের শিকার শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিষণ্নতা ও জীবনের প্রতি অসন্তুষ্টির হার অনেক বেশি হয়ে থাকে।
সামাজিক জড়তা; ‘মানুষ কী বলবে’—এই ভয়ে বড় হওয়া শিশুরা মানুষের সঙ্গে মিশতে ভয় পায় এবং নিজেদের গুটিয়ে রাখে।
অসহনশীল; ছোটখাটো ব্যর্থতা বা ধাক্কা সামলানোর ক্ষমতা শিশুর তৈরি হয় না। কারণ, তারা কখনো কোনো প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়নি।
অভিভাবকদের জন্য পরামর্শ
সন্তানকে ভালোবাসুন, কিন্তু তাকে তার মতো করে পৃথিবীটা চিনতে দিন। ভুল করতে দিন। ভুল করা শেখার একটি অংশ। শিশু যদি পড়ে গিয়ে ব্যথা না পায়, তবে সে সাবধানে হাঁটতে শিখবে না। আপনার সন্তানকে তার নিজের কাজ যেমন স্কুলব্যাগ গোছানো, নিজের খাবার নিজেই খেতে উৎসাহিত করুন। শিশুর আবেগ সামলাতে সাহায্য করুন। তাকে সব বিপদ থেকে দূরে না রেখে বরং বিপদ বা মন খারাপের সময় সে কীভাবে তা সামলাবে, সেই শিক্ষা দিন। শিশুকে সমবয়সীদের সঙ্গে খেলতে দিন। প্রতিনিয়ত নজরদারি না করে বরং দূর থেকে খেয়াল রাখুন।
সন্তানকে আগলে রাখা দায়িত্ব, কিন্তু বন্দী করা নয়। উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সন্তানকে ‘নিরাপদ পরিবেশ’ দেওয়া, ‘আবদ্ধ পরিবেশ’ নয়। আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখার আগে তাকে নিজের ডানা ব্যবহার করার সুযোগ দিতে হবে। ডানা যদি ঝাপটাতে না শেখে, তবে আকাশ ছোঁবে কী করে?
ডা. টুম্পা ইন্দ্রানী ঘোষ, সহকারী অধ্যাপক, শিশু–কিশোর মনোরোগবিশেষজ্ঞ