র‍্যাবিস ভাইরাসের কারণে জলাতঙ্ক রোগ হয়ে থাকে
র‍্যাবিস ভাইরাসের কারণে জলাতঙ্ক রোগ হয়ে থাকে

পশুর কামড় বা আঁচড়ে কখন টিকা নেবেন

জলাতঙ্ক একটি প্রাণঘাতী রোগ, তবে সঠিক সময়ে ব্যবস্থা নিলে এটি শতভাগ প্রতিরোধযোগ্য। র‍্যাবিস ভাইরাসের কারণে এই রোগ হয়ে থাকে। ভাইরাসে আক্রান্ত কুকুর বা অন্য প্রাণীর লালা থেকে যা ছড়ায়।

পশু (কুকুর, বিড়াল, বানর বা বেজি) কামড় বা আঁচড় দিলে আক্রান্ত স্থানটি দ্রুত ক্ষারযুক্ত সাবান (কাপড় কাচার সাবান) এবং প্রবাহিত পানি দিয়ে ১৫-২০ মিনিট ধুতে হবে। এতে ক্ষতের মুখে থাকা ভাইরাসের বড় একটি অংশ মারা যায়। ক্ষতস্থানে ব্যান্ডেজ করা বা সেলাই দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। প্রাথমিক চিকিৎসার পর দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে।

কখন টিকা নিতে হবে

শুধু কামড় নয়, নখের আঁচড় লাগলে বা পশুর লালা শরীরের কোনো ক্ষতস্থানে লাগলেও টিকা নিতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) গাইডলাইন অনুযায়ী, দেরি না করে যত দ্রুত সম্ভব (২৪ ঘণ্টার মধ্যে হলে সবচেয়ে ভালো) টিকা নেওয়া উচিত।

টিকার ধরন ও সংখ্যা

সাধারণত দুই ধরনের ইনজেকশন দেওয়া হয়।

র‍্যাবিস ভ্যাকসিন: এটি র‍্যাবিসের বিরুদ্ধে শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি করে। বর্তমানে আধুনিক পদ্ধতিতে এটি চামড়ার ভেতর বা মাংসে দেওয়া হয়। সরকারিভাবে সাধারণত তিন থেকে চারটি ডোজ দেওয়া হয়।

ইমিউনোগ্লোবিউলিন (আরআইজি): আরআইজি জলাতঙ্ক প্রতিরোধের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জীবন রক্ষাকারী ইনজেকশন। এটি সাধারণ টিকার চেয়ে দ্রুত কিন্তু ভিন্নভাবে কাজ করে। ভাইরাসের আক্রমণকে শুরুতেই অকেজো করে দেয়।

তবে আরআইজি সবাইকে দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। এটি মূলত নির্ভর করে ক্ষত বা কামড়ের ধরনের ওপর। ডব্লিউএইচওর ক্ষতের ক্যাটাগরি অনুযায়ী—

১. যদি ক্ষত গভীর হয় বা রক্ত বের হয়।

২. চামড়া ভেদ করে দাঁত বসে যায়।

৩. যদি বন্য প্রাণী (শিয়াল বা বেজি) কামড় দেয় বা লালা কোনো খোলা ক্ষত বা মিউকাস মেমব্রেনের (চোখ বা মুখ) সংস্পর্শে আসে, তবেই টিকার পাশাপাশি সরাসরি ক্ষতের চারপাশে এই ইনজেকশন দেওয়া হয়, যা তাৎক্ষণিক সুরক্ষা দেয়।

যদি ক্ষত গভীর হয় বা রক্ত বের হয় তাহলে ইনজেকশন নিতে হবে

কামড় বা আঁচড় শরীরের যে যে জায়গায় লেগেছে, ঠিক সেই ক্ষতগুলোর ভেতরে ও চারপাশে সুইয়ের মাধ্যমে এটি দেওয়া হয়। তবে ক্ষতস্থান যদি ছোট হয় এবং ইনজেকশনের পুরো ডোজ সেখানে দেওয়া সম্ভব না হয়, তবে অবশিষ্ট অংশটুকু মাংসপেশিতে (সাধারণত ঊরু অথবা বাহুতে) দেওয়া হয়। তবে এটি কখনোই টিকার সঙ্গে একই সিরিঞ্জে মেশানো যাবে না। শরীরের ভিন্ন ভিন্ন বাহুতে টিকার প্রথম ডোজের সঙ্গে ইমিউনোগ্লোবিউলিন দিতে হবে। কিন্তু কোনো কারণে দেরি হলে টিকার প্রথম ডোজ নেওয়ার সাত দিনের মধ্যেও এটি দেওয়া যেতে পারে।

তবে অক্ষত চামড়ায় পশুর লালা লাগলে শুধু সাবানপানি দিয়ে ধুয়ে ফেলাই যথেষ্ট, টিকারও প্রয়োজন হয় না। আর যদি চামড়ার ওপর আঁচড় লাগে কিন্তু কোনো রক্ত না বের হয়, সে ক্ষেত্রে টিকা দিতে হবে, কিন্তু সাধারণত আরআইজি দেওয়ার প্রয়োজন নেই।

টিকা কোথায় পাবেন

বাংলাদেশের সব সরকারি জেলা সদর হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং ঢাকার মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে এই টিকা বিনা মূল্যে পাওয়া যায়। এ ছাড়া বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল ও ফার্মেসিতেও টিকাটি কিনতে পাওয়া যায়।

সতর্কবার্তা

যদি কামড় দেওয়া প্রাণীটি ১০ দিনের মধ্যে মারা যায় বা অস্বাভাবিক আচরণ করে, তবে কোনোভাবেই টিকার ডোজ মিস করা যাবে না। মনে রাখবেন, জলাতঙ্কের লক্ষণ একবার প্রকাশ পেলে রোগীকে বাঁচানো অসম্ভব, তাই প্রতিষেধকই একমাত্র ভরসা।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ।