রোগীকে না জানিয়েই শুরু হলো ক্যানসার চিকিৎসা

পুরান ঢাকার মেয়ে নুজহাত বেগম। তিন সন্তানের মা। জরায়ুমুখের ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছিলেন। চিকিৎসা শেষে এখন কেমন আছেন? জানাচ্ছেন রাফিয়া আলম

নুজহাত বেগম এখন সুস্থ আছেন
ছবি: পরিবারের সৌজন্যে

২০২৪ সালের কথা। হঠাৎই পিঠে ব্যথা বোধ করেন নুজহাত বেগম। ব্যথার তীব্রতা ছিল খুব বেশি। পরে জরায়ুমুখ থেকে অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণও হতে থাকে। নিজের অস্বস্তিকর কষ্টের কথা চিকিৎসক বোন বুশরা খাতুনকে জানালেন নুজহাত। কিছুদিন আগেই ঢাকার গণস্বাস্থ্য সমাজভিত্তিক মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস করেছেন বুশরা। চাকরিতেও ঢুকেছেন। বোনকে একজন স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে গেলেন বুশরা।

প্রথমেই বুঝে গেলেন চিকিৎসক বোন

নুজহাতকে প্যাপ স্মিয়ার পরীক্ষা করতে বললেন চিকিৎসক। এই পদ্ধতিতে জরায়ুমুখ থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়। নমুনা সংগ্রহের আগে তাঁকে যখন পরীক্ষা করছিলেন চিকিৎসক, তখনই তিনি আর বুশরা বুঝে ফেললেন, নুজহাতের হয়তো জরায়ুমুখের ক্যানসার হয়েছে।

বুশরার কাছ থেকে এ সন্দেহের কথা জানতে পেরে ভেঙে পড়েন নুজহাতের স্বামী, তিন পুত্র আর স্বজনেরা। তাঁদের মনে নুজহাতকে হারানোর ভয় ঢুকে গেল। তবে রোগটির বিষয়ে নুজহাতকে কেউ কিছু বললেন না।

ধানমন্ডির গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে বায়োপসিতে নিশ্চিত হলো ক্যানসারের উপস্থিতি। ভেঙে পড়লেও হাল ছাড়লেন না বুশরা। বোনকে নিয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের রেডিওথেরাপি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও ক্যানসার বিশেষজ্ঞ ডা. তন্নিমা অধিকারীর কাছে গেলেন বুশরা।

চিকিৎসা শুরু করার প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিলেন তিনি। কিন্তু ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে তো রোগীর চাপ বেশি। তাই রেডিওথেরাপির জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষার ঝুঁকি নিতে চাইল না রোগীর পরিবার। ডা. অধিকারীর অধীনেই মিরপুরের ডেলটা হাসপাতাল লিমিটেডে শুরু হলো নুজহাতের চিকিৎসা।

পথটা সহজ নয়

ডেলটা হাসপাতালে ৫টি কেমো এবং ২৪টি রেডিওথেরাপি শেষে আরও ৩টি বিশেষ রেডিওথেরাপি (ব্র্যাকিথেরাপি) দেওয়া হলো। দীর্ঘ এই লড়াই যে কঠিন ছিল, সেটা তো বলার অপেক্ষা রাখে না। ব্যথায় ভীষণ কষ্ট পেতেন নুজহাত। বমি হতো। ক্রমেই হারিয়ে

ফেলছিলেন শক্তি।

নুজহাত বেগমরা ছয় বোন, চার ভাই। ১০ জনের মধ্যে তিনিই সবার বড়। পরিবারের সবার প্রিয় ‘বুবু’। বুশরা খাতুন বলছিলেন, ‘বুবুর চিকিৎসার সময়টায় চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলাম। উচ্চতর শিক্ষা বা প্রশিক্ষণের বিষয়েও কিছুই পরিকল্পনা করিনি। বুবুর পাশে থাকাটাই সবচেয়ে জরুরি মনে হয়েছিল সেই সময়। বুবু বারবার জানতে চাইতেন, তাঁর কী হয়েছে। তাঁর শাশুড়ির পিত্তথলির ক্যানসার ছিল। তিনিও চিকিৎসা নিয়েছিলেন একই হাসপাতালে। সেই অভিজ্ঞতা থেকে বুবু ধারণা করছিলেন, হয়তো তাঁরও ক্যানসার হয়েছে।’

চিকিৎসা চলার সময়ই একদিন নিজের ফাইল দেখে রোগ সম্পর্কে জেনে যান নুজহাত। তবে তারপরও মনের জোর ধরে রাখেন। রমজান মাসে রোজাও রাখেন। তবে সেই সময়ও বমির সমস্যায় ভুগতেন। ২০২৫ সালের নভেম্বরে শেষ হয় তাঁর চিকিৎসা। ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন তিনি।

যুদ্ধজয়ী নুজহাত ও তাঁর পরিবার

৪৫ বছর বয়সী নুজহাতের তিন ছেলে। বড়টির বয়স ২৫ বছর, ছোটটির ১৫। বড় যত্ন করে সংসারটাকে গড়েছেন। সেই সংসারের সব কাজ আজও নিজ হাতেই করেন। সাহায্য করার জন্যও কাউকে প্রয়োজন হয় না।

নতুন করে চাকরিতে ঢুকেছেন তাঁর চিকিৎসক বোন বুশরা খাতুন। তিনি ও তাঁর আরও দুই অবিবাহিত বোন জরায়ুমুখের ক্যানসারের টিকা নেওয়া শুরু করেছেন। বিয়ের আগে, নির্দিষ্ট বয়সে জরায়ুমুখের টিকা নেওয়ার ব্যাপারে সবাইকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানালেন এই চিকিৎসক।