জাপানি শিশুরা কেন বাড়ি ফিরেই গরগরা করে? এতে কি রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ে?

জাপানের শিশুদের মধ্যে বাড়ি ফিরেই গরগরা করার রীতি প্রচলিত আছে। এই রীতির নাম ‘উগাই’। সুস্থ থাকতেই এই রীতির চল। আদতেই কি এভাবে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ে? ঢাকা মেডিকেল কলেজের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. কাকলী হালদার ও মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের শিশুবিশেষজ্ঞ ও সহকারী অধ্যাপক ডা. তাসনুভা খান–এর সঙ্গে কথা বলে জানাচ্ছেন রাফিয়া আলম

জাপানের শিশুদের মধ্যে বাড়ি ফিরেই গরগরা করার রীতি প্রচলিত আছে। এই রীতির নাম ‘উগাই’
জাপানি শিশু ঠান্ডা গরগরা

কী হয় গরগরা করলে?

ভালোভাবে গরগরা করা হলে মুখ ও গলার কিছু অংশের ভেতরের ময়লা সাময়িকভাবে কমতে পারে। মুখ থেকে পানি ফেলার সময়টায় কিছু অণুজীব, খাদ্যকণা ও ধুলা–ময়লা মুখ থেকে বেরিয়ে যায়। এভাবে কিছু জীবাণুর পরিমাণ কমতে পারে। তবে সংক্রমণের ঝুঁকি কমে, এমনটা সরাসরি বলার সুযোগ নেই।

ঘরের বাইরে গেলে নাক ও মুখ দিয়ে নানা জীবাণু ঢুকে পড়তে পারে। ফিরে আসার পর গরগরার মাধ্যমে মুখ ও গলার কিছু অংশের কিছু অণুজীব কমতে পারে। নিয়মিত গরগরা করলে মুখে দুর্গন্ধও কম হয়।

কতটা কার্যকর?

বাইরে থেকে ফিরে মুখ পরিষ্কার করতে গরগরা করা বা কুলি করা স্বাস্থ্যকর অভ্যাস। কিছু গবেষণার ফলাফল থেকে এমন ইঙ্গিত পাওয়া যায়, উগাই রীতি অনুসরণ করলে শিশুদের শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের ঝুঁকি কিছুটা কম হতে পারে। তবে এ বিষয়ে প্রমাণ এখনো সীমিত। সব গবেষণার ফলাফল একও নয়।

এ ছাড়া ক্ষতিকর সব জীবাণু গরগরা করার মাধ্যমে দূর করা সম্ভব নয়। উগাই সরাসরি রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ায়, এমন কোনো নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।

উগাইয়ের কোনো ক্ষতিকর দিক আছে কি?

গবেষণা অনুযায়ী, শৈশবের পরিবেশের নানান উপাদানের (যেমন মাটির কিছু জীবাণু) কারণে এ ধরনের রোগের প্রবণতা কম হতে পারে

আশির দশকের ‘হাইজিন হাইপোথিসিস’ বলছে, শিশুর বেড়ে ওঠার সময় তার পরিবেশের কিছু সাধারণ জীবাণু তার ভবিষ্যতের জন্য উপকারী হতে পারে।

এখনকার গবেষকেরা এই হাইপোথিসিসের আরও আধুনিক রূপ ‘ওল্ড ফ্রেন্ডস হাইপোথিসিস’-এর কথা বলেন।

এটি জানা থাকলে আপনার মনে হতে পারে যে উগাইয়ের চর্চার মাধ্যমে শৈশবের ঠান্ডাজ্বর হতে দেওয়ার সুযোগ কমে গেলে তা শিশুর ভবিষ্যতের জন্য ক্ষতির কারণ কি না।

তবে বিষয়টা আদতে এমন জটিল নয়।

ওল্ড ফ্রেন্ডস হাইপোথিসিস অনুযায়ী, যেসব শিশু প্রাকৃতিক পরিবেশে, প্রাণীদের কাছাকাছি কিংবা অনেক মানুষের মধ্যে বড় হয়, তাদের অ্যালার্জি এবং ইমিউন মেডিয়েটেড রোগ কম হয়।

ইমিউন মেডিয়েটেড রোগ হলো আমাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কিছুটা এলোমেলো হয়ে যাওয়ার কারণে সৃষ্ট রোগ।

শিশুদের জন্য সুস্থতার চর্চার পাশাপাশি স্বাভাবিক পরিবেশে আনন্দে বেড়ে ওঠার স্বাধীনতাও প্রয়োজন

হাইপোথিসিস অনুযায়ী, শৈশবের পরিবেশের নানান উপাদানের (যেমন মাটির কিছু জীবাণু) কারণে এ ধরনের রোগের প্রবণতা কম হতে পারে।

এই হাইপোথিসিস থেকে নিশ্চিতভাবে কোনো সিদ্ধান্তে আসা যায়নি আজও। কিন্তু এই হাইপোথিসিস আবার সংক্রমণ প্রতিরোধের বিপক্ষেও নয়। সুস্থতার চর্চার পাশাপাশি স্বাভাবিক পরিবেশে আনন্দে বেড়ে ওঠার স্বাধীনতাও প্রয়োজন

আরও প্রশ্ন জাগতে পারে, উগাই চর্চা করতে গিয়ে মুখের ভেতরের উপকারী জীবাণুও দূর হয়ে যায় কি না। কিন্তু সাধারণ পানি দিয়ে গরগরা করলে এসব উপকারী জীবাণুর স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার উল্লেখযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

অবশ্য গরগরা করতে প্রায়ই জীবাণুনাশক দ্রবণ ব্যবহার করা ঠিক নয়, তাতে মুখের উপকারী জীবাণুর স্বাভাবিক ভারসাম্য বিঘ্নিত হতে পারে।

সুস্থতার চর্চায়

সংক্রামক রোগ এড়াতে শৈশব থেকেই সুস্থতার চর্চা করার বিকল্প নেই। তাই খেয়াল রাখুন—

  • বাইরে থেকে ফিরে সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস করা জরুরি।

  • অপরিষ্কার হাত দিয়ে নাক, মুখ বা চোখ স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকা আবশ্যক।

  • অপরিষ্কার হাতে শৌচকর্ম করা হলে প্রস্রাবে সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে। মেয়েদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি অনেক বেশি।

  • খাওয়ার আগে এবং শৌচকর্মের পরে সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে।

  • সুষম পুষ্টি, পর্যাপ্ত ঘুম এবং সময়মতো টিকা গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

  • শাকসবজি এবং ফলমূল ভালোভাবে ধুয়ে খাওয়া উচিত।

  • যেকোনো খাবার তৈরি এবং পরিবেশনের প্রতিটি ধাপে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা প্রয়োজন।

  • শ্বাসের মাধ্যমে ছড়ায়, এমন রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে মাস্ক ব্যবহার করা উচিত।

বাইরে থেকে ফিরে সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস করা জরুরি
  • এসবের পাশাপাশি উগাইয়ের চর্চাও করা যেতে পারে। তাতে ক্ষতি নেই। তবে বিশেষ প্রয়োজন না থাকলে জীবাণুনাশী দ্রবণ দিয়ে গরগরা করবেন না। বরং গরগরা করতে পানি কিংবা সামান্য লবণ মেশানো পানি ব্যবহার করা যায়।

  • শিশুদের সব পশুপাখি থেকে পুরোপুরি দূরে রাখার প্রয়োজন নেই। বরং সুস্থ প্রাণীদের সঙ্গে থাকার কিছুটা সুযোগ পেলে ভবিষ্যতে তার শারীরিক ও মানসিক সুস্থতায় তা সহায়ক হবে।

  • ঘরের ভেতর শিশু হামাগুড়ি দিচ্ছে বলে মেঝে সব সময় জীবাণুমুক্ত দ্রবণ দিয়ে মুছতে হবে, এমনটাও প্রয়োজন নয়।

  • আরেকটু বড় হলে শিশুকে খোলা মাঠে, আলো-বাতাসে দৌড়ঝাঁপ করার সুযোগ করে দেওয়া উচিত।রার সুযোগ করে দেওয়া উচিত।