‘ভেন্টিলেটর’ নামক যন্ত্রে আটকে পড়া জীবনগুলোর কথা প্রায়ই ভাবী। হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে কাজ করার সুবাদে এমন রোগীদের দেখভাল করতে হয় হরহামেশা। তাঁদের দেখলে মনে হয়, স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাসটুকুই যে জীবনের জন্য এক বিশাল আশীর্বাদ। বুকভরে শ্বাসটুকুই যদি নিতে না পারেন তবে জীবনটা কী ভীষণ কষ্টের হয়ে দাঁড়ায়, ভাবুন একবার।

আজ ২৫ সেপ্টেম্বর, বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব ফুসফুস দিবস’। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য: সবার জন্য ফুসফুসের স্বাস্থ্য (লাং হেলথ ফর অল)। ফুসফুসের রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির বিশেষ যত্ন তো অবশ্যই প্রয়োজন, পাশাপাশি সুস্থ ব্যক্তির ফুসফুসেরও যত্ন চাই। ফুসফুস সুস্থ রাখতে করার আছে অনেক কিছু। এ বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছেন বাংলাদেশ ইন্টারভেনশনাল পালমোনোলজি, ক্রিটিক্যাল কেয়ার অ্যান্ড স্লিপ সোসাইটি (বিপস)-এর সভাপতি ডা. মো. জাকির হোসেন সরকার।
রোগকে জানুন
অ্যাজমা, সিওপিডি (ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ), ফুসফুসের ক্যানসার, যক্ষ্মা এবং ফুসফুসের অন্যান্য কিছু সংক্রমণ যেমন নিউমোনিয়া পৃথিবীব্যাপী ফুসফুসের প্রধানতম রোগ। এগুলোর প্রতিটিই প্রতিরোধযোগ্য। ডা. মো. জাকির হোসেন সরকার জানালেন, বিশ্বব্যাপী ফুসফুসের রোগ যে ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে, করোনা অতিমারিতে আরও বিস্তৃত পরিসরে তা ফুটে উঠেছে। পৃথিবীজুড়েই এসব রোগনির্ণয়, চিকিৎসা, প্রতিরোধের জন্য সমান সুযোগ-সুবিধাও নেই। রাষ্ট্রীয়ভাবে এটা নিশ্চিত করতে হবে। পৃথিবীর ২০ কোটি মানুষ সিওপিডিতে আক্রান্ত, অ্যাজমায় ভুগছেন ২৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ। প্রতিবছর নতুন করে ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছেন ২২ লাখ মানুষ। নিউমোনিয়া ও অন্যান্য সংক্রমণে ২৪ লাখ মানুষ প্রতিবছর মারা যান। গত এক দশকে যক্ষ্মায় মৃত্যুহারও বেড়েছে। তাই সচেতনতা আবশ্যক।
চাই সুস্থ জীবনধারা
· শ্বাসের ব্যায়ামের অভ্যাস গড়ে তুলুন। ফুসফুসের রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি তো বটেই, অন্যদের জন্যও এসব ব্যায়াম উপকারী।
· নিয়মিত শরীরচর্চার বিকল্প নেই। তবে সাধ্যের অতিরিক্ত ভারী ব্যায়াম না করাই ভালো।
· সুষম খাদ্যাভ্যাস চাই। ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন। গরুর মাংস, ইলিশ, চিংড়ি, বেগুন, মটর, কুমড়া, পুঁইশাক বা অন্য কোনো খাবারে অ্যালার্জি থাকলে এড়িয়ে চলুন।
· গাড়ি বা মোটরসাইকেলের ব্যবহার কমান। যতটা সম্ভব হাঁটুন। সাইকেল ও গণপরিবহন ব্যবহার করুন। সবাই এভাবে উৎসাহিত হলে দূষণের মাত্রা কমবে।
· মানসিক চাপ কমান। জীবনকে সহজভাবে নিন।
টিকা নিন
· সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় শিশুদের টিকা দিন।
· করোনাভাইরাসের টিকা নিন।
· অ্যাজমা কিংবা সিওপিডিতে আক্রান্ত ব্যক্তি এবং ৬৫ বছর পেরোনো ব্যক্তির নিউমোনিয়া ও ইনফ্লুয়েঞ্জা প্রতিরোধে টিকা নিতে হবে।
মানতে হবে স্বাস্থ্যকথা
পরিবারের সবার ফুসফুস সুস্থ থাকলেও তাঁদের মধ্যেই কারও কারও অ্যালার্জির প্রবণতা থাকে, যাঁদের পরবর্তীকালে ফুসফুসের রোগ হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তা ছাড়া কিছু বস্তু সবার জন্যই ক্ষতিকর। তাই আরও কিছু বিষয় সবারই মেনে চলা প্রয়োজন—
· ধূমপান বর্জন করতে হবে। ধূমপায়ী একাই ভুক্তভোগী নন। আশপাশের শিশু, গর্ভবতী নারী, বয়স্ক ব্যক্তিসহ অন্য সবাই থাকেন স্বাস্থ্যঝুঁকিতে।
· ঘরের বাইরে গেলে মাস্ক পরতে হবে। ধুলায় কাজ করতে হলেও মাস্ক পরতে হবে। ধুলায় যাঁদের অ্যালার্জি রয়েছে, তাঁদের এসব কাজ না করাই ভালো।
· কার্পেট ব্যবহার করবেন না।
· কম্বল ব্যবহার করলে সেটিকে সুতি কাপড়ের কাভারে জড়িয়ে নিন। লোমশ পোশাক এবং খেলনা বর্জনীয়।
· মৌসুমি ফুলের রেণু ছড়ানোর সময় ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ রাখুন।
· তীব্র ঘ্রাণের সুগন্ধি বর্জনীয়।
· এসবের বাইরেও কারও নির্দিষ্ট কোনো কিছুতে অ্যালার্জি থাকলে সেটি এড়িয়ে চলতে হবে।
· কাঠ, কয়লা, গোবর, পলিথিন, ময়লা প্রভৃতি পোড়ানো থেকে বিরত থাকুন।
· যেখানেই সম্ভব গাছ লাগান (বাড়ির অন্দরেও)। প্রকৃতির সংস্পর্শে থাকুন।
· অ্যাজমা বা সিওপিডিতে আক্রান্ত ব্যক্তির কোনো কোনো ওষুধ সেবনে সমস্যা বাড়তে পারে। সেগুলো এড়িয়ে চলতে হবে।
রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে
· অতিরিক্ত দূষণের জন্য দায়ী যানবাহন ও কলকারখানার বিষয়ে রাষ্ট্রীয় নজরদারি আবশ্যক।
· দূষণের মাত্রা ও অতিরিক্ত দূষণের সময়কাল সম্পর্কে জনগণকে জানাতে হবে। দূষণের সময়গুলোয় বাইরে যাওয়া আবশ্যক হলে মাস্ক পরবেন।
লেখক: চিকিৎসক