প্রক্রিয়াজাত খাবার কেন এড়িয়ে চলবেন

প্রক্রিয়াজাত মাংসে থাকে নানা ধরনের খাদ্য সংরক্ষণকারী উপাদান
ছবি: পেক্সেলস ডটকম

ব্যস্ত আধুনিক জীবনে সময় বাঁচাতে আমরা ক্রমেই প্যাকেটজাত ও প্রক্রিয়াজাত খাবারের দিকে ঝুঁকছি। বিস্কুট, চিপস, সস, জুস, ইনস্ট্যান্ট নুডলস থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াজাত মাংস—সবখানেই থাকে নানা ধরনের খাদ্য সংরক্ষণকারী উপাদান। এগুলোর মূল কাজ হলো খাবার দীর্ঘদিন ভালো রাখা, ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকের বৃদ্ধি রোধ করা এবং স্বাদ ও রং বজায় রাখা। তবে সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, এই সুবিধার পেছনে লুকিয়ে থাকতে পারে কিছু দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি।

যাঁরা নিয়মিত প্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণ করেন, তাঁদের মধ্যে ক্যানসারের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি

নতুন গবেষণা কী বলছে

আন্তর্জাতিক মেডিক্যাল জার্নাল ও ম্যাডস্ক্যাপে প্রকাশিত সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ফ্রান্সের এক বৃহৎ নিউট্রিনেটসেন্টéগবেষণায় এক লাখের বেশি মানুষের খাদ্যাভ্যাস বহু বছর ধরে বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণায় দেখা যায়, যাঁরা নিয়মিত বেশি পরিমাণে প্রক্রিয়াজাত খাবার ও নির্দিষ্ট সংরক্ষণকারী উপাদান গ্রহণ করেন, তাঁদের মধ্যে ক্যানসার ও টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি।

ক্যানসারের সঙ্গে সম্পর্ক

গবেষণায় দেখা গেছে, সব সংরক্ষণকারী উপাদান সমানভাবে ক্ষতিকর নয়। তবে কিছু উপাদান বিশেষভাবে নজরে এসেছে।

  • সোডিয়াম নাইট্রাইট ও নাইট্রেট, যা সসেজ, বেকনসহ প্রক্রিয়াজাত মাংসে ব্যবহার করা হয়। এ ধরনের উপাদানগুলো প্রোস্টেট ও স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়।

  • পটাশিয়াম সরবেট ও সালফাইট, যা প্যাকেটজাত খাবার ও পানীয়তে ব্যবহৃত হয়, সামগ্রিক ক্যানসারের ঝুঁকি সামান্য বাড়াতে পারে বলে গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই উপাদানগুলো সাধারণত এমন খাবারে ব্যবহৃত হয়, যেগুলো পুষ্টিগুণে দরিদ্র এবং লবণ, চিনি বা ক্ষতিকর চর্বিতে ভরপুর। ফলে ঝুঁকির পেছনে সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসও বড় ভূমিকা রাখে।

আলট্রা প্রসেসড খাবার কম খেয়ে ঘরে রান্না করা, টাটকা ও মৌসুমি খাবারে জোর দিন

টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি

অন্য একটি গবেষণায় দেখা যায়, সংরক্ষণকারী উপাদান বেশি গ্রহণকারীদের মধ্যে টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত বেশি হতে পারে। পটাশিয়াম সরবেট, ক্যালসিয়াম প্রোপিওনেট, অ্যাসটিক অ্যাসিডের মতো উপাদানের সঙ্গে এই ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। ধারণা করা হয়, এসব উপাদান শরীরের ইনসুলিন সংবেদনশীলতা ও অন্ত্রের জীবাণু ভারসাম্য প্রভাবিত করতে পারে।

তাহলে কি সংরক্ষণকারী উপাদান পুরোপুরি বাদ দিতে হবে

বিশেষজ্ঞদের মতে, আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। বর্তমান গবেষণা আমাদের সচেতন হতে বলছে, নিষিদ্ধ করতে নয়। কারণ, এসব উপাদান ছাড়া খাবার দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়। তবে বাস্তবসম্মত কিছু পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে—

  • আলট্রা প্রসেসড খাবার যতটা সম্ভব কম খান।

  • ঘরে রান্না করা, টাটকা ও মৌসুমি খাবারে জোর দিন।

  • খাবারের প্যাকেটে লেখা ইনগ্রিডিয়েন্ট দেখে নিন।

  • প্রক্রিয়াজাত মাংস কম খাওয়ার চেষ্টা করুন।

খাদ্য সংরক্ষণকারী উপাদান আমাদের জীবন সহজ করেছে, কিন্তু অতিরিক্ত নির্ভরতা ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াতে পারে। সুষম খাদ্যাভ্যাস ও পরিমিত জীবনযাপনই হতে পারে ক্যানসার ও ডায়াবেটিসের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগ প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

ডা. সাইফ হোসেন খান, সহকারী অধ্যাপক ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ধানমন্ডি