কোন ভঙ্গিতে ঘুমানো সবচেয়ে ভালো, বিজ্ঞান কী বলে

ঘুম কতটা ভালো হবে, তা আদতে নির্ভর করে আমরা কীভাবে ঘুমাচ্ছি, তার ওপর। তাহলে বিজ্ঞানীদের মতে ঘুমানোর সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি কোনটি? ভালো ঘুমের জন্য ও শরীরের নানা উপকার পেতে আমাদের চিত হয়ে ঘুমানো উচিত, নাকি পাশ ফিরে কুঁকড়ে ঘুমানো ভালো, তা জানতে কাজ করেছেন আমেরিকান একাডেমি অব স্লিপ মেডিসিনের বিশেষজ্ঞ ড. জন সাইটো। তবে তাঁর মতে, এর উত্তর যতটা সহজ মনে হচ্ছে, আদতে ততটা সহজ নয়।

হান্স ক্রিস্টিয়ান অ্যান্ডারসেনের ‘রাজকুমারী ও মটরশুঁটি’ গল্পের অংকরণ
ছবি: উইকিমিডিয়া কমনস

রূপকথার জাদুকর হান্স ক্রিস্টিয়ান অ্যান্ডারসেনের একটি বিখ্যাত গল্প ‘রাজকুমারী ও মটরশুঁটি’। সেখানে এক রাজকুমারীকে পরীক্ষা করার জন্য তার বিছানার নিচে ২০টি তোশক ও হাঁসের পালকের ২০টি চাদরের নিচে একটি মটরশুঁটি রাখা হয়। আর সেই একটি মটরশুঁটির কারণেই রাজকুমারী সারা রাত অস্বস্তিতে এপাশ-ওপাশ করে।

সকালে রানি নিশ্চিত হন, মেয়েটি সত্যিই রাজকুমারী। কারণ, তার শরীর ভীষণ সংবেদনশীল। তবে আজকের কোনো ঘুমবিশেষজ্ঞকে জিজ্ঞেস করলে হয়তো বলবেন, মেয়েটির এই কষ্টের পেছনে মটরশুঁটি নয়, বরং তার ঘুমানোর ভঙ্গিই দায়ী ছিল।

শুরুটা হয় সহজ শ্বাসপ্রশ্বাস দিয়ে

ভালো ঘুমের ভঙ্গি মূলত নির্ভর করে আপনি কত সহজে শ্বাস নিতে পারছেন, তার ওপর। একেকজন ব্যক্তির ঘুমানোর প্রিয় ভঙ্গি একেক রকম হতে পারে। কেউ বাঁ দিকে, কেউ ডান দিকে, আবার কেউ চিত বা উপুড় হয়ে ঘুমান। কিন্তু কোন ভঙ্গিটি আপনার জন্য সেরা, তা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে।

আপনি যদি চিত হয়ে শুয়ে থাকেন এবং বালিশটি যদি ঘাড় ও মেরুদণ্ডকে সঠিক অবস্থানে রাখে, তবে শ্বাসনালি সুগম থাকে। এতে শ্বাস নিতে সুবিধা হয়, যা শরীরের জন্য ভালো।

তবে সবার জন্য চিত হয়ে ঘুমানো ঠিক নয়। যাঁদের স্লিপ অ্যাপনিয়ার সমস্যা আছে, তাঁদের জন্য এটি ক্ষতিকর হতে পারে। এ সমস্যায় ঘুমের মধ্যে মানুষের শ্বাসপ্রশ্বাস মাঝেমধ্যে থেমে যায়।

সাধারণত গলার পেশি শিথিল হয়ে শ্বাসনালি বন্ধ করে দিলে এমন হয়। চিত হয়ে শোয়ার সময় যদি জিব গলার পেছনের দিকে চলে গিয়ে বাতাস চলাচলে বাধা দেয়, তবে তা স্বাস্থ্যের জন্য খারাপ।

অন্য দিকে একেবারে ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকেরা সব সময় চিত করে শোয়ানোর পরামর্শ দেন। এটি শিশুদের হুট করে মৃত্যুর ঝুঁকি (এসআইডিএস) কমাতে সাহায্য করে।

যাঁরা পাশ ফিরে ঘুমান, তাঁদের জন্য সুখবর

খাবারের পাশাপাশি পর্যাপ্ত ঘুম টেস্টোস্টেরন ঠিক রাখতে গুরুত্বপূর্ণ

প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য পাশ ফিরে ঘুমানোর বেশ কিছু ভালো দিক আছে। আপনি যদি ডান দিকে পাশ ফিরে ঘুমান, তবে সেটি শরীরে রক্তসঞ্চালনের জন্য ভালো। এতে হৃৎপিণ্ডের ওপর চাপ কম পড়ে। আমাদের ফুসফুস দুটির মাঝখানে ‘মিডিয়াস্টিনাম’ নামে একটি নমনীয় অংশ থাকে, যা হৃৎপিণ্ডকে সঠিক জায়গায় ধরে রাখতে সাহায্য করে।

অন্য দিকে বাঁ দিকে পাশ ফিরে ঘুমানো আমাদের মস্তিষ্কের জন্য উপকারী। আমাদের মস্তিষ্কে ‘গ্লিমফ্যাটিক সিস্টেম’ নামের একটি বিশেষ বর্জ্য নিষ্কাশনব্যবস্থা আছে।

আমরা যখন ঘুমাই, তখন এই ব্যবস্থা মস্তিষ্ক থেকে ক্ষতিকর প্রোটিন ও বর্জ্য পদার্থ পরিষ্কার করে দেয়। এটি আলঝেইমার ডিজিজের ঝুঁকি কমাতেও সাহায্য করে।

তবে পাশ ফিরে শোয়ার ক্ষেত্রেও কিছু বিষয় খেয়াল রাখতে হয়। শরীরকে মোটামুটি সোজা রেখে যেকোনো এক পাশে ফিরলে মেরুদণ্ড সঠিক অবস্থানে থাকে। আবার যাঁরা কোমরের ব্যথায় ভুগছেন, তাঁদের জন্য কিছুটা কুঁকড়ে ঘুমানো আরামদায়ক হতে পারে।

কিন্তু মনে রাখতে হবে, অতিরিক্ত কুঁকড়ে বা ভাঁজ হয়ে ঘুমালে বুকে ও ডায়াফ্রামে চাপ পড়ে। এতে স্বাভাবিক শ্বাসপ্রশ্বাস বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

আপনার জন্য সঠিক ঘুমের ভঙ্গি

বিজ্ঞানের নিয়ম যা-ই হোক না কেন, একেক ব্যক্তির ঘুমানোর প্রিয় ভঙ্গি একেক রকম হয় এবং এর পেছনে যৌক্তিক কারণও থাকে

বিজ্ঞানের নিয়ম যা-ই হোক না কেন, একেক ব্যক্তির ঘুমানোর প্রিয় ভঙ্গি একেক রকম হয় এবং এর পেছনে যৌক্তিক কারণও থাকে। যাঁর কোমরে প্রচণ্ড ব্যথা, তাঁকে যদি জোর করে চিত হয়ে ঘুমাতে বলা হয়, তবে তাঁর শ্বাসপ্রশ্বাস ভালো হলেও হাড় ও জয়েন্টের ব্যথার কারণে তিনি ঘুমাতেই পারবেন না।

তাই কোনো একটি নির্দিষ্ট ভঙ্গির বদলে তিনটি বিষয় খেয়াল রাখা যেতে পারে—শ্বাসনালি, শ্বাসপ্রশ্বাস ও রক্তসঞ্চালন। আপনার যদি অ্যালার্জি বা নাক বন্ধ থাকার সমস্যা থাকে, অথবা ঘুমের মধ্যে শ্বাস থেমে যাওয়ার ভয় থাকে, তবে এমন একটি ভঙ্গি বেছে নিতে হবে, যাতে আপনার শ্বাসনালি খোলা থাকে এবং সহজে শ্বাস নিতে পারেন। সহজ কথায়, যে ভঙ্গিতে আপনার দম বন্ধ হবে না এবং শরীর আরাম পাবে, সেটিই আপনার জন্য সেরা।

ঘুমানোর সময় নড়াচড়া ও আরামদায়ক ভঙ্গি

যাঁদের ঘুমাতে সমস্যা হয়, তাঁরা সাধারণত বেশি নড়াচড়া করেন

এমন কেউ নেই, যিনি ঘুমের মধ্যে একদম স্থির হয়ে থাকেন। মানুষ সাধারণত নিজের পছন্দের ভঙ্গিতে ঘুমানো শুরু করলেও রাতের বেলা অজান্তেই ঘুমের ভঙ্গি পরিবর্তন করে।

তবে স্বাভাবিকভাবে ভঙ্গি বদলানো আর আরাম না পেয়ে বারবার ছটফট করার মধ্যে পার্থক্য আছে। অল্প নড়াচড়া করা স্বাভাবিক, কিন্তু অতিরিক্ত ছটফট করার অর্থ হলো আপনার ঘুমে কোনো সমস্যা হচ্ছে।

যাঁদের ঘুমাতে সমস্যা হয়, তাঁরা সাধারণত বেশি নড়াচড়া করেন। তবে কিছু সহজ উপায়ে ঘুমের ভঙ্গি উন্নত করা সম্ভব। আপনি যদি পাশ ফিরে ঘুমান, তবে দুই হাঁটুর মধ্যে একটি বালিশ রাখতে পারেন।

এতে আপনার মাথা, ঘাড় ও কোমর সঠিক অবস্থানে থাকে এবং শ্বাসপ্রশ্বাস সহজ হয়। ফলে ঘুম আরও গভীর ও আরামদায়ক হয়।

যাঁরা চিত হয়ে ঘুমান, তাঁরা হাঁটুর নিচে একটি বালিশ রাখতে পারেন। আর যাঁরা উপুড় হয়ে ঘুমাতে পছন্দ করেন, তাঁরা পেটের নিচের অংশে বা কোমরের নিচে একটি পাতলা বালিশ ব্যবহার করতে পারেন। এ ছাড়া মেরুদণ্ডের হাড়ের গঠন অনুযায়ী সঠিক তোশক বা ম্যাট্রেস বেছে নেওয়াও জরুরি।

শেষ কথা

যে ভঙ্গিতে আপনি সবচেয়ে বেশি আরাম পাবেন এবং শরীর বিশ্রাম পাবে, সেটিই আপনার জন্য সবচেয়ে ভালো

সবার জন্য ঘুমের একটি মাত্র বা সেরা কোনো ভঙ্গি নেই। এটি একেকজনের শারীরিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে। গর্ভাবস্থা, পিঠের ব্যথা বা নাক ডাকার সমস্যার ওপর ভিত্তি করে ঘুমানোর ভঙ্গি আলাদা হতে পারে।

মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি ভঙ্গি খুঁজে বের করা, যাতে আপনি কোনো বাধা ছাড়াই পর্যাপ্ত সময় ভালো ঘুমাতে পারেন। যে ভঙ্গিতে আপনি সবচেয়ে বেশি আরাম পাবেন এবং শরীর বিশ্রাম পাবে, সেটিই আপনার জন্য সবচেয়ে ভালো।

সূত্র: পপুলার সায়েন্স