
সন্তানকে নিয়ে মায়ের আত্মহত্যা কিংবা ঋণ শোধ করতে না পেরে পরিবারের সবাইকে হত্যা করে বাবার আত্মহত্যা—সাম্প্রতিক সময়ে দেশের সংবাদপত্রে এ ধরনের একাধিক খবর প্রকাশিত হয়েছে। ক্রিমিনোলজি ও মনোরোগবিদ্যায় এই ঘটনাগুলোকে বলে ‘বর্ধিত আত্মহত্যা’ বা এক্সটেনডেড সুইসাইড। এ ঘটনাগুলোতে পরে তেমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয় না যেহেতু ভিকটিম এবং হত্যাকারী কেউই আর বেঁচে থাকে না।
বাংলাদেশে এক্সটেনডেড সুইসাইড নিয়ে গবেষণা এখনো তুলনামূলকভাবে কম। তবে সাম্প্রতিক কিছু গবেষণায় দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত এ ধরনের ঘটনার একটি চিত্র পাওয়া যায়। ২০১৪ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ঘটনার ওপর ভিত্তি করে একটি গবেষণায় ২৬টি ফিলিসাইড-এক্সটেনডেড সুইসাইডের (প্রথমে নিজের সন্তানকে হত্যা করে পরে নিজে আত্মহত্যা বা আত্মহত্যার চেষ্টা) ঘটনা শনাক্ত করা হয়েছে।
এসব ঘটনায় মোট ৬৯ জনের মৃত্যু হয়, যার মধ্যে ৪৫ জন ছিল শিশু। গবেষণায় দেখা যায়, অধিকাংশ ঘটনায় অপরাধী পরে আত্মহত্যা করেছিলেন। পারিবারিক কলহ, আর্থিক সংকট ও দারিদ্র্যজনিত চাপকে বেশ কিছু ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এক্সটেনডেড সুইসাইড বা বর্ধিত আত্মহত্যা এমন একটি অবস্থা, যখন কোনো ব্যক্তি চরম হতাশায় তাঁর ওপর নির্ভরশীল স্বজনদের (যেমন সন্তান, স্ত্রী বা বৃদ্ধ বাবা-মা) হত্যা করে নিজে আত্মহত্যা করেন। ব্যক্তি নিজেকে আর ভুক্তভোগীকে আলাদা করে দেখেন না, তাঁর কাছে দুজনের ভাগ্য একসূত্রে গাঁথা।
এটি তীব্র মানসিক বিপর্যয় ও বিষণ্নতার চরম বহিঃপ্রকাশ। অধিকাংশ ক্ষেত্রে যিনি এই পথ বেছে নেন, তিনি মনে করেন, তিনি যাঁদের ভালোবাসেন, তাঁর মৃত্যুর পর এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে তাঁরা চরম কষ্টে পড়বে। তীব্র বিষণ্নতা ও অবচেতন মানসিক ট্রমার কারণে তিনি ভাবেন, স্বজনদের সঙ্গে নিয়ে একবারে বিদায় নেওয়াই বোধ হয় তাঁদের কষ্ট থেকে মুক্তি দেওয়ার একমাত্র উপায়।
১. অল্ট্রুইস্টিক মোটিভ বা পরহিতৈষী চিন্তা: ব্যক্তি মনে করেন, তিনি আত্মহত্যা করলে তাঁর পরিবারের সদস্য বা কাছের মানুষ সেটা সহ্য করতে পারবেন না অথবা আরও বেশি ঝামেলার মধ্যে পড়বেন, তাঁরা তাঁর অনুপস্থিতিতে এমন এক কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে পড়বেন, যেটা মোকাবিলা করতে পারবেন না। তাই একসঙ্গে মারা যাওয়াই ভালো।
২. মানসিক বৈকল্য: অধিকাংশ ক্ষেত্রে ওই ব্যক্তির মানসিক বৈকল্য থাকে। বিশেষ করে চরম হতাশা বা বিষণ্নতা এবং সাইকোসিস (ডিল্যুশন, হ্যালুসিনেশন) অন্যতম। এ ছাড়া প্রসব–পরবর্তী হতাশাও একটি কারণ।
৩. ভ্রান্ত বিশ্বাস: অনেক সময় ব্যক্তি মনে করেন, তিন আর তাঁর কাছের মানুষ আলাদা কেউ নন, তাঁরা এক; তাই একসঙ্গেই মারা যাওয়াই উত্তম। যেহেতু প্রচণ্ড সামাজিক ও মানসিক চাপ, অর্থনৈতিক খারাপ অবস্থা ইত্যাদি কারণে ব্যক্তি আত্মহত্যা করার সিদ্ধান্ত নেন, তাই একসঙ্গে মারা গেলে সব সমাধান হয়ে যাবে—এ ধরনের ভ্রান্ত চিন্তা ওই ব্যক্তির মধ্যে থাকতে পারে।
৪. সহিংসতা ও নিরাপত্তাহীনতা: নিজেকে এবং পরিবারকে এক চরম ও অসহনীয় ভবিষ্যতের মুখোমুখি মনে করা।
১. লক্ষণ চেনা: পরিবার বা চারপাশের কারও ব্যবহারে হঠাৎ বড় পরিবর্তন, চরম হতাশা দেখলে কিংবা কেউ নিজেকে গুটিয়ে নিলে বা বেঁচে থাকার ইচ্ছা হারানোর কথা বললে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে।
২. মানসিক স্বাস্থ্যের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা: বিষণ্নতা বা মানসিক চাপকে লুকিয়ে না রেখে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার পরিবেশ তৈরি করা।
৩. সামাজিক সুরক্ষা ও সহানুভূতি: অর্থনৈতিক বা সামাজিকভাবে বিপদে পড়া মানুষের পাশে দাঁড়ানো, তাদের একাকী বোধ করতে না দেওয়া।
৪. সামাজিক সহিংসতা ও পারিবারিক কলহ: এসব কারণে পরিবারের কেউ অতিরিক্ত মানসিক চাপের মধ্যে আছে কি না, সেদিকে আগে থেকেই লক্ষ রাখতে হবে।
৫. সংবাদমাধ্যমের দায়িত্বশীলতা: এ ধরনের ঘটনার খবর পরিবেশনের সময় দায়িত্বশীল হতে হবে। কোনোভাবেই চমকপ্রদভাবে উপস্থাপন করা যাবে না। বরং সাহায্যের জন্য মানসিক হেল্পলাইনের তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া জরুরি।
তথ্যসূত্র: ফিলিসাইড-এক্সটেনডেড সুইসাইড ইন বাংলাদেশ: এ রেট্রোস্পেকটিভ অ্যানালাইসিস অব মিডিয়া-রিপোর্টেড কেইসেস