আপনি ঠিকভাবে শ্বাস নিচ্ছেন তো? জানুন এর গুরুত্ব ও সঠিক নিয়ম

অনেকেই ভাবেন, শ্বাসপ্রশ্বাস তো স্বাভাবিক ব্যাপার। চোখের পলক যেমন আপনা–আপনি পড়ে, শ্বাসপ্রশ্বাসও নিজে নিজেই চালিত হয়। কিন্তু একটু বদ্ধ কোনো জায়গায় গেলে, কিংবা সামান্য সর্দি-কাশি হলেই বোঝা যায়, শ্বাসপ্রশ্বাস আপনা–আপনি হয় না। বরং এটাকে ঠিক রাখতে হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, সুস্থ সবল প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের শ্বাসপ্রশ্বাস নেওয়ায় থাকতে পারে বড় ধরনের ত্রুটি। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘ডিসফাংশনাল ব্রিদিং’।

চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, সুস্থ সবল প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের শ্বাসপ্রশ্বাস নেওয়ায় থাকতে পারে বড় ধরনের ত্রুটি
ছবি: পেক্সেলস

যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব ম্যানচেস্টারের অধ্যাপক ড. স্টিফেন ফাওলার জানান, কোনো রোগবালাই ছাড়াই এ ধরনের সমস্যা তৈরি হতে পারে। যদি কারও অ্যাজমা বা হাঁপানির মতো সমস্যা থাকে, তবে এই ত্রুটির কারণে শ্বাসকষ্ট বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে। যেহেতু শ্বাস নেওয়া নিয়ে আমরা তেমন একটা ভাবি না, তাই প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ১২ শতাংশ অজান্তে এ ধরনের সমস্যায় ভুগছেন।

কীভাবে বুঝবেন শ্বাস ঠিকভাবে নিচ্ছেন?

সহজে বিছানায় শুয়েই করতে পারবেন শ্বাস–প্রশ্বাসের পরীক্ষা

এই পরীক্ষা করতে আপনাকে চিকিৎসকের কাছে ছুটতে হবে না। বরং সহজে বিছানায় শুয়েই করতে পারবেন পরীক্ষা। আমেরিকান লাং অ্যাসোসিয়েশনের মুখপাত্র ড. হুয়ানিটা মোরা একটা সহজ উপায় বাতলে দিয়েছেন।

১. প্রথমে চিত হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ুন।

২. এক হাত বুকের ওপর এবং অন্য হাত পেটের ওপর রাখুন।

৩. এবার স্বাভাবিকভাবে যেভাবে শ্বাস নেন, সেভাবে নিন।

৪. যদি পেটের ওপর রাখা হাতটি ওপরে ওঠে, তবে বুঝবেন আপনার শ্বাসপ্রশ্বাস সঠিক নিয়মে, অর্থাৎ ডায়াফ্রাগম্যাটিক ব্রিদিং হচ্ছে। সঠিক শ্বাসপ্রশ্বাস সব সময় ধীর, শান্ত এবং নাক দিয়ে হয়।

৫. আর যদি দেখেন শ্বাস নেওয়ার সময় কাঁধ নড়াচড়া করছে, বুক ও পিঠ ওপরে-নিচে নড়াচড়া করছে। তাহলেই বুঝবেন শ্বাসপ্রশ্বাস ঠিকভাবে নেওয়া হচ্ছে না। ত্রুটি থাকলে শ্বাসপ্রশ্বাস প্রক্রিয়াটি হবে অগভীর, দ্রুত, মুখ দিয়ে।

কেন এটি সমস্যা?

খুব একটা পার্থক্য মনে না হলেও এর পেছনে বেশ কিছু সমস্যা লুকিয়ে আছে। প্রতিবার শ্বাস নেওয়ার পেছনে ফুসফুসের নিচের ডায়াফ্রাম পেশি, স্নায়ুতন্ত্র ও অনুভূতির একটা সংযোগ থাকে।

আমাদের শ্বাসপ্রশ্বাসের ধরন আবেগ-অনুভূতিকে পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করে। যখন কেউ দুশ্চিন্তায় থাকে, কিংবা কোনো বিষয়ে কষ্ট পায়, তখন সে অস্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিতে শুরু করে। ভয়, দুশ্চিন্তা, চাপ থেকে অনেকের স্বাভাবিক ছন্দ ভেঙে যায়।

মজার ব্যাপার হলো, এই লেখা পড়তে পড়তে আপনি নিজেও ভাবতে পারেন ‘আমি বোধ হয় ঠিকভাবে শ্বাস নিতে পারছি না’—এই চিন্তাটাতেই শরীরের স্বাভাবিক শ্বাসপ্রশ্বাসের ছন্দ বিগড়ে যেতে পারে।

ঠিকভাবে শ্বাস না নিতে পারলে মস্তিষ্কে অক্সিজেনের অভাব তৈরি হয়। এ ছাড়া অনিদ্রা, বিষণ্নতা, ঘাড় ও কাঁধে তীব্র ব্যথা তৈরি হতে পারে

অবচেতন মনেই তখন আমরা ধরে নিই, শরীরে অক্সিজেনের অভাব হচ্ছে। এখন বেশি বেশি অক্সিজেন দরকার। ফলে শরীর আপনা–আপনি প্রতিক্রিয়া হিসেবে আরও জোরে ও দ্রুত শ্বাস নিতে শুরু করে।

ঠিকভাবে শ্বাস না নিতে পারলে মস্তিষ্কে অক্সিজেনের অভাব তৈরি হয়। এ ছাড়া অনিদ্রা, বিষণ্নতা, ঘাড় ও কাঁধে তীব্র ব্যথা তৈরি হতে পারে।

এ ছাড়া অক্সিজেনের পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকলে দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি, মাথা ঘোরা এবং ‘এয়ার হাঙ্গার’ বা পর্যাপ্ত বাতাস না পাওয়ায় ছটফটানি তৈরি হয়, যা অ্যাজমা বা আইবিএসের সমস্যাও বাড়িয়ে দেয়।

প্রতিকার

এর প্রতিকার অবশ্য বেশ সহজ। প্রথমেই ‘আমি শ্বাস ঠিকমতো নিচ্ছি কি না’—এই চিন্তা মাথা থেকে দূরে ঠেলে দিতে হবে। কারণ, এই চিন্তাই সমস্যা না থাকলেও সমস্যা তৈরি করতে পারে। মূলত ব্রিদিং এক্সারসাইজ বা শ্বাসপ্রশ্বাসের ব্যায়াম এবং জীবনযাত্রায় কিছুটা পরিবর্তনের মাধ্যমে শ্বাসপ্রশ্বাস আগের মতো করা সম্ভব।

শ্বাসের গতি কমানো

গবেষকদের মতে, দিনে অন্তত কয়েকবার নিজের শ্বাসের গতির দিকে নজর দিন। সচেতনভাবে শ্বাস নেওয়া ও ছাড়ার গতি ঠিক রাখলে তা মানসিক চাপ অনেকটা কমিয়ে দেবে। মন শান্ত হলে ফুসফুসও তার সঠিক ছন্দ ফিরে পায়।

গবেষকদের মতে, দিনে অন্তত কয়েকবার নিজের শ্বাসের গতির দিকে নজর দিন

মনকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়া

যখনই মনে হবে দম ফুরিয়ে আসছে, তখন জোর করে বুক ভরে শ্বাস নিতে যাবেন না। বরং শ্বাসপ্রশ্বাসকে নিজের মতো চলতে দিন। জোর করে শ্বাসপ্রশ্বাস প্রক্রিয়া চালাতে গেলে উল্টো শ্বাসকষ্ট বাড়বে। তার চেয়ে বরং অন্য কিছু ভাবুন। এতে শ্বাসপ্রশ্বাসের পাশাপাশি মনটাও ঠিক হয়ে যাবে।

নাক দিয়ে শ্বাস নিন
সব সময় চেষ্টা করুন, মুখ বন্ধ রেখে নাক দিয়ে শ্বাস নেওয়ার। শুরুতে সমস্যা থাকলেও ধীরে ধীরে অভ্যাস করলে ঠিক হয়ে যাবে। তবে একান্তই সম্ভব না হলে বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ বা ফিজিওথেরাপিস্টের শরণাপন্ন হন। তাঁরা বিশেষ শ্বাসের ব্যায়ামের মাধ্যমে ফুসফুসের পেশিগুলোকে নতুন করে ‘ট্রেইন আপ’ করেন। এতে শ্বাসকষ্ট কমবে, শ্বাসপ্রশ্বাস প্রক্রিয়াও হবে স্বাভাবিক।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, আমেরিকান লাং অ্যাসোসিয়েশন