অনেক মা–বাবা দুশ্চিন্তা করেন, বৃষ্টিতে ভিজলে শিশুর ঠান্ডা লেগে যাবে, নিউমোনিয়া হবে। আসলেই কি বৃষ্টিতে ভিজলে শিশুদের অসুখ হতে পারে?
বৃষ্টিতে ভিজলেই ঠান্ডা লেগে যাবে—এমন ধারণা সম্পূর্ণ ঠিক না। বরং গবেষকদের মতে, প্রচণ্ড গরমের পর বৃষ্টি বাতাসের জীবাণু পরিষ্কার করে। এই দূষণমুক্ত বাতাসে ফুসফুস সতেজ হয়, সহজ হয় শ্বাসপ্রশ্বাস।
বৃষ্টিতে ভিজে শিশুরা আনন্দ পায়। বৃষ্টির ফোঁটা মানুষ ও প্রাণীর মস্তিষ্কে সেরোটোনিনের নিঃসরণ বাড়িয়ে আনন্দ অনুভূতির সৃষ্টি করতে পারে। সাধারণ অবস্থায় বৃষ্টির পানি সাধারণত কোমল, এতে ক্ষার বা খনিজ থাকে না বলে ত্বক বা চুলের তেমন ক্ষতি করে না।
বৃষ্টির পানিতে সাধারণত জীবাণু থাকে না। তবে শহরের বাতাসে যানবাহনের দূষিত ধোঁয়া মিশে থাকে, বৃষ্টির পানির সঙ্গে সেটা মিশে পানিকে ‘অ্যাসিডিক’ বা অম্লযুক্ত করে, যা ত্বকের ক্ষতি করতে পারে।
আবার দীর্ঘ সময় শরীর বা জামাকাপড় ভেজা থাকলে শিশুদের শরীরের তাপমাত্রা কমে যেতে পারে। আর তাপমাত্রা কমে গেলে শিশুদের শরীরে জীবাণু সংক্রমণের শঙ্কা বেড়ে যায়। ঠান্ডা শরীর রক্ত চলাচল কমিয়ে দিতে পারে এবং এতে রোগ প্রতিরোধকারী উপাদান নির্গত হওয়া কমে যেতে পারে, যার কারণে শিশু অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই বলে শিশুকে তার শৈশবের আনন্দ থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত করাটাও অনুচিত।
শিশুকে বেশিক্ষণ ভেজা অবস্থায় থাকতে দেওয়া উচিত নয়। দ্রুত শিশুর মাথা ও শরীর মুছে দিতে হবে।
ভেজা ত্বকে ছত্রাকের সংক্রমণের আশঙ্কা থাকে, আঙুলের ফাঁকে বা ত্বকের ভাঁজগুলো ভালোমতো মুছে দিতে হবে।
বৃষ্টির পানিতে ভেজার সময় যদি শরীরে কাদামাটি লেগে যায়, তাহলে সাবান দিয়ে শিশুর ত্বক পরিষ্কার করে দ্রুত কুসুম গরম পানি দিয়ে গোসল করিয়ে ফেলা ভালো।
এরপর শিশুকে শুকনা ও পরিষ্কার কাপড় পরিয়ে দিতে হবে, যেন শিশুর শরীর গরম থাকে। একটু পুরু সুতি কাপড়ের ফুলহাতা জামা ও পায়জামা পরিয়ে দেওয়া যেতে পারে।
শিশুকে উষ্ণ রাখতে প্রয়োজনে ঘরের জানালা বন্ধ রাখুন। ভেজার পর শিশুকে উষ্ণ গরম পানীয় বা খাবার দেওয়া দরকার।
অনেকেরই প্রশ্ন, গ্রামের শিশুরা কেন বৃষ্টিতে ভিজলেও সে রকম সমস্যা হয় না? এটা তাদের সহজাত রোগ প্রতিরোধক্ষমতা এবং অভ্যস্ততা। প্রকৃতির মধ্যে বেড়ে ওঠায় তাদের ইমিউনিটি বা রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তুলনামূলকভাবে শহুরে শিশুদের চেয়ে বেশি থাকে।
আজকাল বজ্রপাতে হতাহতের আশঙ্কা বেড়ে গেছে। দেশে এপ্রিল থেকে জুনে বজ্রপাত হয় বেশি। বৃষ্টিতে ভিজতে গিয়ে বজ্রপাতের বিষয়টিও খেয়াল রাখতে হবে।
বজ্রপাতের পূর্বাভাস থাকলে শিশুদের খোলা মাঠে ভিজতে দেওয়া উচিত হবে না। শিশুদের এ সময় জলাশয় থেকেও দূরে রাখতে হবে।
বৃষ্টির সময় ভিজতে ভিজতে শিশুরা যেন কোনো অবস্থাতেই উঁচু গাছ বা খুঁটির নিচে আশ্রয় না নেয়, তা খেয়াল রাখতে হবে।
বজ্রপাতসহ বৃষ্টির সময় শিশু খেলতে খেলতে যদি খোলা মাঠে আটকা পড়ে, তবে পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে, হাঁটুতে মাথা গুঁজে এবং হাত দিয়ে কান ঢেকে নিচু হয়ে বসে পড়তে হবে। এটা তাদের শিখিয়ে দিতে হবে। বজ্রপাতে মাটিতে শুয়ে পড়া বা বসা নিরাপদ নয়।
অনেক শিশু বজ্রপাতের বিকট শব্দ ও তীব্র আলোতে ভয় পায়। তাদের বজ্রপাত সম্পর্কে ধারণা দিতে হবে। ভয় ভাঙাতে সাহায্য করতে হবে।
শিশুকে প্রকৃতির সঙ্গে আনন্দের সুযোগ করে দিতে হবে। অভ্যাস নেই বলে যে বৃষ্টিতে ভিজলে অসুস্থ হয়ে পড়বে, এমন ধারণা ঠিক না। বরং শিশুকে বৃষ্টিতে ভেজার সুযোগ দিন।
তবে সেটা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে নয়, একটা নির্দিষ্ট সময় পরে তাকে উঠিয়ে এনে দ্রুত শরীর মুছে দিতে হবে। তবে যদি চিকিৎসকের নিষেধ থাকে, শিশুটি ঠান্ডায় অতিসংবেদনশীল হয় বা তার শ্বাসকষ্টের ঝুঁকি থাকে, তাহলে শিশুকে বুঝিয়ে বৃষ্টিতে ভেজা থেকে বিরত রাখুন।