বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচাতে বম লোককাহিনি ও রূপকথা সংগ্রহ করে চলেছেন ভাননুনসিয়াম বম। লোকসাহিত্য ছাড়াও নানা বিষয়ে বম ভাষায় তাঁর বইয়ের সংখ্যা ৭। দুই দশকের বেশি সময় ধরে কাজ করে চলা এই লেখকের গল্প শোনাচ্ছেন বুদ্ধজ্যোতি চাকমা
এখন যেখানে বগালেক, একসময় সেখানে ছিল একটি বমপাড়া। সেই পাড়ারই পাঁচ ভাই জুমচাষে গিয়ে একবার একটি সাপ ধরে। সবার ছোট ভাইয়ের ওপর সেই সাপ রান্নার দায়িত্ব পড়ে। তার নাম থোয়াইতে নামতাং। এই নামতাংই ঘটনাচক্রে একদিন হয়ে ওঠে নাগরাজ। আর সেই নাগকে হত্যার দায়ে অভিশপ্ত হয় গোটা গ্রাম। সব বাসিন্দাকে নিয়ে মাটির গভীরে তলিয়ে যায় বমপাড়া, সেখানে সৃষ্টি হয় একটা লেক। বম ভাষায় যার নাম বগারিলি।
বগালেকের সৃষ্টি নিয়ে প্রচলিত এই লোককথাটি ভাননুনসিয়াম বমের ‘বম তুয়ানথু লেহ থিয়ামথু’ নামের বইয়ে সংকলিত হয়েছে। বম ভাষার এই সংকলনের বাংলা অর্থ, বম লোককাহিনি ও রূপকথার বই।
রুমা উপজেলায় আদি বাড়ি হলেও পেশাগত কারণে এখন বান্দরবান শহরের কালাঘাটা এলাকায় থাকেন ভাননুনসিয়াম বম। স্ত্রী জিংনুন পার বম রুমা উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের নার্স। দুই সন্তানের মধ্যে মেয়ে ঢাকায় দশম শ্রেণিতে এবং ছেলে চট্টগ্রামে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে। ফলে বেশির ভাগ সময় নির্জন বাড়িতে একাই থাকেন তিনি। দিনে একটি বেসরকারি সংস্থায় প্রজেক্ট ফোকাল কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করেন। বাড়ি ফিরে বা ছুটির দিনে লেখালেখি করেন, অথবা বেরিয়ে পড়েন লোককাহিনির খোঁজে। প্রবীণদের সঙ্গে গল্প করেন, শোনেন লোককাহিনি ও রূপকথা। সংগ্রহ করেন প্রবাদ-প্রবচন, উদ্ভিদ ও পশুপাখির নাম। বাড়িতে ফিরে সেসব লিপিবদ্ধ করেন যত্ন করে।
২৫ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায়ও বই ও ল্যাপটপ নিয়ে নিবিষ্ট মনে বসেছিলেন। জানতে চাই, কেন এই লেখালেখি? ভাননুনসিয়াম পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘এই “কেন” না থাকলে লেখালেখি হয়? জীবনের প্রতিটি পথচলায় প্রশ্ন থাকতে হয়। সেই প্রশ্ন থেকেই অনুসন্ধিৎসা জন্মায়, আর সেখান থেকেই আসে লেখার তাগিদ।’
রুমার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন প্রত্যন্ত লুয়াংমুয়ালকট পাড়ায় ভাননুনসিয়াম বমের জন্ম। অশান্ত পার্বত্য এলাকার প্রভাব তাদের জীবনেও পড়েছিল। শিশু বয়সে ঘরবাড়ি ফেলে পাড়া ছাড়তে হয়েছিল। জায়গা হয়েছিল বড় পাড়ায় (তখন বলা হতো গ্রুপিং পাড়া)। বড় পাড়া মুয়ালপিপাড়ায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে। সেখানেই পড়াশোনা শুরু। আর্থিক টানাপোড়েনে সেখান থেকে রুমা উপজেলা সদরের ইডেনপাড়ায় চলে যান তাঁর মা-বাবা। এই পাড়ার কাছে তাঁদের একটা বাগান ছিল। সেই বাগান ঘিরেই ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখেন।
পরিবারের আর্থিক অবস্থা ছিল দুর্বল। কয়েক বছরের মধ্যে বারবার স্থানান্তর এবং অনিশ্চয়তায় চরম সংকটে পড়ে পরিবার। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে একমাত্র তিনিই পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পান। রুমা থেকে এসএসসি পাস করার পর ১৯৯৪ সালে বান্দরবান সরকারি কলেজে ভর্তি হন। কিন্তু চরম আর্থিক সংকটের কারণে মাঝপথে পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। ভাননুনসিয়াম বলেন, ‘আমাদের পরিবারের আয় খুবই সীমিত ছিল। বাগানের কাজের পাশাপাশি আমরা নিজেরাও বিভিন্ন শ্রমের কাজে যুক্ত হতাম। বালু তোলা বা অন্যান্য কাজ করতাম।’
কয়েক বছর বিরতি দিয়ে চট্টগ্রামের উত্তর সাতকানিয়া জাফর আহমদ চৌধুরী কলেজে ভর্তি হন। সেখানে থেকে ১৯৯৯ সালে এইচএসসি এবং ২০০১ সালে স্নাতক করেন।
১৯৯৯ সালে গণিত ও ইংরেজিতে দক্ষতার কারণে রেমাক্রি জুনিয়র হাইস্কুলে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন ভাননুনসিয়াম। শিক্ষকতার পাশাপাশি নিজের পড়াশোনাও চালিয়ে যান। পরে রুমা জুনিয়র হাইস্কুলে প্রায় সাড়ে তিন বছর শিক্ষকতা করেন। শিক্ষকতা করতে গিয়ে দেখেন, বম শিক্ষার্থীরা বাংলায় ব্যাকরণ বুঝতে হিমশিম খায়। তখন তাঁর মনে হয়, মাতৃভাষায় ব্যাখ্যা করা গেলে বিষয়টি সহজ হবে। এই ভাবনা থেকেই প্রথম বই লেখার উদ্যোগ। ২০০৪ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম বই মেথড অব ইজিলি টু লার্ন টেনস ইনটু বম। বইটিতে ইংরেজি ও বাংলার টেনসকে সহজভাবে বম ভাষায় ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এটি বম শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যাকরণ শেখার একটি কার্যকর সহায়ক বই হয়ে ওঠে।
বেসরকারি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ায় ২০০৬ সালে একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় যোগ দেন ভাননুনসিয়াম। মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে প্রত্যন্ত পাড়াগুলোয় ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ পান। সেখানে শোনেন অনেক লোককাহিনি ও রূপকথা। তিনি বলেন, ‘এনজিওতে কাজ করার ফলে সংস্কৃতির শিকড় ধরে রাখা মানুষদের সঙ্গে মেলামেশা করার সুযোগ হয়েছে। কাজের ফাঁকে লোককথা ও প্রবাদ সংগ্রহ করেছি। তবে তখন নিয়মিত লেখার সময় ছিল না।’
কাজের ফাঁকে পড়াশোনা চালিয়ে ২০১২ সালে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। এরপর আবার লেখালেখিতে মন দেন। ভ্রমণের সময় লক্ষ করেন, অনেকেই বম ভাষায় ব্যাকরণের সুসংহত রূপ জানেন না। সেই অভিজ্ঞতা থেকে বেসিক বম গ্রামার বা হাউল-লে-রিং ডান সিন্নাক বইটি লেখেন। ২০১৮ সালে বইটি প্রকাশিত হয়।
এরপর ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর আরও কয়েকটি বই। এর মধ্যে রয়েছে বম প্রবাদ ও ধাঁধার সংকলন বম উপা থুপিং, সমাজ–সংস্কৃতিভিত্তিক বম পিপু নুনফুং, গীতিনাট্য বম খভেল লা এবং লোককাহিনি ও রূপকথার সংকলন বম তুয়ানথু লেহ থিয়ামথু।
ভাননুনসিয়াম তাঁর লোককাহিনির সংকলনটি বাংলায় অনুবাদ করেছেন। পাণ্ডুলিপি জমা দিয়েছেন বাংলা একাডেমিতে। আশা করছেন, এটি প্রকাশিত হলে বৃহত্তর পাঠকসমাজ বম জনগোষ্ঠীর লোক–ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পারবে। তিনি বলেন, ‘আমাদের অনেক গল্প হারিয়ে যাচ্ছে। আমি চাই, এগুলো লিখে রেখে যেতে, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানতে পারে কোথায় আমাদের শিকড়।’
নির্জন ঘরে বসে তিনি লিখে চলেছেন তাঁর মানুষের গল্প। তাঁর কলমে বেঁচে থাকছে একটি ভাষা, একটি সংস্কৃতি এবং একটি জাতিসত্তার স্মৃতি।