
একসময় গ্রামীণ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল কাঠের লাঙল আর ধান-চাল ভানা ও মসলা গুঁড়া করার গাইল। এখন যন্ত্রচালিত লাঙলের দিন। যন্ত্রেই হয় ধান ভানা, চাল কোটা, মসলা গুঁড়া করা। তারপরও এই দুটি কৃষি অনুষঙ্গ বানিয়ে চলেছেন ইউসুফ মিয়া।
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের কুশবাস গ্রামের মানুষ ইউসুফ। শনি ও মঙ্গলবার শ্রীমঙ্গল শহরের গদারবাজারে একটি কোণে বসেন। সামনে সাজানো থাকে কয়েকটি কাঠের লাঙল আর গাইল। কখনো কখনো সেখানে বসেই গাইল তৈরি করেন।
কৃষিকাজ দিয়ে পেশাজীবন শুরু করলেও কয়েক যুগ ধরে এই কাজই করেন ইউসুফ। মামা আবদুল খালেকের দেখাদেখি কাঠের লাঙল ও গাইল বানানো শিখেছিলেন। আরও অনেকেই এ কাজ করতেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সঙ্গীরা একে একে অন্য পেশায় চলে গেলেও ইউসুফ মিয়া থেকে গেছেন।
১৩ জানুয়ারি তাঁর সঙ্গে আলাপ। ইউসুফ জানালেন, গদারবাজারে তিনিই নিয়মিত নিজের বানানো পণ্য নিয়ে আসেন। মাঝেমধ্যে সিন্দুরখানের একজনকে দেখা যায়। সেদিন অবশ্য তাঁকে দেখা গেল না। অথচ একসময় সপ্তাহের সাত দিনই এখানে এসব কৃষিপণ্যের হাট বসত। দুই সারিতে ৩০ থেকে ৩৫ জন বিক্রেতা বসতেন।
বিকেলের মধ্যেই সব বিক্রি হয়ে যেত। সিলেট থেকে পাইকাররা এসে লাঙল ও গাইল কিনে নিয়ে যেতেন। একেকজন বিক্রেতা দিনে ৩০–৪০টি পণ্য বিক্রি করতেন। বিক্রি হতো তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকার পণ্য। তখন একটি গাইলের দাম ছিল ৮০ থেকে ১০০ টাকা আর লাঙলের দাম ২০০ থেকে ২৫০ টাকা। এ সবই ২০ বছর আগের চিত্র।
এখন দৃশ্যপট বদলে গেছে। গত দেড় দশকে কাঠের লাঙল-গাইলের চাহিদা কমে গেছে। হাল চাষের জায়গা দখল করেছে গাড়ি, চাল গুঁড়া করার কাজে এসেছে আধুনিক মেশিন। নয়া প্রযুক্তির কারণে হারিয়ে যাচ্ছে পুরোনো উপকরণ।
ইউসুফ মিয়া সপ্তাহের দুই দিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত থেকে কোনো কোনো দিন চার-পাঁচটি বিক্রি করেন, আবার কোনো দিন একটি পণ্যও বিক্রি করতে পারেন না। একটি গাইল এখন বিক্রি হয় ৫০০ থেকে ৭০০ টাকায়, আর লাঙল ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা। তারপরও ইউসুফের আয় বাড়েনি। আগে এসব বানানোর জন্য কাঁচামাল হিসেবে যে কাঠের টুকরা ২০ টাকায় মিলত, সেটি কিনতেই এখন লাগছে ৩০০ টাকা।
ইউসুফ মিয়ার দুই মেয়ে, ছোটজন প্রতিবন্ধী আর বড় মেয়ে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। ছেলের মৃত্যুর পর স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে টানাপোড়েনে চলছে তাঁর সংসার। তবু ইউসুফ মিয়া কাজটি ছেড়ে দেননি।
গদারবাজারেও এখন আর হাট নেই। তবু ইউসুফ মিয়া বসেন। একসময়ের গ্রামীণ কৃষিজীবনের শেষ চিহ্নগুলোর পাশে বসে তিনি যেন পাহারা দেন।