নতুন বাসায় উঠছেন নাকি পুরোনো ঘরটাকেই একটু নতুন করে সাজাতে চান? ঘর সাজানো মানেই শুধু রং, আসবাব বা পর্দা কেনা নয়, এটা একধরনের মানসিক প্রক্রিয়াও। রংটা বেশি গাঢ় হয়ে গেল কি না, ঘরটা বেশি ঠাসাঠাসি লাগছে কি না, ঢুকলেই মন ভালো লাগে কি না—এমন অনেক প্রশ্ন মাথায় ঘোরে। ইন্টেরিয়র ডিজাইনারদের মতে, একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও সুন্দরভাবে সাজানো ঘর শুধু দেখতে ভালো লাগে না, মানসিকভাবেও প্রশান্তি দেয়। ঠিক যেমন পরিপাটি ঘর মনকে শান্ত করে, তেমনি ভালো নকশার ঘর আমাদের দৈনন্দিন জীবনকেও স্বস্তিদায়ক করে তোলে। তাই ইন্টেরিয়র ডিজাইনাররা নিজেদের ঘর সাজাতে গিয়ে কিছু ভুল একেবারেই এড়িয়ে চলেন। চলুন জেনে নিই, ভুলগুলো কী এবং কেন সেসব এড়িয়ে চলাই ভালো।

আমরা অনেকেই ঘরে সাজাতে প্রথমেই দেয়ালের রং ঠিক করে নিই। কিন্তু ডিজাইনাররা বলছেন, এটি হওয়া উচিত শেষ ধাপ। কারণ, বাজারে রঙের অপশন হাজার হাজার। আগে যদি আসবাব, পর্দা, কার্পেট, কুশন, বিছানার চাদর—এসব পছন্দ করে নেন, তাহলে রং বাছাই অনেক সহজ হয়।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের ঘর সাধারণত ছোট হয়, আলো–বাতাসের স্বাভাবিক প্রবাহও অনেক সময় কম থাকে। তাই ঘরের ব্যবহার, জানালার অবস্থান ও দিনের কোন সময়ে ঘরটি বেশি ব্যবহার হবে—এসব বিবেচনায় রেখে রং নির্বাচন করা ভালো। যেমন রান্নাঘর বা পড়ার ঘরের জন্য হালকা, উজ্জ্বল রং; শোবার ঘরের জন্য নরম, উষ্ণ ও শান্ত রং।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রেন্ডি ডেকোর দেখে অনেকেই হুবহু সেটাই করতে চান। কিন্তু ট্রেন্ড ক্ষণস্থায়ী; আজ যা জনপ্রিয়, কাল তা সেকেলে হয়ে যেতে পারে।
ডিজাইনাররা বলেন, বড় আসবাব; যেমন সোফা, ডাইনিং টেবিল, আলমারির ক্ষেত্রে সময়ের পরীক্ষায় টিকে থাকে, এমন ক্ল্যাসিক ডিজাইন বেছে নেওয়াই ভালো।
ট্রেন্ড যোগ করতে পারেন ছোট জিনিসে—কুশন কভার, পর্দা, ফুলদানি, টেবিল ল্যাম্প বা দেয়ালের সাজে। এতে খরচ কম, বদলাতেও সহজ।
আমাদের দেশে আত্মীয়স্বজনের দেওয়া উপহার, নিজের পছন্দের শোপিস, পুরোনো আসবাব—সব মিলিয়ে ঘর অনেক সময় ঠাসাঠাসি হয়ে যায়। অতিরিক্ত আসবাব ও সাজসজ্জা ঘরকে ছোট ও বিশৃঙ্খল দেখায়, চলাচলেও বাধা তৈরি করে। এতে মানসিক চাপও বাড়তে পারে।
ঘরে ঢুকেই যদি ভারী লাগে বা হাঁটাচলায় অস্বস্তি হয়, তাহলে বুঝবেন জিনিস বেশি হয়ে গেছে। রং ও নকশার ক্ষেত্রেও একই কথা। খুব বেশি গাঢ় রং বা নানা ধরনের নকশা একসঙ্গে ব্যবহার করলে চোখ ও মন দুটিই ক্লান্ত হয়।
শুধু দেখতে সুন্দর, এই ভাবনায় অনেক সময় আমরা আসবাব কিনে ফেলি। পরে বোঝা যায়, ব্যবহার করতে গিয়ে অস্বস্তি।
ডিজাইনাররা বলেন, প্রতিটি জিনিস কেনার সময় ভাবতে হবে—
আরামদায়ক কি না
পরিষ্কার করা সহজ কি না
পরিবারের সবার জন্য উপযোগী কি না
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। ধুলাবালু, আর্দ্রতা ও গরমের কারণে এমন উপকরণ বেছে নেওয়া ভালো, যেসব টেকসই ও সহজে পরিষ্কার করা যায়।
ঘর সাজাতে গিয়ে আমরা আলোর উৎসের ব্যাপারে অতটা মনোযোগ দিই না। অথচ আলোই পারে ঘরের পুরো পরিবেশ বদলে দিতে। একটি সুন্দর ল্যাম্প, ঝুলন্ত বাতি বা নরম আলো ঘরকে করে তুলতে পারে উষ্ণ ও সুন্দর।
বিদ্যুতের খরচ কমাতে প্রাকৃতিক আলো ব্যবহারের দিকে জোর দেওয়া জরুরি। জানালার সামনে ভারী পর্দা না দিয়ে হালকা কাপড় ব্যবহার করলে দিনের আলো ঘরে ঢোকে ভালোভাবে।
অনেকেই ভাবেন, ঘরটা দেখতে কেমন হওয়া উচিত। ফলে বন্ধুদের ঘর, ইউটিউব বা পিন্টারেস্ট দেখে হুবহু নকল করতে চান। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলেন, ঘর সাজানোর কোনো একমাত্র নিয়ম নেই। ঘর হওয়া উচিত এমন, যেখানে আপনি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।
ঘর মানে তো শুধু দেখানোর জায়গা নয়; এটা বিশ্রাম, ভালো লাগা ও নিজের মতো থাকার জায়গা। তাই নিজের রুচি, অভ্যাস ও প্রয়োজন অনুযায়ী সাজান।
আগে ব্যবহার ঠিক করুন, তারপর সাজ।
কম জিনিসে বেশি কাজ।
আলো–বাতাসের দিকে নজর।
ট্রেন্ড নয়, স্বাচ্ছন্দ্যকে অগ্রাধিকার।
সূত্র: হাফিংটন পোস্ট