ছবিতে দেখুন লুই ভুইতোঁ পরিবারের ১৬৭ বছরের পুরোনো বাড়িটি

ফ্রান্সের প্যারিসের কাছেই আনিয়ের-সুর-সেনে ঐতিহাসিক লুই ভুইতোঁর বাড়িটি এখনো এক বিস্ময়। বিশ্বের অন্যতম আইকনিক বিলাসবহুল ফ্যাশন হাউসটি গড়ে ওঠার পেছনে এ জায়গার রয়েছে বিশেষ অবদান। ব্র্যান্ডটি যাত্রা শুরু করার পাঁচ বছরের মধ্যেই আনিয়েরে বাড়ি ও কারখানা স্থাপন করেন ফরাসি নকশাবিদ ও উদ্যোক্তা লুই ভুইতোঁ। ১৬৭ বছরের পুরোনো এ বাড়ি এখনো টিকে আছে পরিবারটির ঐতিহ্য হিসেবে। চলুন, ছবিতে ছবিতে ঘুরে দেখা যাক লুই ভুইতোঁ পরিবারের বাড়িটি।

১৮৫৯ সালে লুই ভুইতোঁ আনিয়েরে প্রায় ৪৫ হাজার বর্গফুট জমি কিনে সে সময়ের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে একটি কারখানা নির্মাণ করেন। ধাতব খুঁটি ও বিম দিয়ে তৈরি সেই ভবন ছিল সে সময় অত্যাধুনিক। এখানে তৈরি অসাধারণ কারুশিল্পের ট্রাঙ্ক ও ব্যাগ লুই ভুইতোঁকে বিশ্বজুড়ে খ্যাতি এনে দেয়
ছবি: ইনস্টাগ্রাম থেকে
১৬৭ বছর পর আজও আনিয়েরের এ বাড়ি সরগরম। যদিও বর্তমান প্রজন্মের কেউ এখানে সব সময় বসবাস করেন না; তবে সপ্তাহান্তে তাঁরা এখানে আসেন, থাকেন, সময় কাটান কারখানায়ও
শুরুতে বাড়িটির নিচতলায় কারখানা আর ওপরে লুই ভুইতোঁ পরিবারের থাকার ব্যবস্থা ছিল। ১৮৬৯ সালে ভুইতোঁ পরিবারের থাকার জন্য পাশে এই বাড়ি তৈরি করা হয়
এখনো বাড়িটির পাশে সেই কারখানা সচল। সেখানে এখন বিশেষ বেসপোক ট্রাঙ্কগুলো তৈরি হয় শতভাগ হাতে। বাড়িটির একটি অংশে তৈরি করা হয়েছে গ্যালারি, যেখানে লুই ভুইতোঁর শুরুর দিকের ১৮৭৪ সালের পণ্য যেমন আছে, আছে অতি দুর্লভ ট্রাঙ্কের ছবিও। ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত আনিয়েরের কারখানাই ছিল লুই ভুইতোঁর একমাত্র উৎপাদনকেন্দ্র
লুই ভুইতোঁর জন্য আনিয়েরের এই ঐতিহাসিক স্থানের গুরুত্ব কতটা, তা বোঝানো কঠিন। প্যারিসের প্রধান কার্যালয়ে যোগ দেওয়া প্রত্যেক নতুন কর্মীকে এখনো ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে এখানে নিয়ে আসা হয়। এ ছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা গুরুত্বপূর্ণ অতিথি ও ভিআইপি গ্রাহকদেরও নিয়মিত এ বাড়ি ঘুরিয়ে দেখানো হয়
বিলাসিতার চেয়ে আরাম ও পারিবারিক উষ্ণতাকেই গুরুত্ব দিতেন লুই ভুইতোঁ। তাই বাড়ির ভেতরটা এমনভাবে সাজিয়েছিলেন, যাতে আপন মনে হয়
তবে ১৮৯২ সালে আনিয়েরের মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে জর্জ ভুইতোঁ ও জর্জের স্ত্রী জোসেফিন বাড়িটিকে আরও জাঁকজমকপূর্ণ করে তোলেন। সেখানে যুক্ত করা হয় আর্ট নুভো (১৮৯০ থেকে ১৯১০ সালের মধ্যে ইউরোপ ও আমেরিকায় বিকশিত একটি আন্তর্জাতিক শিল্প ও স্থাপত্যরীতি) ধারার সাজসজ্জা। জোসেফিনই ছিলেন ভুইতোঁ পরিবারের শেষ সদস্য, যিনি পুরো সময় এ বাড়িতে বসবাস করেছেন। প্রতিদিন সকালে জোসেফিন খুব ভোরে উঠে বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে কারখানার প্রত্যেক কর্মীকে শুভেচ্ছা জানাতেন
১৯৬৪ সালে ১০৩ বছর বয়সে জোসেফিনের মৃত্যুর পর বাড়ির আসবাব উত্তরাধিকারীদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়। এরপর কিছু সময়ের জন্য বাড়িটি ব্যবহৃত হয় গুদাম ও অফিস হিসেবে
জোসেফিনের শততম জন্মদিন উদ্‌যাপনের স্মৃতির কথা বলছিলেন লুই ভুইতোঁর প্রপৌত্র প্যাট্রিক লুই ভুইতোঁ। তিনি বলেন, ‘সেদিন প্রায় ৩০০ অতিথি এসেছিলেন। সবাইকে একসঙ্গে জায়গা দেওয়া সম্ভব ছিল না, তাই উৎসব চলে দিনজুড়ে।’ এ সময় বাড়ির সাজসজ্জাও ছিল চোখে পড়ার মতো। সবুজ লনেও টেবিল পেতে বসার ব্যবস্থা করা হয়
পরে আশির দশকের মাঝামাঝি বাড়িটি সংস্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং ধীরে ধীরে সেটি আবার পুরোনো চেহারা ফিরে পায়
বাড়িটির নিচতলা থেকে সরিয়ে পাশের ভবনে নেওয়া হয় প্রদর্শনীর কক্ষ। সেখানে আছে ১৮৬৫ সালের একটি গম্বুজ আকৃতির ট্রাঙ্ক থেকে শুরু করে বর্তমান সময়ে তৈরি নানা রকম ব্যাগ, ট্রাঙ্ক ও নিদর্শন
বসবাসের বাড়িটির দেয়ালে আছে ফুলের নকশার অলংকরণ ও কারুকাজ। বসার ঘরের কেন্দ্রে আছে সেলাডন-সবুজ রঙের একটি ফায়ারপ্লেস; তবে সেটা শুরুতে ছিল না। আসল ফায়ারপ্লেসটি সংস্কারের সময় বিশেষভাবে সিল করা বাক্সে সংরক্ষণ করা হলেও পরে রহস্যজনকভাবে হারিয়ে যায়
১৮৯০-এর দশকে তৈরি রঙিন কাচের (স্টেইনড গ্লাস) জানালাগুলো এখনো অক্ষত, যেখানে আইরিস, পপি, ক্রিস্যানথেমাম, ক্লেমাটিসসহ বিভিন্ন ফুল ও লতার নকশা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। জর্জ ভুইতোঁর সময় এসব জানালায় কিছু ছোট স্বচ্ছ অংশও ছিল। সেখান দিয়ে নাকি তিনি পাশের কারখানায় কী কাজ চলছে, তা গোপনে নজর রাখতেন। অনেকটা আধুনিক সিসি ক্যামেরার মতো
আনিয়েরের এই বাড়িকে লোকে চেনে মেজঁ লুই ভুইতোঁ নামে। লুই ভুইতোঁ পরিবারের ষষ্ঠ প্রজন্মের সদস্য এবং ব্র্যান্ডটির বর্তমান হেড অব সাভোয়া-ফেয়ার (কারুশিল্প ও ঐতিহ্যের সুরক্ষা) পিয়ের লুই ভুইতোঁ এ বাড়িতে ছোটবেলায় বেশ কিছু বছর কাটিয়েছেন। তাঁর সেই শৈশবের স্মৃতিও বিভিন্ন আলোচনায় তুলে ধরেছেন পিয়ের। বাড়ি আর কারখানা যেখানে মিলেমিশে একাকার হয়ে যেত, তেমন পরিবেশেই প্রথম ১০ বছর কেটেছে পিয়েরের। ছবিটি কারখানার ভেতরে তোলা

সূত্র: ডিজাইন ডিসট্রিক্ট, ভোগ ফিলিপাইন ও সিএনএ লাক্সারি