নর্দান ইউনিভার্সিটিতে যখন পড়তেন, চার বন্ধু সব সময় থাকতেন একসঙ্গে
নর্দান ইউনিভার্সিটিতে যখন পড়তেন, চার বন্ধু সব সময় থাকতেন একসঙ্গে

চার বন্ধু এখন চার দেশের কোম্পানিতে কাজ করেন

একজন আছেন কানাডায়, আরেকজন যুক্তরাষ্ট্রে। একজন যুক্তরাজ্যের সময় মেনে ‘অফিস’ করেন, অন্যজনের কাজ চলে জার্মানিতে। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে চারটা মাথা সব সময় এক হয়ে থাকত। কত কী পরিকল্পনা ছিল! চারজন মিলে স্টার্টআপ দাঁড় করাবেন, ধুন্ধুমার ব্যবসা গড়ে তুলবেন। শেষমেশ সবার পথ আলাদা হয়ে গেলেও চার বন্ধুই একটা কথা মানেন—আজ তাঁরা যেখানে আছেন, সেখানে পৌঁছানোর শক্তি জুগিয়েছে ক্যাম্পাসজীবনের সেই বন্ধুত্ব, প্রোগ্রামিংয়ে বুঁদ হয়ে থাকা সেই এলোমেলো দুপুর-বিকেল-রাতগুলো।

ও হ্যাঁ, চারজনের সঙ্গে পরিচয়পর্বটা সেরে নিই। আমিনুল ইসলাম ও তানভীর আহমেদ—দেশে বসেই দুজন বিদেশি কোম্পানিতে কাজ করেন। আমিনুল আছেন জার্মানির প্রতিষ্ঠান কোয়ান্টেনওয়ার্ফটে, সফটওয়্যার প্রকৌশলী হিসেবে। পাশাপাশি নিজের একটি স্টার্টআপ দাঁড় করাচ্ছেন। অন্যদিকে তানভীরের কোম্পানির নাম জাস্টগো। যুক্তরাজ্যের এই প্রতিষ্ঠানের প্রকল্প ব্যবস্থাপক তিনি। জাবির আহমেদ কানাডায় থাকেন। ‘ট্রিউ নলেজ’ নামের একটি কোম্পানিতে তাঁর পদবি ‘টেক লিড’। আরমান কামাল বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বাসিন্দা। সেখানকার সিটি ব্যাংকে সফটওয়্যার প্রকৌশলী (এভিপি) হিসেবে যোগ দিয়েছেন তিনি। 

ঢাকার নর্দান ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশে (এনইউবি) যখন পড়তেন, তখন থেকেই সফটওয়্যার, প্রোগ্রামিং আর প্রযুক্তির প্রতি চারজনেরই আগ্রহ ছিল। তাই বন্ধুত্ব জমে উঠেছিল দ্রুত। ‘দল’ হিসেবে তাঁরা নানা প্রকল্প ও প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছেন, সাফল্যও পেয়েছেন। তানভীর বলেন, ‘আমাদের চারজনের দক্ষতা ছিল চার রকমের, যা একটি পারফেক্ট টিমের জন্য দরকার। আমি ছিলাম পুরোদস্তুর “প্রোডাক্ট পারসন”। অনিক (জাবির আহমেদ) অসম্ভব সৃজনশীল, পিয়াস (আরমান কামাল) খুব যুক্তিবাদী আর আলভী (আমিনুল ইসলাম) ছিল সেলস বা কমিউনিকেশনে এক্সপার্ট। এই ভিন্ন ভিন্ন দক্ষতা আর একই আগ্রহের কারণে আমাদের বন্ধুত্বটা জোরালো হয়েছে।’ 

আরমান কামাল বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বাসিন্দা

ক্যাম্পাসে মাইএনইউবি নামে একটা অ্যাপ বানিয়ে রীতিমতো সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন তাঁরা। এই অ্যাপের মাধ্যমে ক্লাস রুটিন, লেকচার, নানা কিছু শেয়ার করা যেত। অ্যাপের সুবাদে ক্যাম্পাসে আয়োজিত হ্যাকাথনে পুরস্কারও পেয়েছিলেন। এর বাইরে প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতা থেকে শুরু করে নানা আয়োজনে চারজন একসঙ্গে মাথা খাটাতেন। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন কোম্পানির হয়ে কাজের শুরুও তখন থেকেই। আরমান বলেন, ‘তখন আমরা ক্যালকাটা ড্রাই ক্লিনার্স, ‘অক্সিনাউ’-এর মতো কোম্পানির জন্য ফ্রিল্যান্স প্রজেক্ট করেছিলাম। পড়াশোনার পাশাপাশি বাস্তবিক প্রকল্প নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা আমাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিয়েছিল।’ 

তানভীর দেশেই আছেন, যুক্তরাজ‍্যের একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন

এই আত্মবিশ্বাসকে পুঁজি করেই একটি স্টার্টআপ প্রায় দাঁড় করিয়ে ফেলেছিলেন। তারপর? তানভীর বলেন, ‘১ লাখ ডলারের প্রি-সিড ফান্ডিং পাওয়ার কথাবার্তাও প্রায় পাকা ছিল! কিন্তু তখনই করোনা মহামারি শুরু হলো। পুরো পরিকল্পনাটা ভেস্তে গেল।’ জাবির যোগ করেন, ‘করোনার কারণে যখন ফান্ডিং আটকে গেল, তখন আমরা বাস্তবতাটা বুঝলাম। সিদ্ধান্ত নিলাম, ব্যবসা করার আগে কিছুদিন চাকরি করে অভিজ্ঞতা নেওয়া দরকার। তাই চারজনই চাকরিতে ঢুকে পড়ি।’ 

এনইউবি কম্পিউটার ক্লাবের সদস্য ছিলেন তাঁরা। শেষ বর্ষে প্রায় ১৩৬ জন ছাত্র-শিক্ষক মিলে সেন্ট মার্টিনে ঘুরতে গিয়েছিলেন। সেই স্মৃতি এখনো উজ্জ্বল হয়ে আছে। এ ছাড়া শিক্ষকদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন চার অ্যালামনাই। আরমান বলেন, ‘আমাদের বিভাগীয় প্রধান রায়হান স্যারের উৎসাহ, দোহা স্যারের অক্লান্ত চেষ্টা, এগুলো আমাদের এগিয়ে যেতে খুব সাহায্য করেছে। বিশেষ করে শাবাব স্যার সব সময় বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের যে স্বপ্ন দেখাতেন, সেটি আত্মবিশ্বাস অনেক বাড়িয়ে দিয়েছিল। পাশাপাশি কম্পিউটার ক্লাবের কারণে ছাত্রাবস্থাতেই আমাদের মধ্যে নেতৃত্বের দক্ষতা তৈরি হয়েছে।’

জাবির আহমেদ কানাডায় থাকেন। ‘ট্রিউ নলেজ’ নামের একটি কোম্পানিতেতাঁর পদবি ‘টেক লিড’।

জানতে চাইলাম, আবার বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে ফিরে যেতে পারলে এমন কী করতেন, যা আগে করা হয়নি, যা নিয়ে আফসোস আছে। জাবির বললেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা বিভিন্ন প্রকল্প নিয়েই বেশি ব্যস্ত ছিলাম। যদি আবার ফিরে যেতে পারতাম, তাহলে হয়তো কম্পিটেটিভ প্রোগ্রামিং বা প্রবলেম সলভিংয়ে আরও একটু সময় দিতাম। বড় বড় বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করার জন্য ভিতটা শক্ত করা খুব জরুরি।’ আমিনুলের উত্তর অবশ্য একটু আলাদা। তিনি বলেন, ‘কাজের চাপে অনেক সময় আমরা নিছক আড্ডা বা ঘোরাঘুরি মিস করেছি। ফিরে গেলে পড়াশোনার পাশাপাশি বন্ধুদের সঙ্গে স্মৃতি জমানোর দিকে আরেকটু বেশি নজর দিতাম। কারণ, ভার্সিটি লাইফের ওই সোনালি সময়টা আসলে আর কোনো দিন ফিরে পাওয়া যাবে না।’ 

এখনো সুযোগ পেলে ক্লাবের সদস্যদের পরামর্শ দেন, সহায়তা করেন চার অ্যালামনাই। ছোটদের কী পরামর্শ দেবেন? জানতে চাইলে জাবির বললেন, ‘হুট করে ব্যবসায় না নেমে আগে কিছুদিন চাকরি করে অভিজ্ঞতা নেওয়া ভালো। ইন্ডাস্ট্রি কীভাবে কাজ করে সেটি বুঝলে তারপর নিজের কিছু করা সহজ হয়। আগে শিখুন, তারপর নিজেরটা গড়ুন।’ 

দেশে বসেই জার্মানির একটি কোম্পানিতে চাকরি করেন আমিনুল ইসলাম

আরমান জোর দিলেন দক্ষতা অর্জনের প্রতি। তাঁর বক্তব্য, ‘ভালো সিজিপিএ অবশ্যই দরকার। তবে দিন শেষে দক্ষতাই আসল। আমরা যখন স্টার্টআপের চেষ্টা করেছি বা এখন বড় চাকরি করছি, সব জায়গাতেই বিভিন্ন প্রজেক্টের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা আমাদের এগিয়ে রেখেছে।’ 

ব্যস্ততা বেড়েছে, প্রত্যেকেই পেশাজীবনে সফলভাবে কাজ করছেন, তবু বন্ধুত্বটা আছে আগের মতোই। জানালেন, এখনো তাঁরা একসঙ্গে অনলাইনে গেম খেলেন, ডিসকর্ডে গল্প করেন। চারজন এক হয়ে একটা স্টার্টআপ দাঁড় করাবেন, ঘুরেফিরে সেই আলাপ ওঠে এখনো।