
টাইম ও ফোর্বস সাময়িকীর করা বিশ্বের ১০০ প্রভাবশালী মানুষের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন সারা ব্লেকলি। ১ মে নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ফ্লোরিডা স্টেট ইউনিভার্সিটিতে সমাবর্তন বক্তা হিসেবে হাজির হয়েছিলেন এই মার্কিন ব্যবসায়ী। পড়ুন নির্বাচিত অংশের অনুবাদ।
গত ১৫ বছরে অনেকবারই সমাবর্তন বক্তৃতা দেওয়ার আমন্ত্রণ পেয়েছি। কিন্তু ভেবেই রেখেছিলাম, কখনো যদি রাজি হই, সেটা হবে আমার নিজের বিশ্ববিদ্যালয় ফ্লোরিডা স্টেট ইউনিভার্সিটি। ৩৩ বছর আগে ১৯৯৩ সালে যখন তোমাদের জায়গায় বসে ছিলাম, তখন আমার কেমন লাগছিল, সেটা এখনো স্পষ্ট মনে আছে।
সব এখন কত বদলে গেছে! তখন স্মার্টফোন ছিল না, সোশ্যাল মিডিয়া ছিল না। আমি যখন এখানে পড়তাম, তখন কিছু ‘ভাইরাল’ হলে সবাই ‘অ্যান্টিবায়োটিক’ খুঁজত। আজকের পৃথিবী একদম আলাদা। তবে তোমাদের সঙ্গে আমাদের কিছু মিল আছে। আমাদের স্বপ্নের শুরুও এখানেই হয়েছিল। এখান থেকেই আমাকেও বাস্তবের দুনিয়ায় ঠেলে দেওয়া হয়েছিল।
বাবা আইনজীবী ছিলেন। ছোটবেলা থেকে আমিও আইনজীবী হওয়ার স্বপ্ন দেখতাম। সমস্যা ছিল একটাই। এলস্যাট (ল স্কুল অ্যাডমিশন টেস্ট) পরীক্ষায় একবার না, দুবার ফেল করেছিলাম।
একবার একটা চাকরি মেলায় গেলাম। সেদিনই জীবনে প্রথমবারের মতো স্যুট পরেছিলাম। ২০টি কোম্পানিতে ইন্টারভিউ দেওয়ার পর গুনে গুনে ২০টি থেকেই প্রত্যাখ্যানপত্র এল। যদিও পরে সেটা আমার জন্য ভালোই হয়েছে। কারণ, তখন বুলউইঙ্কলসের একটা অফার চলছিল। কেউ প্রত্যাখ্যানপত্র নিয়ে গেলেই ওরা তাকে বিনা মূল্যে পানীয় দিচ্ছিল। এ সুযোগ আমি বেশ খানিকটা পান করে নিয়েছি।
একটা ইন্টারভিউয়ের কথা বিশেষভাবে মনে আছে। ওরা বারবার জিজ্ঞেস করছিল, ‘তোমার কী অভিজ্ঞতা আছে?’ বলেছিলাম, ‘আমি তো শিক্ষার্থী। কোনো অভিজ্ঞতা নেই। অভিজ্ঞতা পাওয়ার জন্যই তো চাকরি খুঁজছি।’ যদি কেউ সুযোগই না দেয়, তো অভিজ্ঞতা পাব কী করে!
কোথাও কাজ না পেয়ে ডিজনি ওয়ার্ল্ডে গিয়ে গুফি চরিত্রের জন্য অডিশন দিয়েছিলাম। সমস্যা হলো, গুফি হতে হলে অন্তত ৫ ফুট ৮ ইঞ্চি উচ্চতা দরকার। আমার ছিল ৫ ফুট ৬। কদিন পর দেখা গেল, কলেজের ডিগ্রি পকেটে ভরে আমি ডিজনিতে বাদামি পলিয়েস্টারের পোশাক পরে মানুষকে রাইডে উঠতে সাহায্য করছি। বন্ধুরা কেউ দেখে ফেললে বলত, ‘আরে, ব্লেকলি না?’ নাম লেখা ট্যাগটা এক হাতে ঢেকে বলতাম, ‘না। জলদি…রাইডে উঠে পড়ো।’
তিন মাস পরে ডিজনির চাকরিটা ছেড়ে দিই। এরপর টানা সাত বছর বাড়ি বাড়ি গিয়ে ফ্যাক্স মেশিন বিক্রির কাজ করেছি। ভয়ংকর কঠিন এক সময় ছিল। সাত বছরে একের পর এক বাড়ির দরজা আমার মুখের ওপর বন্ধ হয়েছে, আর বারবার একটা কথাই শুনেছি—‘না’। তখন বন্ধুরা সব আইনজীবী হচ্ছে, ডাক্তার হচ্ছে, করপোরেট চাকরিতে পদোন্নতি পাচ্ছে। আর আমি হোন্ডা গাড়ি চালিয়ে ঘুরে ঘুরে ফ্যাক্স মেশিন বিক্রি করছি।
তারপর একদিন…ভীষণ ক্লান্তিকর একটা দিনের শেষে রাস্তার পাশে গাড়ি থামালাম। চিৎকার করে বললাম, ‘আমি একটা ভুল সিনেমায় ঢুকে পড়েছি। পরিচালককে ডাকো, প্রযোজককে ডাকো! কাট! এই জীবন আমার না!’
বছর দুই পর স্প্যানক্স নামে একটা কোম্পানি শুরু করি। সময়ের সঙ্গে সেই কোম্পানিতে এক হাজারের বেশি মানুষের চাকরি হয়েছে। এক বিলিয়নের বেশি মুনাফা এসেছে। এমন শত শত পণ্য তৈরি হয়েছে, যা নারীদের জীবন বদলে দেয়। ২০২১ সালে কোম্পানিটা বিক্রি করে দিই। আমিই ছিলাম একমাত্র প্রতিষ্ঠাতা। আমার সঙ্গে আর কোনো বিনিয়োগকারী ছিল না।
যখন পেছনে ফিরে তাকাই, বুঝতে পারি, নিজের জন্য একটা বড় বিনিয়োগ আমি জীবনের শুরুতেই করেছিলাম। যখন আমার বয়স ১৬, হাইস্কুলে পড়ি, তখন মা-বাবার বিচ্ছেদ হয়। সেই সময় একদিন আমার ঘরে এসে বাবা অনেকগুলো ক্যাসেট টেপ দিয়েছিলেন। ড. ওয়েইন ডায়ারের ‘হাউ টু বি আ নো-লিমিট পারসন’। দিয়ে বলেছিলেন, ‘মা রে, আফসোস, এই কথাগুলো যদি ৪০ বছর বয়সে না শুনে তোমার বয়সে শুনতাম!’ এর পরপরই বাবা বাসা ছেড়ে চলে যান।
সেদিনই ঘরের বুমবক্সে ক্যাসেটগুলো চালিয়ে দিলাম। একজন মানুষের কণ্ঠ শুনলাম, যিনি বলছিলেন নিজের চিন্তার শক্তির কথা; আমি যে ভবিষ্যৎটা চাই, সেটা কল্পনা করার কথা; ব্যর্থতাকে ভয় না পাওয়ার কথা; অন্য মানুষ আমাকে নিয়ে কী ভাবছে, তাতে গুরুত্ব না দেওয়ার কথা; যদিও ১৬ বছর বয়সে আমরা মূলত সেটাকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিই।
আমি তখন ক্লিয়ারওয়াটার হাইস্কুলে পড়ি। গাড়ি চালাতে চালাতে সব সময় টেপগুলো শুনতাম। এত বেশি শুনেছিলাম যে ১০টি টেপই পুরো মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল। তবে এর একটা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও ছিল—পার্টি শেষে কেউই আমার গাড়িতে উঠতে চাইত না। কারণ, সবার পছন্দ ছিল বোন জোভি আর ম্যাডোনার গান। অথচ আমার গাড়িতে উঠলেই শোনা যেত, ‘তুমি আদতে তোমার জীবন নিয়ে কী চাও?’
২০ বছর পর যখন ফোর্বস ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে জায়গা পেলাম, ক্লিয়ারওয়াটার স্কুলের বন্ধুরা মেসেজ পাঠিয়েছিল, ‘মনে হচ্ছে, তোমার গাড়িতে চড়ে ওই ভ্যাজর ভ্যাজরটাই শোনা উচিত ছিল।’
তোমাদেরও শোনা উচিত। তোমরা চাইলে নিজের জীবন-সিনেমার দর্শক হয়ে থাকতে পারো, চাইলে নিজেই গল্পটা বদলে দিতেও পারো। চাইলে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারো, অথবা সেই মানুষদের দলে ভিড়তে পারো, যাঁরা শুধু অপেক্ষা করে। তুমি তোমার চিন্তার যাত্রী হয়ে থাকতে পারো, আবার সেই চিন্তার চালকও হতে পারো।
আমি চালক হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। ডায়েরি লিখতাম, ভাবার জন্য আলাদা সময় রাখতাম। নিজেকে কঠিন প্রশ্ন করতাম। আর এমন কাজ করার চেষ্টা করতাম, যেগুলো আমাকে ভয় পাইয়ে দেয়। তুমি যখন তোমার চিন্তার চালকের আসনে বসবে, লোকে কী বলছে, সেটা আর তোমার মাথাব্যথার কারণ হবে না। বরং নিজের ওপর একটা অন্য রকম বিশ্বাস তৈরি হবে—আমি যেকোনো কিছু পারব। ‘নকল করা’ মানুষের ভিড়ে আলাদা হও। সত্যিকার পরিবর্তন আসবে তখনই, যখন কেউ ভিন্নভাবে একটা কিছু করবে।