ইরাসমাস মুন্ডুসের ড্রিম প্রোগ্রামের অধীনে ইউরোপের নানা দেশ ঘুরে উচ্চশিক্ষা নিচ্ছেন খন্দকার মাইনুল ইসলাম। তাঁর অভিজ্ঞতা শুনেছেন ফুয়াদ পাবলো।

‘ইদার ইউ আর আ জিনিয়াস, অর ইউ আর ক্রেজি (হয় তুমি জিনিয়াস, না হয় পাগল)।’
কথাটা বলেছিলেন চিভনিং বৃত্তির একজন ব্রিটিশ সমন্বয়কারী, যখন শুনেছেন তাঁদের অফারটি আমি গ্রহণ করছি না। তাঁর বিস্মিত হওয়ার যথেষ্ট কারণও ছিল। অনেকের কাছে এমন সুযোগ জীবনে একবারই আসে। কিন্তু আমাকে একটা অপশন ছাড়তেই হতো। কারণ, আমি ইরাসমাস মুন্ডুস ও চিভনিং-মর্যাদাপূর্ণ দুটি বৃত্তির জন্যই নির্বাচিত হয়েছিলাম।
আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশের (এআইইউবি) তড়িৎ ও ইলেকট্রনিকস প্রকৌশল বিভাগে পড়ার সময়ই ইরাসমাস মুন্ডুস সম্পর্কে জানতে পারি। তখন আমার চিন্তা শুধু ভালো ফলাফল বা একটি ডিগ্রি অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। আমি বিশ্বাস করতাম, বিশ্ববিদ্যালয় হলো নিজেকে আবিষ্কার, নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন ও ভবিষ্যতের ভিত শক্ত করার জায়গা। সেই বিশ্বাস থেকেই আইইইই এআইইউবি স্টুডেন্ট ব্রাঞ্চের স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ শুরু করি। এআইইউবি রোবোটিকস ক্রুর সঙ্গে যুক্ত হই। দেশ-বিদেশের নানা প্রতিযোগিতা, সেমিনার, কর্মশালা ও সম্মেলনে অংশ নিতে থাকি। ধীরে ধীরে বুঝতে পারি, শুধু ক্লাসরুমের শিক্ষা নয়; নেতৃত্ব, যোগাযোগদক্ষতা, দলগত কাজ ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজেকে উপস্থাপন করার সক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
তৃতীয় বর্ষে আইইইই এআইইউবি স্টুডেন্ট ব্রাঞ্চের ভাইস চেয়ারপারসন নির্বাচিত হওয়ার পর সুযোগটা আরও বিস্তৃত হয়। এআইইউবিতে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের প্রথম ইউরোপীয় ইউনিয়ন ডেলিগেশনের ইরাসমাস+রোডশোতে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাই। সেখানেই প্রথমবারের মতো ইরাসমাস মুন্ডুস সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারি।
২০২৩-২৪ সালে আইইইই এআইইউবি স্টুডেন্ট ব্রাঞ্চের চেয়ারপারসন থাকাকালে টেকসই জ্বালানি নিয়ে আরও গভীরভাবে কাজ শুরু করি। ৫৬টি সেমিনার, ওয়েবিনার ও সম্মেলনের আয়োজন করেছিলাম আমরা। যার মধ্য দিয়ে নেতৃত্ব, সমন্বয়, নেটওয়ার্ক তৈরি, সব রকম চর্চাই হয়েছে। একই সময়ে আমার সাতটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়। ফলে গবেষণার প্রতি আগ্রহ বাড়তে থাকে। ২০২৪ সালে স্নাতক শেষ করি। ভালো ফলের জন্য পেয়েছিলাম স্বর্ণপদক।
এরপর বাংলাদেশের একটি শীর্ষ বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে প্রকৌশলী হিসেবে কাজের সুযোগ পাই। কিন্তু কয়েক মাস কাজ করার পরই উপলব্ধি করি, গবেষণার প্রতি আমার আগ্রহটা বেশি। সিদ্ধান্ত নেওয়াটা কঠিন ছিল; কারণ, ভালো একটা চাকরি ছেড়ে অনিশ্চয়তার পথে হাঁটা সহজ নয়। সেই সময় সাহস জুগিয়েছিলেন মা। বলেছিলেন, ‘তুমি আরও বড় কিছু করার জন্যই জন্মেছ। অন্তত চেষ্টা করো।’
ব্যাস, চাকরি ছেড়ে দিয়ে শুরু করলাম আইইএলটিএস, বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন ও স্কলারশিপের প্রস্তুতি। আশপাশের অনেকেই সিদ্ধান্তটা ঝুঁকিপূর্ণ মনে করেছিলেন। কিন্তু আমি জানতাম, কিছু স্বপ্ন আছে, যেগুলোর জন্য নিরাপদ জায়গা ছেড়ে বেরিয়ে আসতেই হয়।
প্রথমে আবেদন করি চিভনিং স্কলারশিপে। চিভনিংয়ের আবেদনের প্রক্রিয়াটি আমাকে নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছিল। এখানে শুধু একাডেমিক সাফল্য নয়, বরং নেতৃত্ব, সামাজিক প্রভাব, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও দৃষ্টিভঙ্গিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। আবেদনপত্রের তিনটি প্রবন্ধে আমাকে ব্যাখ্যা করতে হয়েছিল, কেন আমি যুক্তরাজ্যে পড়তে চাই, আমার নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা কীভাবে আমাকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করে, ভবিষ্যতে আমি কী ধরনের পরিবর্তন দেখতে চাই।
পাশাপাশি যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় আবেদন করতে হয়েছিল। আবেদন করেছিলাম ইউনিভার্সিটি অব নটিংহ্যাম, ইউনিভার্সিটি অব ইয়র্ক ও ইউনিভার্সিটি অব অক্সফোর্ডে। সত্যি বলতে, তখন চিভনিং নিয়ে খুব বেশি আশাবাদী ছিলাম না। কারণ, যাঁদের গল্প শুনতাম, তাঁদের অনেকেই ছিলেন জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা, করপোরেট লিডার বা নীতিনির্ধারক। আমার অভিজ্ঞতা তাঁদের তুলনায় অনেক অল্প।
ফেব্রুয়ারিতে সাক্ষাৎকারের জন্য নির্বাচিত হওয়ার খবর পেয়ে আত্মবিশ্বাস ফিরে পাই। ব্রিটিশ হাইকমিশনে প্রায় ৪৫ মিনিটের সাক্ষাৎকারে একাডেমিক প্রস্তুতি, নেতৃত্ব, পেশাগত অভিজ্ঞতা ও বাংলাদেশে ফিরে অবদান রাখার পরিকল্পনা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়। সাক্ষাৎকার শেষে বেরিয়ে আমার মনে হয়েছিল, হয়তো সত্যিই একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
চারটি ইরাসমাস মুন্ডুস প্রোগ্রামে আবেদন করেছিলাম। চারটিতেই নির্বাচিত হই। শেষ পর্যন্ত বেছে নিই ইউরোপিয়ান মাস্টার ইন ডায়নামিকস অব রিনিউয়েবলস-বেজড পাওয়ার সিস্টেমস (ড্রিম) প্রোগ্রামে। চিভনিং যেখানে নেতৃত্ব ও সামাজিক প্রভাবকে বেশি গুরুত্ব দেয়, সেখানে ইরাসমাস মুন্ডুসের এই নির্বাচনের প্রক্রিয়া ছিল সম্পূর্ণ একাডেমিক ও প্রযুক্তিনির্ভর। আবেদনপত্র ও স্টেটমেন্ট অব পারপাসের পর আমাকে একটি প্রকল্প উপস্থাপন করতে হয়েছিল। এরপর অংশ নিতে হয়েছে দীর্ঘ টেকনিক্যাল সাক্ষাৎকারে। মনে আছে, আমার সাক্ষাৎকার পড়েছিল রোজার ঈদের দিন।
বাড়িভর্তি অতিথি। সবাই উৎসবের আনন্দে মত্ত। আর আমি একটা ছোট ঘরে কম্পিউটারের সামনে বসে সাক্ষাৎকারের অপেক্ষা করছি। ভাবছিলাম হয়তো গবেষণা, নেতৃত্ব কিংবা সহশিক্ষা কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন করা হবে। কিন্তু পুরো সাক্ষাৎকারে যে ৯টি প্রশ্ন করা হয়েছিল, তার প্রতিটিই ছিল পুরোদস্তুর টেকনিক্যাল। সাক্ষাৎকার শেষে মনে হয়েছিল, এটাও খারাপ হয়নি।
এরপর এল আরও একটা উৎসবের দিন, পয়লা বৈশাখ। বন্ধুদের সঙ্গে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি, এমন সময় এল সেই বহু প্রতীক্ষিত ই-মেইল। সেখানে লেখা—আপনাকে ইরাসমাস মুন্ডুস স্কলারশিপের জন্য নির্বাচিত করা হয়েছে। কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে বসে ছিলাম। তারপর দৌড়ে গিয়ে মাকে খবরটি দিই। আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন। সেই মুহূর্তটি আমার জীবনের সবচেয়ে আবেগঘন ও স্মরণীয় মুহূর্তগুলোর একটি হয়ে থাকবে।