প্রথমবারের মতো স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে বসে বিশ্বকাপ ফুটবল ম্যাচ দেখার সুযোগ পেলাম
প্রথমবারের মতো স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে বসে বিশ্বকাপ ফুটবল ম্যাচ দেখার সুযোগ পেলাম

বিশ্বকাপে মেসির হ্যাটট্রিক, যেভাবে ইতিহাসের সাক্ষী হলাম আমরা ৬ বন্ধু

জীবনের কিছু মুহূর্ত থাকে, যেসব গল্প শুধু বলা যায় না, ভাষায়ও প্রকাশ করা যায় না, শুধু তা জীবনের সেরা স্মৃতি হয়ে থাকে। আমার জীবনের এমনই এক দিন কানসাস সিটির এই সন্ধ্যা, যেদিন প্রথমবারের মতো স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে বসে সরাসরি বিশ্বকাপ ফুটবল ম্যাচ দেখার সুযোগ পেলাম।

আর্জেন্টিনা বনাম আলজেরিয়া। কাগজে-কলমে এটি ছিল একটি ফুটবল ম্যাচ, কিন্তু আমার কাছে এটি বহুদিনের এক স্বপ্নপূরণের গল্প।

মজার ব্যাপার হলো, ম্যাচটি দেখার আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলাম। টিকিটের উচ্চমূল্যের কারণে আগে কিনতে পারিনি। মনে হচ্ছিল, মাঠে বসে বিশ্বকাপ দেখার স্বপ্নটা হয়তো এবারও অপূর্ণ থেকে যাবে। কিন্তু ভাগ্য কী ভালো! ম্যাচ শুরুর মাত্র তিন ঘণ্টা আগে হঠাৎ করেই টিকিটের ব্যবস্থা হয়ে গেল।

এম্পোরিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির আমরা ছয় বন্ধু—মীর মেহেদী রহমান, সালেম তালুকদার, বাহাউদ্দিন বাঁধন, আয়েশা অরবী ও ফারহাদ আক্তার, আমাদের সবার অনুভূতিই ছিল প্রায় একই রকম। কেউই নিজের উত্তেজনা লুকাতে পারছিল না। কারণ, আমরা জানতাম, হয়তো এটাই শেষবারের মতো বিশ্বকাপের মঞ্চে লিওনেল মেসিকে দেখা। তাই এই ম্যাচ শুধু একটি খেলা নয়, আমাদের জন্য ছিল গ্যালারিতে বসে ইতিহাসের সাক্ষী হওয়া।

হাজার হাজার দর্শকের উপস্থিতিতে স্টেডিয়াম যেন এক বৈশ্বিক উৎসবের ময়দান

স্টেডিয়ামের গেটে পৌঁছানোর পর থেকেই যেন অন্য এক জগতে প্রবেশ করলাম। চারদিকে মানুষের ঢল। নানা দেশের পতাকা, জার্সি, মুখে আঁকা জাতীয় পতাকা। গান আর স্লোগানে মুখর পরিবেশ। হাজার হাজার দর্শকের উপস্থিতিতে স্টেডিয়াম যেন এক বৈশ্বিক উৎসবের ময়দান।

আমরা ছয়জন ছয়টি ভিন্ন ভিন্ন আসনে বসেছিলাম। কিন্তু খেলা শুরু হওয়ার পর মনে হচ্ছিল, আমরা সবাই যেন পাশাপাশি বসেই ম্যাচ উপভোগ করছি। প্রতিটি আক্রমণ, প্রতিটি গোলের সুযোগ, প্রতিটি করতালি এবং প্রতিটি উল্লাস আমাদের এক অদৃশ্য বন্ধনে বেঁধে রেখেছিল।

খেলা শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই আর্জেন্টিনার সমর্থকদের কণ্ঠে একটাই নাম—‘মেসি! মেসি!’ সেই ধ্বনি স্টেডিয়ামজুড়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। অন্যদিকে আলজেরিয়ার সমর্থকেরাও ছিল সমান প্রাণবন্ত। তাদের ড্রাম, গান আর পতাকার ওড়াউড়ি ম্যাচটিকে ভিন্ন রকম করে তুলেছিল। তারপর ম্যাচে এল সেই মুহূর্তগুলো, যেগুলো হয়তো মৃত্যুর আগপর্যন্ত ভুলতে পারব না।

লিওনেল মেসি যখন প্রথম গোলটি করলেন, পুরো স্টেডিয়াম যেন একসঙ্গে বিস্ফোরিত হলো। হাজারো মানুষের উল্লাসে গ্যালারি কেঁপে উঠল। নিজের অজান্তে আমিও দাঁড়িয়ে পড়েছিলাম। মনে হচ্ছিল, শুধু একটি গোল দেখছি না, ফুটবল ইতিহাসের একটি মুহূর্তের অংশ হয়ে যাচ্ছি।

দ্বিতীয় গোলের পর উন্মাদনা আরও বেড়ে গেল। চারদিকে শুধু আনন্দ, বিস্ময় আর উদ্‌যাপন। আর যখন তৃতীয় গোলটি এল, মেসির হ্যাটট্রিক হলো, তখন পুরো স্টেডিয়াম যেন কয়েক সেকেন্ডের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। এরপর শুরু হলো উল্লাসের বিস্ফোরণ।

মানুষ একে অপরকে জড়িয়ে ধরছে, পতাকা ওড়াচ্ছে, কেউ আনন্দে কাঁদছে, কেউ মুঠোফোনে ঐতিহাসিক মুহূর্তটা ধারণ করছে। চারদিকে তাকিয়ে শুধু ভাবছিলাম, সত্যিই কি আমি এখানে আছি? সত্যিই কি নিজের চোখে বিশ্বকাপে মেসির হ্যাটট্রিক দেখলাম?

স্টেডিয়ামের বাইরে চার বন্ধু একসঙ্গে

আমার বন্ধুদের অবস্থাও ছিল একই রকম। পরে যখন সবার সঙ্গে দেখা হলো, প্রত্যেকেই একই অনুভূতির কথা বলছিল। কেউ বলছিল স্টেডিয়ামে জীবনের সেরা অভিজ্ঞতা, কেউ বলছিল স্বপ্নপূরণ, আবার কেউ শুধু বারবার বলছিল, ‘বিশ্বাসই হচ্ছে না!’

আলজেরিয়ার সমর্থকেরাও অসাধারণ ক্রীড়াসুলভ মনোভাবের পরিচয় দিয়েছে। তাদের দল পিছিয়ে পড়লেও খেলাকে সম্মান জানিয়েছে। সেই মুহূর্তে হার-জিতের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছিল ফুটবলের সৌন্দর্য এবং একজন কিংবদন্তিতুল্য ফুটবলারের প্রতি বিশ্বজুড়ে মানুষের শ্রদ্ধা।

স্টেডিয়ামের ব্যবস্থাপনাও ছিল প্রশংসনীয়। নিরাপত্তা, দর্শক সেবা, খাবারের ব্যবস্থা, প্রবেশ ও বের হওয়ার পুরো প্রক্রিয়া ছিল অত্যন্ত সুশৃঙ্খল। বিভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি ও দেশের মানুষ একই গ্যালারিতে বসে খেলা উপভোগ করছিল। ফুটবল যে সত্যিকার অর্থেই বিশ্বকে এক সুতায় গাঁথতে পারে, আজ তার বাস্তব প্রমাণ দেখেছি।

ম্যাচ শেষ হওয়ার পরও তাড়াহুড়া করে বের হইনি। অনেক দর্শক যখন ধীরে ধীরে স্টেডিয়াম ছাড়ছিল, তখনো কিছুক্ষণ গ্যালারিতে বসে ছিলাম। আলোঝলমলে মাঠের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। কী দারুণ এক স্মৃতি নিয়ে যাচ্ছি এখান থেকে!

কানসাস সিটির সেই স্টেডিয়াম, মেসির হ্যাটট্রিক, আর্জেন্টিনার উল্লাস আর ছয় বন্ধুর একসঙ্গে ইতিহাসের সাক্ষী হওয়ার অভিজ্ঞতা—সবকিছু মিলিয়ে দিনটি আমার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় দিনগুলোর একটি হয়ে থাকবে নিঃসন্দেহে।