
ফুটবল বিশ্বকাপ ২০২৬–এর অন্যতম চমক কেপ ভার্দে। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের মূল পর্বে জায়গা করে নিয়েছে ছোট্ট এই আফ্রিকান দেশ। বিশ্বের বড় ফুটবল শক্তিগুলোর পাশে দেশটির নাম দেখে অনেক দর্শকই প্রশ্ন করছেন—কেপ ভার্দে আসলে কোথায়? কেমন দেশ এটি?
আফ্রিকার পশ্চিম উপকূল থেকে আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে ছড়িয়ে থাকা কয়েকটি আগ্নেয় দ্বীপ নিয়ে গড়ে উঠেছে দেশটি। জনসংখ্যা মাত্র ছয় লাখের কিছু বেশি। আয়তনে ছোট হলেও ইতিহাস, সংস্কৃতি আর প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যে দেশটি বেশ সমৃদ্ধ।
অনেকেই দেশটিকে কেপ ভার্দে নামে চেনেন। তবে ২০১৩ সালে দেশটি জাতিসংঘকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়, আন্তর্জাতিক পর্যায়েও তারা পর্তুগিজ নাম ‘কাবো ভের্দে’ ব্যবহার করতে চায়। ‘কাবো ভের্দে’ অর্থ ‘সবুজ অন্তরীপ’। নামটি এসেছে আফ্রিকার মূল ভূখণ্ডের পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত সেনেগালের একটি অন্তরীপ থেকে।
আজকের কাবো ভের্দে একসময় সম্পূর্ণ জনশূন্য ছিল। পঞ্চদশ শতকে পর্তুগিজ নাবিকেরা দ্বীপগুলো আবিষ্কার করেন। এরপর সেখানে বসতি গড়ে ওঠে।
পরবর্তী সময়ে আটলান্টিক দাস–বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে দেশটি। আফ্রিকা, ইউরোপ ও আমেরিকার মধ্যে বাণিজ্যিক যোগাযোগের কারণে দ্বীপগুলো কৌশলগত গুরুত্ব লাভ করে।
কাবো ভের্দের ইতিহাসে দীর্ঘ খরা বড় একটি সমস্যা ছিল। বিংশ শতকে ভয়াবহ খরায় বহু মানুষের মৃত্যু হয় এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমান।
ফলে আজ এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যে কাবো ভের্দে বংশোদ্ভূত মানুষের সংখ্যা দেশটিতে বসবাসকারী জনসংখ্যার চেয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসকারীর সংখ্যাই বেশি। প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ দেশটির অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
কাবো ভের্দের ফুটবল ইতিহাসেও আছে একটি স্মরণীয় ঘটনা।
২০১৫ সালে একটি প্রীতি ম্যাচে তারা ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী পর্তুগালকে ২-০ গোলে হারিয়ে দেয়। পর্তুগালের সাবেক উপনিবেশের জন্য এটি ছিল বড় এক অর্জন।
আজ বিশ্বকাপের মঞ্চে তাদের উপস্থিতি সেই ফুটবল–যাত্রারই নতুন অধ্যায়।
কাবো ভের্দের জাতীয় সংগীতধারা ‘মর্না’। এতে আফ্রিকান, পর্তুগিজ, ব্রাজিলীয় ও কিউবান সুরের মিশেল আছে।
এই ধারার সবচেয়ে বিখ্যাত শিল্পী ছিলেন সেজারিয়া এভোরা। তাঁর গান কাবো ভের্দেকে বিশ্বজুড়ে পরিচিত করে তুলেছে।
দেশটির সর্বোচ্চ চূড়া হলো সক্রিয় আগ্নেয়গিরি পিকো দো ফোগো। এর উচ্চতা প্রায় ২ হাজার ৮২৯ মিটার।
সবশেষ ২০১৪-১৫ সালে আগ্নেয়গিরিটি অগ্ন্যুৎপাত ঘটায়। ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও এর ঢালে এখনো কফি, ফল এবং আঙুরের চাষ হয়।
কাবো ভের্দে পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক কচ্ছপের প্রজননক্ষেত্র। বিশেষ করে লগারহেড প্রজাতির কচ্ছপের জন্য এটি বিশ্বের বৃহত্তম আবাসস্থলগুলোর একটি।
প্রতিবছর হাজার হাজার কচ্ছপ ডিম পাড়তে আসে দেশটির সৈকতে।
আফ্রিকার অনেক দেশের তুলনায় কাবো ভের্দে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও গণতন্ত্রের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সূচকে দেশটি আফ্রিকার সবচেয়ে গণতান্ত্রিক দেশগুলোর মধ্যে স্থান পায়। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও তাদের অবস্থান বেশ শক্তিশালী।
ভ্রমণকারীদের কাছে কাবো ভের্দে একটি নিরাপদ গন্তব্য হিসেবে পরিচিত। সুন্দর সৈকত, আগ্নেয় পাহাড়, সমুদ্রজীবন এবং স্বতন্ত্র সংস্কৃতির কারণে পর্যটকদের আগ্রহও বাড়ছে।
বিশ্বকাপের মতো আসরে নতুন কোনো দেশের অভিষেক সব সময়ই বিশেষ কিছু। কাবো ভের্দের গল্পও তেমনই। ছোট্ট একটি দ্বীপরাষ্ট্র, যার জনসংখ্যা ঢাকার একটি বড় এলাকার চেয়েও কম, কিন্তু স্বপ্ন দেখার সাহস অনেক বড়।
বিশ্বকাপ ২০২৬–এ দেশটি কত দূর যাবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত, ফুটবলপ্রেমীরা এখন শুধু কাবো ভের্দের খেলা নয়, দেশটির গল্পও জানতে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন।
সূত্র: ফ্যাক্টস ইনস্টিটিউট