যুক্তরাষ্ট্রে ওষুধ উদ্ভাবন নিয়ে গবেষণা করছেন বাংলাদেশি বিজ্ঞানী ড. ইমরুল শাহরিয়ার
যুক্তরাষ্ট্রে ওষুধ উদ্ভাবন নিয়ে গবেষণা করছেন বাংলাদেশি বিজ্ঞানী ড. ইমরুল শাহরিয়ার

যুক্তরাষ্ট্রে বসে ওষুধ উদ্ভাবনে গবেষণা করছেন ইমরুল, বাংলাদেশে চলছে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল

যুক্তরাষ্ট্রে ওষুধ উদ্ভাবন নিয়ে গবেষণা করছেন বাংলাদেশি বিজ্ঞানী ড. ইমরুল শাহরিয়ার। তাঁর ও তাঁর দলের গবেষণায় উদ্ভাবিত একটি অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ বর্তমানে আইসিডিডিআরবির তত্ত্বাবধানে দ্বিতীয় ধাপের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে রয়েছে। তাঁকে নিয়ে লিখেছেন ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর স্টাফ সায়েন্টিস্ট ড. রউফুল আলম

ওষুধ উদ্ভাবনের গবেষণায় কাজ করছি বেশ কয়েক বছর। সেই সুবাদে এই অঙ্গনের অনেক গবেষকের সঙ্গেই পরিচয় হয়েছে। ওষুধ উদ্ভাবনের মতো দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল গবেষণায় বাংলাদেশি বিজ্ঞানীদের উপস্থিতি খুব বেশি দেখা যায় না। তাই ড. ইমরুল শাহরিয়ারের কাজের কথা জানার পর থেকেই আগ্রহ নিয়ে অনুসরণ করছি।

ইমরুলের পিএইচডি গবেষণার বিষয় ছিল অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ আবিষ্কার। ইনফ্লুয়েঞ্জা বা ফ্লুর জন্য বাজারে কয়েকটি অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ থাকলেও সেগুলোর কার্যকারিতা খুব সন্তোষজনক না। এখনো প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে ফ্লুতে মারা যায় বহু মানুষ। বিদ্যমান ওষুধগুলোর চেয়ে আরও কার্যকর একটি ওষুধ উদ্ভাবনই ছিল ইমরুলের গবেষণার লক্ষ্য।

২০২৪ সালে তাঁদের সেই গবেষণার ফল প্রকাশিত হয় বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ সাময়িকী পিএনএএস (প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেস)-এ। প্রকাশের পরই গবেষণাটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাড়া ফেলে। সাক্ষাৎকারের জন্য তাঁকে ও তাঁর দলকে আমন্ত্রণ জানায় বিবিসি। বিবিসি রেডিওতে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইমরুল তাঁদের উদ্ভাবিত ওষুধটি কেন বর্তমান অ্যান্টিভাইরাল ওষুধগুলোর চেয়ে বেশি কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা রাখে, তার ব্যাখ্যা করেন। যদিও সে সময় পর্যন্ত এটি শুধু প্রাণীর ওপর পরীক্ষা করা হয়েছিল।

পৃথিবীর অধিকাংশ একাডেমিক গবেষণাই নতুন জ্ঞান তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাস্তব প্রয়োগ পর্যন্ত পৌঁছায় না। কিন্তু ইমরুলদের গবেষণা সেই সীমা অতিক্রম করেছে। প্রাক্-ক্লিনিক্যাল গবেষণার সব ধাপ সফলভাবে শেষ হওয়ার পর তাঁদের উদ্ভাবিত ওষুধ এখন ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে। মানুষের শরীরে ওষুধের নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা যাচাইয়ের এই পুরো প্রক্রিয়াকেই বলা হয় ট্রান্সলেশনাল রিসার্চ অর্থাৎ গবেষণাগারের উদ্ভাবনকে মানুষের চিকিৎসায় নিয়ে আসা।

২০২৪ সালে ইমরুলদের গবেষণার ফল প্রকাশিত হয় বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ সাময়িকী পিএনএএস-এ

ইমরুল বলেন, ‘ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা ভুল ধারণা রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, এতে মানুষকে “গিনিপিগ” বানানো হয়। বাস্তবতা ভিন্ন। আন্তর্জাতিক নৈতিক নীতিমালা মেনে, অভিজ্ঞ চিকিৎসক ও গবেষকদের নিবিড় তত্ত্বাবধানে স্বেচ্ছাসেবী ও রোগীদের অংশগ্রহণে এসব গবেষণা পরিচালিত হয়। লক্ষ্য একটাই—নিরাপদ ও কার্যকর চিকিৎসা নিশ্চিত করা। ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল না হলে আজ আমরা যে অসংখ্য ওষুধ ব্যবহার করছি, সেগুলোর কোনোটিই মানুষের কাছে পৌঁছাত না।’

ইমরুলদের গবেষণা থেকে উদ্ভাবিত ওষুধটির এখন সেই ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চলছে। যেকোনো ওষুধ গবেষকের জন্য এটি বিরাট অর্জন। তাঁর আনন্দের আরও বড় কারণ আছে। তাঁর উদ্ভাবিত ওষুধের দ্বিতীয় ধাপের (ফেজ–২) ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চলছে এখন, বাংলাদেশে। আর এই গবেষণার নিবিড় তদারকি করছে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি)।

তবে আনন্দের পাশাপাশি আছে উদ্বেগও। কারণ, এখন অপেক্ষা, ফেজ–২ ট্রায়াল সফল হয় কি না। গবেষণার জগতে এই অপেক্ষা অনিবার্য।

মাস্টার্স না করেই পিএইচডি

ইমরুলের মা-বাবা কখনো তাঁর জন্য নির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্য ঠিক করে দেননি। হয়তো সেই স্বাধীনতাই তাঁকে নিজের মতো করে ভাবতে এবং কাজ করতে শিখিয়েছে।

চট্টগ্রামে ইমরুলের জন্ম ও বেড়ে ওঠা। বাবা চট্টগ্রাম আদালতের আইনজীবী, মা গৃহিণী। চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল থেকে এসএসসি এবং রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ থেকে এইচএসসি করার পর ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালেই গবেষণার প্রতি তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়। ঢাকার রেড-গ্রিন রিসার্চ সেন্টারে গবেষণার সঙ্গে যুক্ত হন। বন্ধুদের নিয়ে বাংলাদেশের বাস্তব সমস্যা সমাধানে কাজ শুরু করেন। উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জন্য অতিরিক্ত লবণাক্ত পানির বিকল্প খুঁজতে তাঁদের একটি প্রকল্প আন্তর্জাতিক হাল্ট প্রাইজ প্রতিযোগিতাতেও জায়গা করে নেয়।

গবেষণার প্রতি এই নিবেদনই তাঁকে স্নাতক শেষ করেই বিশ্বের অন্যতম খ্যাতনামা পার্ডু বিশ্ববিদ্যালয়ে সরাসরি পিএইচডিতে ভর্তি হওয়ার সুযোগ করে দেয়। ২০১৯ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে যান। মাস্টার্স না করেই মাত্র চার বছরে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। তখন তাঁর বয়স মাত্র ২৮ বছর।

ইমরুলের পিএইচডি গবেষণার বিষয় ছিল অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ আবিষ্কার

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যভিত্তিক বায়োটেক প্রতিষ্ঠান ইরাডিভিরে ডিসকভারি ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করছেন তিনি। প্রতিষ্ঠানটির শিকড় পার্ডু বিশ্ববিদ্যালয়ে। এর প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক ফিলিপ লাও ড্রাগ ডিসকভারির (নতুন কোনো রোগ নিরাময়ের জন্য কার্যকর রাসায়নিক বা জৈব উপাদান খুঁজে বের করার জটিল প্রক্রিয়া) জগতে অত্যন্ত পরিচিত ও সফল এক বিজ্ঞানী। তাঁর গবেষণাগার থেকেই এ পর্যন্ত তিনটি ওষুধ যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের (এফডিএ) অনুমোদন পেয়েছে। বর্তমানে প্রোস্টেট ক্যানসার চিকিৎসায় বহুল ব্যবহৃত টার্গেটেড রেডিওথেরাপি ‘প্লুভিক্টো’-র গবেষণার সূচনাও এই ল্যাবরেটরিতে হয়েছিল।

বাংলাদেশের জন্য স্বপ্ন

যুক্তরাষ্ট্রে বসে গবেষণা করেছেন ইমরুল, এখন বাংলাদেশে চলছে সেটির ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল, আর সেটির ফলাফল ইতিবাচক হলে তার সুফল পাবে সারা বিশ্বের মানুষ। এটাই প্রমাণ করে, বিজ্ঞান কোনো দেশের সীমানায় আটকে থাকে না। বিজ্ঞানের সুফল সবার জন্য।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় যেমন তিনি বাংলাদেশের সমস্যা নিয়ে ভাবতেন, আজও দেশের কথাই তাঁর চিন্তায়। সেই ভাবনাই আমাকে মুগ্ধ করে। একজন ড্রাগ ডিসকভারি গবেষক হিসেবে তাঁর গভীরতা, নিষ্ঠা ও মেধা সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক।

বাংলাদেশে এখনো নতুন ওষুধ উদ্ভাবনের শক্তিশালী সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। দেশের ওষুধশিল্প মূলত জেনেরিক ওষুধ উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল। ফলে ডেঙ্গুর মতো নতুন স্বাস্থ্যসংকট দেখা দিলে আমরা উন্নত বিশ্বের উদ্ভাবনের অপেক্ষায় থাকি। এই বাস্তবতাই ইমরুলকে ভাবায়। তাঁর স্বপ্ন, বাংলাদেশেও একদিন মৌলিক ওষুধ উদ্ভাবনের গবেষণা বিকশিত হবে। সেই লক্ষ্য সামনে রেখে তিনি ‘বেঙ্গল আলকেমি’ নামে একটি বায়োটেক স্টার্টআপ গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছেন। সব বড় কাজের শুরু হয় একটি স্বপ্ন থেকে। সেই স্বপ্ন নিয়েই এগিয়ে চলেছেন তিনি।

তাঁর গবেষণা আরও সাফল্য বয়ে আনুক। তাঁর পথচলা অনুপ্রাণিত করুক বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের বিজ্ঞানীদের—এই প্রত্যাশাই রইল।