
রৌমারীর ডিগ্রিরচর থেকে টানা ১৮ দিন হেঁটে চরফ্যাশনের চর কুকরি–মুকরি গেছেন মাসফিকুল হাসান। ‘ব্রহ্মপুত্র থেকে বঙ্গোপসাগর ক্রস কান্ট্রি হাইকিং অভিযান ২০২৬’ নামের এই অভিযানে নদী অববাহিকা ধরে প্রায় ৬৩০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছেন এই অভিযাত্রী। তাঁর সঙ্গে কথা বললেন সজীব মিয়া
অভিযানের শুরুটা কীভাবে?
কুড়িগ্রামের রৌমারীর ডিগ্রিরচরে ব্রহ্মপুত্র নদ বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। ২৪ জানুয়ারি এই ডিগ্রিরচর থেকেই হাঁটা শুরু করি। এটা আমার চতুর্থ ক্রস কান্ট্রি হাইকিং। এর আগে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত হেঁটেছি, ভোমরা স্থলবন্দর থেকে আরাকান সীমান্তঘেঁষা সাকা হাফং পাহাড়চূড়াতেও গিয়েছি। তবে এবারের রুটটা ছিল একেবারে নতুন।
অভিযানের পরিকল্পনা কীভাবে এল?
অনেক দিন ধরেই নদী অববাহিকা ধরে হাঁটার একটা পরিকল্পনা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। জানুয়ারির শুরুতে হঠাৎ মনে হলো, এখনই সময়। কারণ, বর্ষায় সেটা অসম্ভব হয়ে যেত। শীতের শেষে নদীর শাখাগুলো শুকিয়ে বালুচর তৈরি হয়, যেগুলো ধরে হাঁটা সম্ভব। তবে গুগল ম্যাপে নির্দিষ্ট রুট পাইনি। তাই হাঁটার সময় প্রতিদিনই ছিল এক্সপ্লোরেশন। পথ খুঁজে খুঁজে এগোতে হয়েছে।
আপনার অভিযানের মূল বার্তা কী ছিল?
আমরা হাইকিংকে শুধু ভ্রমণ বলি না, বলি অভিযান। আমার এই অভিযানের স্লোগান ছিল, ‘নদীতে প্রাণের কান্না, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের বিরুদ্ধে দাঁড়াও।’ নদীভাঙন, অবৈধভাবে বালু উত্তোলন, কারেন্ট জালের ব্যবহার, নদীতে শিল্পবর্জ্য ফেলার মতো বিষয় সামনে আনাই ছিল উদ্দেশ্য। বাংলাদেশে পরিবেশ ও জলবায়ু রক্ষায় কাজ করা সংগঠন ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)’ এই অভিযানে সহযোগিতা করেছে। তাই এটা শুধু হাঁটা নয়, নদী রক্ষার একধরনের আন্দোলন।
কোন কোন অঞ্চল অতিক্রম করেছেন?
মোট ১২টি জেলা এবং ৬টি বিভাগে আমার পা পড়েছে। কুড়িগ্রামের রৌমারী থেকে শুরু করে জামালপুর, গাইবান্ধা, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল, মানিকগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, ঢাকা, শরীয়তপুর, বরিশাল হয়ে ভোলার চরফ্যাশন। পুরোটা পথ নদী অববাহিকা ধরে হাঁটার চেষ্টা করেছি।
প্রতিদিনের রুটিন কেমন ছিল?
ভোরে হাঁটা শুরু করতাম। বিকেলে হাঁটা শেষ করতাম। দিনের হাঁটা শেষে কাছের উপজেলা বা জেলা শহরে গিয়ে থাকতাম। কারণ, চরে রাত কাটানো ঝুঁকিপূর্ণ। বেশির ভাগ সময় হোটেলে থেকেছি। রৌমারী, দেওয়ানগঞ্জসহ কয়েক জায়গায় ডাকবাংলোয় থাকার সুযোগ হয়েছে।
খাবারদাবার কীভাবে সামলেছেন?
হাইকিংয়ের সময় আমি দিনের বেলায় ভাত খাই না। সকালে নাশতা সেরে বেরিয়ে পড়তাম। সঙ্গে রাখা আপেল, কমলা, খেজুর, কাঠবাদাম খেতাম। এ ছাড়া নদীপাড়ের দোকানে পাউরুটি, কলা, চা যা পেতাম, খেতাম।
তবে দু–এক জায়গায় ব্যতিক্রম হয়েছে। সিরাজগঞ্জের এক চরে কৃষকদের সঙ্গে বসে আমন ধানের লাল চালের ভাত আর ফুলকপি-মাছের তরকারি খেয়েছি। নদীর বাতাসে সেই ভাতের স্বাদ ভোলার নয়। বরিশালের চর হিজলায় এক দোকানি জোর করে ভাত খাওয়ালেন। নদীর পোয়া মাছ আর মুরগির মাংসের অসাধারণ আপ্যায়ন। বাংলাদেশের মানুষের আতিথেয়তা এই অভিযানে গভীরভাবে পেয়েছি।
সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং কী ছিল?
পুরো রুট ছিল সম্পূর্ণ অনিশ্চিত। কখনো ভাঙা পাড়, কখনো জিও ব্যাগ, কখনো শুকনা চরে পথ হারানো। কয়েকবার দিক ভুলে মূল শাখার পানির কাছে চলে গেছি। জেলেদের সহায়তায় ফিরেছি। শরীয়তপুরের মাঝিরকান্দিতে একবার বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে পড়েছিলাম। কয়েকজন আমাকে জোর করে অটোরিকশায় তুলতে চাইছিল। সন্দেহ হওয়ায় দৌড়ে একটি স্কুলে আশ্রয় নিই। তারাও পেছনে পেছনে এসে আমাকে নিয়ে যেতে চায়। পরে দাবি করে, আমার ব্যাগে নিষিদ্ধ কিছু আছে। তখন শিক্ষকেরা ব্যাগ চেক করে আমাকে নিরাপদে বের করে দেন। ঘটনাটা জীবনেও ভুলব না।
আর কোনো অভিজ্ঞতা?
খাল পারাপার নিয়ে নানা অভিজ্ঞতা হয়েছে। শরীয়তপুর থেকে ইলিশা পর্যন্ত প্রায় ২০টির মতো খাল পার হয়েছি। পুরো যাত্রায় মোটামুটি ৩০টির মতো খাল পেয়েছি। কোথাও হাঁটুপানি, কোথাও নৌকার দরকার হয়েছে। একবার তিন কিশোরের নৌকায় উঠেছিলাম—ওরা চালাতে পারছিল না, ঘুরপাক খাচ্ছিল! শেষে এক কৃষক এসে উদ্ধার করেন।
গন্তব্যে পৌঁছানোর অনুভূতি কেমন?
নির্বাচনের কারণে ৮ তারিখের মধ্যে শেষ করতে চেয়েছিলাম, শেষ হলো দুদিন পর ১০ ফেব্রুয়ারি। শেষ দিকে ৪১–৪২ কিলোমিটার পর্যন্ত হাঁটতে হয়েছে এক দিনে। চর কুকরি–মুকরি পৌঁছাতে আলাদা নৌকা ভাড়া করতে হয়েছে। কেওড়া বন পেরিয়ে, খালের কাদায় নেমে অবশেষে যখন সমুদ্রের দেখা পেলাম, বিশ্বাসই হচ্ছিল না—এটাই বঙ্গোপসাগর! তখন মনে হলো, ১৮ দিনের সব কষ্ট সার্থক।
নদীগুলোর বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে আপনার পর্যবেক্ষণ?
ব্রহ্মপুত্র-যমুনা অঞ্চলে ভাঙন ভয়াবহ। কুড়িগ্রাম, জামালপুর, সিরাজগঞ্জ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। পদ্মা-মেঘনার অনেক অংশে বাঁধ হয়েছে। মাছ কমে গেছে। কারেন্ট জাল, ব্যাটারি শক, বিষ প্রয়োগ—এসব ভয়াবহ। জাটকা ইলিশ সর্বত্র দেখেছি। নদী রক্ষায় কঠোর পদক্ষেপ জরুরি।
নিজের সম্পর্কে কী বলবেন?
আমি একজন স্বপ্নবান মানুষ। ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন দেখি আর সেটা পূরণ করতে পথে নামি। নাটোরের বড়াইগ্রামে আমাদের বাড়ি। পড়াশোনার শুরুটা বনপাড়ার বাড ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে। ২০২২ সালে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগ থেকে স্নাতক করেছি। এরপর বেসরকারি বিভিন্ন গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে কাজ করছি।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা?
সবুজ পাহাড় হোক বা তুষারঢাকা শৃঙ্গ—ছোটবেলা থেকেই পাহাড় দেখলে মনে হয়, একদিন ওখানে যেতেই হবে। আগামী মে মাসে নেপালে ৬ হাজার মিটার শৃঙ্গ আরোহণের পরিকল্পনা করছি। তবে তা অনেকখানি স্পনসরশিপের ওপর নির্ভর করছে। কারণ, এ ধরনের অভিযান অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এ ছাড়া দেশে আরও কিছু হাইকিংয়ের পরিকল্পনা আছে। দেশের বাইরে ভারত, চীন, ব্রাজিল, যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশে দীর্ঘমেয়াদি হাইকিংয়ের পরিকল্পনা করে রেখেছি। ব্রহ্মপুত্র থেকে বঙ্গোপসাগর—এই পথ আমাকে শিখিয়েছে, নদীর মতোই মানুষের জীবনও বহমান। বাধা আসবে, তবু চলতে হবে।