অফিসের বস ছুটি দিতে না চাইলে কী করবেন

‘আমার বস তো ছুটি দিতেই চান না’—এমন অভিযোগ বা আক্ষেপ থাকে অনেক প্রতিষ্ঠানের কর্মীর মধ্যেই। কর্মীর প্রয়োজনমাফিক ছুটি দেন না তাঁদের ঊর্ধ্বতনেরা। তবে বসের সঙ্গে ঝগড়া করা কিংবা চাকরি ছেড়ে দেওয়া তো আর বাস্তব সমাধান নয়। কী করলে কাঙ্ক্ষিত ছুটি পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে, জানালেন মানবসম্পদবিষয়ক প্রতিষ্ঠান করপোরেট কোচের মুখ্য পরামর্শক যিশু তরফদার। তাঁর সঙ্গে কথা বলে লিখেছেন রাফিয়া আলম

ছুটি পাওয়া যেমন একজন কর্মীর অধিকার, তেমনি প্রতিষ্ঠানের নির্দিষ্ট কিছু কাজ সামলানোও তাঁর দায়িত্ব
মডেল: শামস ও নাজমি। ছবি: সুমন ইউসুফ

ছুটি চাইতে গেলে মন–কষাকষি। আবেগের বশবর্তী হয়ে কখনো হয়তো মনে হয়, ‘ধুর, করলাম না এই চাকরি!’ কিন্তু কর্মসংস্থানের সংকটে বিকল্প চাকরি জোগাড় করাও চাট্টিখানি কথা নয়। তাহলে এই ছুটি–সমস্যার সমাধান কী?

নিজের অধিকার জানুন

বাংলাদেশের শ্রম আইনে একজন কর্মীর শ্রমঘণ্টা এবং প্রাপ্য ছুটির বিষয়ে নির্দেশনা আছে। কর্মী যে প্রতিষ্ঠানের হয়ে কাজ করেন, তাদেরও ছুটিসংক্রান্ত নীতিমালা আছে। দুই নীতিমালা মিলিয়ে দেখুন। কোনো প্রতিষ্ঠান শ্রম আইনের ব্যত্যয় ঘটালে মানবসম্পদ বিভাগে এ বিষয়ে কথা বলুন।

ছুটির নানা ধরন থাকে। কিছু ছুটি এক বছরের মধ্যেই নিয়ে ফেলতে হয়। কিছু ছুটি আবার পরবর্তী কয়েক বছর পর্যন্ত নেওয়ার সুযোগ থাকে। অর্জিত ছুটি (আর্নড লিভ) উপভোগ না করলে এর বিনিময়ে আর্থিক সুবিধা পাওয়ার সুযোগও থাকে। কিছু ছুটি নিতে হলে আবার কেটে রাখা হতে পারে সেদিনের বেতনও (লিভ উইদাউট পে)।

বিশেষ কোনো ছুটির দিনে কোনো কর্মী কাজ করলে পরবর্তীকালে কোন সময় তিনি সেই ছুটি উপভোগ করার সুযোগ পাবেন কিংবা এর জন্য কোনো অতিরিক্ত ভাতা পাবেন কি না, তা–ও জেনে রাখুন।

চাকরিতে ঢোকার আগেই এসব বিষয় জেনে নেওয়া উচিত। আগে থেকে যদি কেউ এসব ব্যাপারে না-ও জেনে থাকেন, তাহলেও বিষয়গুলো বিস্তারিত জেনে নেওয়ার চেষ্টা করা উচিত। তাহলে ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিদের সঙ্গে ভুল–বোঝাবুঝির আশঙ্কা কমবে।

উপলব্ধি করুন দায়িত্বটাও

ছুটি পাওয়া যেমন একজন কর্মীর অধিকার, তেমনি প্রতিষ্ঠানের নির্দিষ্ট কিছু কাজ সামলানোও তাঁর দায়িত্ব। নির্দিষ্ট কাজ নির্দিষ্ট তারিখের (ডেডলাইন) মধ্যে সম্পন্ন করবেন, এই হিসেবেই তিনি চুক্তিবদ্ধ।

অর্থাৎ কোনো প্রকল্প বা কাজ ফেলে রেখে ছুটির আবেদন করা উচিত নয় কোনো কর্মীরই। হুট করে কোনো জরুরি প্রয়োজন দেখা দিলে কিংবা পরিবারের কারও বিপদাপদ হলে ভিন্ন কথা।

তবে এসব ক্ষেত্রেও নিয়ম অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানকে তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টা জানাতে হয়। পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও (যেমন চিকিৎসকের পরামর্শপত্র) জমা দিতে হয়। নইলে অবিশ্বাসের জায়গা সৃষ্টি হতে পারে।

চাই বোঝাপড়া ও সঠিক পরিকল্পনা

কোনো প্রতিষ্ঠান শ্রম আইনের ব্যত্যয় ঘটালে মানবসম্পদ বিভাগে এ বিষয়ে কথা বলুন

একজন কর্মীকে তাঁর ছুটির অধিকার নিশ্চিত করতে হলে সহকর্মী ও ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিদের সঙ্গে সৌহার্দ্যমূলক সম্পর্ক রাখতে হবে। তিনি যখন ছুটিতে থাকবেন, সহকর্মীরা তাঁর দায়িত্ব সামলাবেন। আবার অন্য সহকর্মী ছুটি নিলে তাঁর দায়িত্ব পালন করার মানসিকতাও থাকতে হবে। একে অন্যের অনুপস্থিতিতে কাজ সামলে নেওয়ার ব্যাপারে বোঝাপড়া থাকা খুবই জরুরি।

ঊর্ধ্বতন ব্যক্তির সঙ্গেও অযথা বিবাদে জড়ানো উচিত নয়। ছুটির প্রয়োজন হলে ভদ্রতা বজায় রেখে নিজের প্রয়োজনের কথা জানান তাঁকে। ছুটির আবেদনের সঙ্গেই নিজের কাজ কীভাবে সম্পন্ন হবে (যেমন ছুটির আগেই ডেডলাইনের কাজ শেষ করা), সেটির একটি লিখিত পরিকল্পনা দিয়ে রাখা ভালো।

আপনার অনুপস্থিতিতে আপনার কোন সহকর্মী আপনার দায়িত্ব সামলাবেন, তা–ও জানিয়ে রাখুন বসকে। এ ছাড়া কর্মীদের মধ্যে কে কখন ছুটি নেবেন, সেটিও বছরের শুরুতেই সবাই মিলে পরিকল্পনা করে নিন। তাহলে পরিকল্পিত ছুটি পাওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা কমে।

পরিকল্পিত ছুটির ব্যাপারে প্রতিষ্ঠানকে নির্দিষ্ট সময় আগে জানানোর নিয়ম থাকে। এই নিয়ম অবশ্যই মেনে চলুন।

সব ঠিক থাকার পরও

অফিসে অন্যায়ভাবে আপনাকে বঞ্চিত করা হলে বসের ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিকে (প্রয়োজনে মানবসম্পদ বিভাগকে) বিষয়টি জানান

অধিকার আর দায়িত্বের এমন সব হিসাব–নিকাশ ঠিক থাকার পরও যদি বস ছুটি না দেন কিংবা জরুরি প্রয়োজনেও বস ছুটি অনুমোদন করতে না চান, তাহলেই মুশকিল। এসব ক্ষেত্রে বোঝাপড়া ও সঠিক পরিকল্পনার প্রতি কর্মীর আরও জোর দেওয়া উচিত।

তারপরও অন্যায়ভাবে তাঁকে বঞ্চিত করা হলে বসের ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিকে (প্রয়োজনে মানবসম্পদ বিভাগকে) বিষয়টি জানান। কোন কোন সময় তিনি অন্যায়ের শিকার হয়েছেন, তা লিখিতভবে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপনা করা ভালো।

অতি আবেগময় হয়ে পড়বেন না। সাতপাঁচ না ভেবেই চাকরি ছেড়ে দেবেন না। অনুমোদন ছাড়া ছুটি কাটালে আপনার ক্যারিয়ারে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এমনকি এই আচরণের কারণে চাকরি হারানোর ঝুঁকিও সৃষ্টি হতে পারে।

এ ছাড়া মনে রাখা প্রয়োজন, কিছু পেশায় জরুরি দায়িত্ব সামলাতেই হয়। পরিবার ও বন্ধুদেরও বিষয়টি বুঝিয়ে বলুন—হুট করে ছুটির ব্যবস্থা করাটা আপনার জন্য কতটা কঠিন।