খাবার

শুকনা খাবার যত

কাচের বয়ামে রাখা হয়েছে শুকনা খাবার। ছবি: নকশা
কাচের বয়ামে রাখা হয়েছে শুকনা খাবার। ছবি: নকশা

শীতপ্রধান দেশের মানুষ প্রাচীনকালে বরফ দিয়ে খাবার সংরক্ষণের চেষ্টা চালিয়েছেন। উল্টোদিকে গ্রীষ্মপ্রধান দেশের মানুষ চেষ্টা চালিয়েছেন রোদকে কাজে লাগাতে। খাদ্যসামগ্রী শুষ্ক করে রাখারও ইতিহাস রয়েছে। সেই ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় আজ চলছে প্রযুক্তির সর্বোত্তম প্রয়োগের প্রচেষ্টা।
ঢাকার গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজের সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ বিভাগের প্রভাষক তাসমিয়া জান্নাত বলেন, বাংলা বর্ষপঞ্জির পৌষ থেকে চৈত্র—এই চার মাস খাদ্যদ্রব্য সংরক্ষণের শ্রেষ্ঠ সময়। দিনে ৬-৭ ঘণ্টা রোদ পাওয়া যায় এই সময়টাতে। বৃষ্টিও তেমন হয় না বললেই চলে। তাই রোদকে কাজে লাগিয়ে খাদ্যদ্রব্য শুষ্ক করে সংরক্ষণের জন্য এই সময়টাই সবচেয়ে উপযোগী।
ঐতিহ্যগতভাবে বাড়ির ছাদে পাটি বা মাদুর বিছিয়ে খাবার শুকিয়ে সংরক্ষণ করা হয়ে থাকে। তবে খাবার সংরক্ষণের পদ্ধতি হিসেবে এটি কতটা স্বাস্থ্যসম্মত, তা-ও ভাবনার বিষয় বটে। আধুনিক ‘সোলার ড্রায়ার’ প্রযুক্তির মাধ্যমে খাবারের গুণগত মানও ঠিক থাকে। এ ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিয়েও চিন্তার কারণ নেই। তাসমিয়া জান্নাত জানালেন, এ প্রযুক্তিকে বলা হয় লাগসই প্রযুক্তি। চাইলে গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজের সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ বিভাগ থেকে এ প্রযুক্তি সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায়। এই প্রযুক্তির সহায়তায় বাড়িতেই খাবার সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা সম্ভব। চাটাই, বাঁশ, কালো রং প্রভৃতি সহজলভ্য উপাদান দিয়ে বাড়িতে বাক্স আকৃতির একটি সোলার ড্রায়ার তৈরি করে নিতে তিন থেকে চার হাজার টাকা খরচ পড়ে।
তাসমিয়া জান্নাত আরও জানালেন, সোলার ড্রায়ার ব্যবহারের মাধ্যমে বিভিন্ন ফলমূল (যেমন বরই ও তেঁতুল সংরক্ষণ কিংবা আঙুর থেকে কিশমিশ তৈরি), সবজি (যেমন ফুলকপি, টমেটো), সবজির বিচি (যেমন মটরশুঁটি), রসুন কিংবা মাছ-মাংস শুকিয়ে সংরক্ষণ করা যায়। পুষ্টি উপাদানের মধ্যে শুধু ভিটামিন বি এবং ভিটামিন সি ছাড়া অন্যান্য উপাদানের তেমন কোনো তারতম্য ঘটে না। খাবারের রঙেরও তেমন পরিবর্তন ঘটে না।
বাড়িতে খাবার শুকিয়ে সংরক্ষণ করার সময় ও সুযোগ না থাকলে অবশ্য বাইরে থেকেই শুকনো খাবার কিনে আনতে হয়। শুঁটকি মাছ অনেকেরই পছন্দের খাবার। তাই বাড়িতে তৈরি করা সম্ভব না হলেও অনেকেই চেষ্টা করেন শুঁটকি মাছ বা অন্যান্য শুকনা খাবার সংগ্রহ করতে। তবে যেখানেই তৈরি করা হোক না কেন, এসব শুকনা খাবার সংরক্ষণের রয়েছে কিছু নিয়মকানুন। এ ব্যাপারে তাসমিয়া জান্নাত দিয়েছেন কিছু পরামর্শ—
শুকনা খাবার অবশ্যই ‘এয়ারটাইট’ বাক্স বা প্যাকেটের মধ্যে সংরক্ষণ করতে হবে। অর্থাৎ এমনভাবে রাখতে হবে, যেন খাবারের মধ্যে বাতাস না ঢোকে।
এয়ারটাইট বাক্স বা প্যাকেটটি বারবার খোলা হলে বাতাস ঢুকে যেতে পারে। তাই খাবারগুলো অবশ্যই ছোট ছোট বাক্স বা পলিথিনে রাখা উচিত, যাতে একটি প্যাকেট বা বাক্স ডিপফ্রিজ থেকে বের করা হলে সেটির মধ্যে থাকা পুরো খাবারটুকুই ওই দিন রান্না করে নেওয়া যায় এবং সেটি আবার উঠিয়ে রাখতে না হয়।

শুকনা খাবারগুলো ফ্রিজের অন্যান্য খাবারের সংস্পর্শে না রাখাই ভালো। কাছাকাছি রাখা হলে একধরনের খাবারের ঘ্রাণ অন্য খাবারে ছড়িয়ে পড়তে পারে। সম্ভব হলে বিভিন্ন খাবারের জন্য আলাদা আলাদা স্থান (কম্পার্টমেন্ট) ব্যবহার করুন।
কিশমিশ ডিপফ্রিজে না রেখে সাধারণ তাপমাত্রার ফ্রিজে (নরমাল কম্পার্টমেন্ট) রাখুন।
যেকোনো শুকনা খাবারই ৩-৪ মাসের মধ্যে শেষ করে ফেলুন। এ ছাড়া যেকোনো সময় খাবারের রং বা ঘ্রাণের কোনো পরিবর্তন দেখলে কিংবা খাবারে সাদা ছত্রাক দেখা গেলে সেই খাবার গ্রহণ থেকে বিরত থাকুন।
সাধারণ কিছু শুকনা খাবার (বিস্কুট, চানাচুর, মুড়ি প্রভৃতি) সংরক্ষণের নিয়মকানুন সম্পর্কেও জানালেন তাসমিয়া জান্নাত—
* প্লাস্টিকের পাত্রের চেয়ে টিন বা কাচের পাত্রে খাবার সংরক্ষণ করা ভালো।
* পাত্রের মুখ যেন কখনোই ঢিলে হয়ে না থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখুন। প্রতিবার খাবার বের করার পর অবশ্যই ভালোভাবে পাত্রের মুখ আটকে রাখুন।
* পাত্রে খাবার রাখার আগে তা পরিষ্কার এবং জীবাণুমুক্ত আছে কি না, তা খেয়াল করে নিন। পাত্রে পানি আছে কি না তা-ও খেয়াল করুন। পানি রয়ে গেলে খাবার নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
এসব খাবার প্যাকেট থেকে বের করার পর এক সপ্তাহের বেশি সময় রেখে দেওয়া ঠিক নয়। এগুলোর ক্ষেত্রেও ঘ্রাণ বা রং বদলে গেলে সেটি গ্রহণ করা উচিত নয়।
অনেক সময় বড় বিস্কুটের প্যাকেটে ছোট ছোট কয়েকটি প্যাকেট থাকে। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন না থাকলে বড় প্যাকেটটি খোলার সময় সব কটি ছোট প্যাকেট খুলে বয়াম বা পাত্রে রেখে দেওয়া উচিত নয়, বরং প্রয়োজন অনুযায়ী প্যাকেট খুলে খাবার বের করে নেওয়া উচিত।