দেশের বিভিন্ন নামী রেস্তোরাঁ ও হোটেলে ‘ডোরি ফিশ’ নামে পরিবেশিত মাছ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সরগরম। ভোক্তাদের মনে প্রশ্ন জাগছে, বিদেশি সামুদ্রিক মাছ হিসেবে পরিচিত ডোরি ফিশের নামে আদতে কী পরিবেশন করা হচ্ছে? কেউ কেউ দাবি করছেন, ডোরি ফিশের নামে খাওয়ানো হচ্ছে পাঙাশ মাছ।
সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ডোরি ফিশ আমদানির কোনো সাম্প্রতিক রেকর্ড নেই। এতে ভোক্তাদের মধ্যে বিভ্রান্তি আরও বেড়েছে।
এ বিষয়ে ঢাকায় অবস্থিত সার্ক কৃষি কেন্দ্রের সিনিয়র প্রোগ্রাম স্পেশালিস্ট (ফিশারিজ) মো. শরীফুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের কাছে থাকা তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে বাংলাদেশে ডোরি নামে কোনো মাছ আমদানি হয়নি। এর আগে প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেল কর্তৃপক্ষ সীমিত পরিমাণে ডোরি মাছ বিদেশ থেকে এনেছিল।’
রেস্তোরাঁগুলোয় ডোরি ফিশ হিসেবে কোন মাছ পরিবেশন করা হচ্ছে, এ প্রশ্নের জবাবে শরীফুল ইসলাম বলেন, ‘ভিয়েতনামে উৎপাদিত একধরনের পাঙাশ মাছ আছে (বাসা নামে পরিচিত)। ওই মাছগুলো নদীতে চাষ করা হয়। ভিন্ন প্রজাতি ও চাষপদ্ধতির কারণে এই মাছের গন্ধ দেশি পাঙাশের মতো নয়। এর মাংস তুলনামূলক বেশি সাদা এবং স্বাদও কিছুটা আলাদা। ডোরি মাছের নামে মূলত ওই ভিয়েতনামি পাঙাশই পরিবেশন করা হচ্ছে বলে আমরা ধারণা করছি।’
তবে রেস্তোরাঁয় পরিবেশিত মাছটি আসলেই ডোরি কি না, তা সাধারণভাবে শনাক্ত করা কঠিন বলে জানান শরীফুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘এটি বাংলাদেশের প্রচলিত কোনো মাছ নয়। জীবন্ত ডোরি মাছ দেশে আনা হয় না। হোটেল ও রেস্তোরাঁয় যেভাবে মাছটি পরিবেশন করা হয়, সেখানে মাথা, চামড়া, কাঁটা বা অন্যান্য বৈশিষ্ট্য থাকে না। ফলে বাহ্যিকভাবে মাছটির পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। দেশে মাছটি নিয়ে এ পর্যন্ত তেমন কোনো গবেষণাও হয়নি। তাই সুনির্দিষ্টভাবে মাছটির পরিচয় জানতে হলে ডিএনএ পরীক্ষা করা প্রয়োজন।’
ডোরি ফিশ বা জন ডোরি মাছটি দেখতে বেশ অদ্ভুত—চ্যাপটা শরীর, বড় মাথা, কাঁটার মতো পাখনা আর শরীরের দুই পাশে গোল কালো একটি দাগ। এই দাগের কারণে অনেক জায়গায় মাছটি ‘সেন্ট পিটার্স ফিশ’ নামেও পরিচিত।
উত্তর আটলান্টিক, ভূমধ্যসাগর এবং আফ্রিকার পশ্চিম উপকূলের সমুদ্রে ডোরি ফিশ পাওয়া যায়। অন্য মাছ, চিংড়ি ও স্কুইড খেয়ে বেঁচে থাকে। দক্ষ শিকারি মাছ হিসেবে পরিচিত।
তবে ডোরি ফিশের সবচেয়ে বড় পরিচিতি এর স্বাদের কারণে। ইউরোপের অনেক দেশে বেশ মূল্যবান খাবার হিসেবে বিবেচিত। মাছটির সাদা রঙের মাংস নরম হলেও ভেঙে যায় না, স্বাদ মৃদু ও হালকা মিষ্টি। ফলে গ্রিল, প্যান-ফ্রাই, পোচ কিংবা স্যুপ—বিভিন্ন ধরনের রান্নায় ব্যবহার করা যায়।
রন্ধনবিশেষজ্ঞদের কাছেও ডোরি ফিশ জনপ্রিয় এর অনন্য স্বাদের কারণে। অতিরিক্ত মসলা ছাড়াই মাছটির স্বাদ দারুণ। ফরাসি ও ইতালীয় রান্নায় তাই এটি দীর্ঘদিন ধরেই বিশেষ স্থান দখল করে আছে।
অবশ্য পুরো মাছ কাটার সময় কিছুটা সতর্কতা প্রয়োজন। এর পাখনার কাঁটাগুলো খুব ধারালো, তাই সাধারণত মাছ বিক্রেতারাই ফিলে করে দেন।
মোটকথা, দেখতে খুব আকর্ষণীয় না হলেও স্বাদের জন্য ডোরি ফিশকে বিশ্বের অন্যতম সুস্বাদু সামুদ্রিক মাছের তালিকায় রাখা হয়।
ডোরি ফিশকে বিশ্বের অনেক দেশে ‘ফাইন ডাইনিং’ বা অভিজাত রেস্তোরাঁর মাছ হিসেবে ধরা হয়। ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের বাজারে তাজা ডোরি ফিশের ফিলে সাধারণত প্রতি কেজি ৫০ থেকে ৮০ মার্কিন ডলার সমমূল্যে বিক্রি হয়; অর্থাৎ বাংলাদেশি মুদ্রায় ৬ থেকে ১০ হাজার টাকায়। কিছু বিশেষ অঞ্চলে ধরা প্রিমিয়াম মানের বুনো ডোরি ফিশের দাম এর চেয়েও বেশি হতে পারে।
মাছটির দাম বেশি হওয়ার পেছনে কয়েকটি কারণ আছে। প্রথমত, পুরো মাছের তুলনায় খাওয়ার উপযোগী ফিলের পরিমাণ বেশ কম। বড় মাথা, কাঁটা ও হাড়ের কারণে একটি মাছের উল্লেখযোগ্য অংশ রান্নার জন্য ব্যবহার করা যায় না। দ্বিতীয়ত, ডোরি ফিশ ধরাই হয় সমুদ্র থেকে; বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা কঠিন। ফলে সরবরাহ তুলনামূলক সীমিত।
স্বাদ, বিরলতা এবং কম ফিলে উৎপাদনের কারণে ডোরি ফিশকে বিশ্বের দামি সামুদ্রিক মাছগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এদিকে দেশে বিভিন্ন অনলাইন গ্রোসারি ও মাংস-মাছ বিক্রেতার সাম্প্রতিক তালিকা অনুযায়ী, এই তথাকথিত ‘ডোরি ফিলে’ বা বাসা ফিলের দাম সাধারণত প্রতি কেজি ৪৫০ থেকে ৭০০ টাকার মধ্যে দেখা যায়। কিছু প্রিমিয়াম ব্র্যান্ড বা প্যাকেজিংয়ে দাম কিছুটা বেশি হতে পারে।
বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, দেশের বাজারে ডোরি ফিশ নামে যেসব মাছ বিক্রি হচ্ছে, সেসবে ক্ষতিকর রাসায়নিকও দেওয়া হয়। মূলত স্বাদুপানির মাছে সামুদ্রিক মাছের ফ্লেভার আনতেই রাসায়নিক দেওয়া হয় বলে উল্লেখ করা হচ্ছে এসব খবরে।
যদিও মাছে দেওয়া রাসায়নিকের কোনো নাম পাওয়া যায়নি, তারপরও এ বিষয়ে প্রশ্ন করেছিলাম রাজধানীর ধানমন্ডির পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও সহকারী অধ্যাপক ডা. সাইফ হোসেন খানকে।
রাসায়নিক দেওয়া মাছ খেলে কী হতে পারে?—এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘সত্যিই যদি মাছে ক্ষতিকর রাসায়নিক প্রয়োগ করা হয়ে থাকে, তাহলে তা খেলে মানবদেহে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। রাসায়নিকের প্রভাবে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সমস্যা না হলেও নীরবে মানবদেহের অভ্যন্তরে দীর্ঘমেয়াদি কিছু পরিবর্তন হয়। ঠিক কোন রাসায়নিক ব্যবহার করা হচ্ছে, তা না জেনে এ সম্পর্কে মন্তব্য করা কঠিন। তবে বিশ্বব্যাপী বহু গবেষণার ফলাফল জানাচ্ছে, খাবারের মাধ্যমে মানবদেহে ক্ষতিকর রাসায়নিক প্রবেশ করার ফলে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি হতে পারে।’