পান্তা পয়লা বৈশাখের খাবার নয়। পান্তা বাংলাদেশের কৃষিভিত্তিক সমাজের চিরকালের খাবার। আমাদের ছোটবেলায় আমরা যখন গ্রামের বাড়িতে যেতাম, গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের সাতানা বালুয়া গ্রামে, তখন আমাদের দাদি, জেঠাইমা আমাদের হাতে বড় গামলা, আর জগভর্তি পানি ধরিয়ে দিতেন। সঙ্গে টিনের থালা। গামলায় থাকত পান্তা। আরও সঙ্গে নিতাম লবণ, মরিচ, পেঁয়াজ। এগুলো নিয়ে আমরা খেতে চলে যেতাম। ঠিক ১১টার দিকে। এই সময়টার নামই ছিল পান্তাবেলা।
কিষানেরা খেতে কাজ করছেন, নিড়ানি দিচ্ছেন, হালচাষ করছেন, মই দিচ্ছেন, তাঁরা তখন এসে আলে বসতেন। আমরা পান্তা দিতাম। তাঁরা আলে বসে খেতেন।
পান্তা সেই আদিকাল থেকে বাংলার মানুষ খেয়ে থাকেন। দক্ষিণ এশিয়ার অনেক জায়গাতেই পান্তার প্রচলন আছে। ভাত যাদের প্রধান খাদ্য।
প্রাচীন সাহিত্যে পান্তার উল্লেখ পাওয়া যাচ্ছে।
চণ্ডীমঙ্গলে আছে:
‘বাসি অন্ন আনে রামা দিআ তরাতরি।
জল সমে ঢালে অন্ন পাতে শীঘ্র করি।
আছে বা না আছে অন্ন পূর্ণ বাসি জলে।
স্থানীসঙ্গে আনি তাহা বীরের পাতে ঢালে।
ফুল্লরা রন্ধন করে বীরে খাইতে ভাত।
তরাতরি আনিলেক মানকচুর পাত।’
কালকেতুকে ফুল্লরা যেভাবে ভোজন করাল, তার বর্ণনা মুকুন্দরাম দিচ্ছেন:
‘দূর হৈতে ফুল্লরা বীরের পাল্য সাড়া।
সম্ভ্রমে বসিতে দিল হরিণের ছড়া।।
বোঁচা নারিকেলের পুরিয়া দিল জল।
করিল ফুল্লরা তবে ভোজনের স্থল।
চরণ পাখালি বীর জল দিল মুখে।
ভোজন করিতে বৈসে মনের কৌতুকে।
সম্ভ্রমে ফুল্লরা পাতে মাটিয়া পাথরা।
ব্যঞ্জনের তরে দিলা নূতন খাপরা।
মোচড়িয়া গোঁফ দুটা বান্ধিলেন ঘাড়ে।
এক শ্বাসে সাত হাড়ি আমানি উজাড়ে।।
চারি হাড়ি মহাবীর খায় খুদ জাউ।
ছয় হান্ডি মুসুরি সুপ মিশ্যা তথি লাউ।।
ঝুড়ি দুই তিন খায় আলু ওল পোড়া।
কচুর সহিত খায় করঞ্জা আমড়া।।’
সাত হাঁড়ি আমানি হলো পান্তাভাত। জানিয়েছেন অধ্যাপক তারিক মনজুর।
‘পান্তা ওদন দিয়া পুজিবেক তোমা
আশ্বিনে অনন্ত পূজা চিত্তে নাহি সীমা।’
কেতাকাদাস ক্ষেমানন্দ/‘মনসার ভাসান’
বিজয়গুপ্তর ‘পদ্মাপুরাণ’–এ (১৬৫০) আছে, ‘আনিয়া মানের পাত বাড়ি দিল পান্তাভাত’।
রবীন্দ্রনাথের জীবনস্মৃতি: ‘ইসকুল থেকে ফিরে এলেই রবির জন্য থাকে নতুন বউঠানের আপন হাতের প্রসাদ। আর যে দিন চিংড়ি মাছের চচ্চড়ির সঙ্গে নতুন বউঠান নিজে মেখে মেখে দেয় পান্তাভাত, অল্প একটু লঙ্কার আভাস দিয়ে সে দিন আর কথা থাকে না।’
কামরুদ্দীন আহমদ তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন, বেগম মুজিব তাঁদের ৩২ নম্বরের বাড়িতে পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে দাওয়াত করেছিলেন অনেককে, সেটা পাকিস্তান আমলের কথা। পান্তা খাইয়েছিলেন শুঁটকি, মাংস, মরিচ-পেঁয়াজ দিয়ে।
রবীন্দ্রনাথ হালদার নামের একজন ফেসবুকে মজার কবিতা লিখেছেন:
‘বাঙালিকে অনেকেই মজা করে বলে, বাঙালিরা হোলো ভেতো বাঙালির জাত।
কিন্তু বাঙালি বাদে পৃথিবীর আর কেউই জানেন না কাকে বলে পান্তা ভাত।
পৃথিবীর অনেক মানুষই তাঁদের প্রধান খাদ্য হিসেবে ভাত খায়।
কিন্তু তাঁরা কেউই পান্তা ভাতের স্বাদ নাহি পায়।
ঠান্ডা ভাতের সাথে,
জল ঢেলে দিলে তাতে,
রাতে।
ঠান্ডা জল আর ঠান্ডা ভাত,
দুজনে মিলেমিশে থাকলে একরাত,
পরের দিন সকালেই সেটা হয়ে যায় কিন্তু পান্তা ভাত।
এই পান্তা ভাতের এমনই ফান্ডা!
কাঁচা লঙ্কা বা শুকনো লঙ্কা ভাজা অথবা কাঁচা পেঁয়াজ দিয়ে খেলে সারাদিন শরীর থাকে ঠান্ডা।
গ্রীষ্মকালের সূর্যের তেজ কিংবা তীব্র দাবদাহের ডান্ডা,
পরিশ্রমী মানুষের উপর যতই চালাকনা তার ফান্ডা!’
পান্তার উপকারিতা নিয়ে অনেক গবেষণা হচ্ছে পৃথিবীজুড়ে। সব বৈজ্ঞানিক গবেষণা।
অক্সফোর্ডের একটি একাডেমিক জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, ফারমেন্টেশন প্রক্রিয়া খাবারের ভেতরে থাকা অনেক উপকারী জৈব উপাদানকে আরও সক্রিয় করে তোলে। অর্থাৎ সাধারণ খাবার ফারমেন্টেড হলে তা আরও বেশি স্বাস্থ্যকর হয়ে উঠতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ফারমেন্টেড খাবার আমাদের শরীরের পুষ্টি বাড়াতে সাহায্য করে, বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি কমাতে পারে এবং সামগ্রিকভাবে সুস্থ থাকতে ভূমিকা রাখে। শুধু খাবার হিসেবেই নয়, এসব উপাদান ভবিষ্যতে প্রসাধনী বা অন্যান্য শিল্পেও ব্যবহার হতে পারে।
ফারমেন্টেশনের সময় যে অণুজীবগুলো কাজ করে, তারা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তারা খাবারের ভেতরে নানা ধরনের উপকারী উপাদান তৈরি করে, যাকে বলা হয় মেটাবলাইট। একই সঙ্গে তারা খাবারের ক্ষতিকর বা অপ্রয়োজনীয় উপাদানও ভেঙে দেয়।
বিশেষ করে ভাতজাত ফারমেন্টেড খাবার, যেমন আমাদের পান্তাভাত নিয়ে গবেষণায় দেখা গেছে, এতে এমন কিছু জৈব বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে, যা ত্বকের জন্যও উপকারী হতে পারে।
আরেক গবেষণায় বলা হচ্ছে, পান্তা রক্তে শর্করা কমায়। কমায় মানে ভাতের চেয়ে কম বাড়ায়। প্রথম আলোয় পার্থ শঙ্কর সাহা পান্তা নিয়ে লিখেছেন, ‘সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের বড় অংশের প্রাত্যহিক খাবার পান্তা। গরিবের এ খাবারের নতুন গুণের সন্ধান পাওয়া গেছে। আর তা খুঁজে পেয়েছেন যুক্তরাজ্যের একদল গবেষক।
‘শরীরের জন্য উপকারী নানা উপাদান খুঁজে পাওয়া গেছে পান্তা নিয়ে নতুন এ গবেষণায়। দেখা গেছে, পান্তাভাতে অনেক উপকারী অণুজীব আছে। আবার এখানে নতুন কিছু অণুপুষ্টি উপাদানও পাওয়া গেছে। গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পান্তা খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে কম হারে বাড়ে।
‘যুক্তরাজ্যভিত্তিক বিজ্ঞান সাময়িকী “ফুড অ্যান্ড হিউম্যানিটি”–তে পান্তাভাত নিয়ে নতুন এ গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে গত বছরের ডিসেম্বরে। গবেষণা দলের নেতৃত্ব দেন যুক্তরাজ্যের লিভারপুল জন মুরস ইউনিভার্সিটির স্কুল অব ফার্মাসি অ্যান্ড বায়োমলিকুলার সায়েন্সেসের অধ্যাপক মোশাররফ হোসেন সরকার। গবেষণায় যুক্ত ছিলেন যুক্তরাজ্যের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আট শিক্ষক ও শিক্ষার্থী।’ (১৪ এপ্রিল ২০২৫)
পান্তা খেতে আমিও ভালোবাসি। তবে একবার গ্রীষ্মকালে দুই দিন ভাত ভিজিয়ে রেখেছিলাম, পান্তা হয়নি। আরেকবার, আমাদের এক বন্ধু, টিভি অনুষ্ঠানের প্রযোজক, শতাধিক নায়ক-নায়িকা-গায়ক-গায়িকাকে ডেকেছিলেন পান্তার নিমন্ত্রণে, পয়লা বৈশাখ সকালে। পান্তা খাইয়েছিলেন।
পরে শতাধিক তারকা পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হন, হাসপাতালগুলো নায়ক-নায়িকায় ভরে যায় (একটু বাড়িয়ে বললাম)। বেশ হাসাহাসি হয়েছিল পরের দিন।
যেহেতু পান্তা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ হালদারের ফেসবুক পোস্ট উদ্ধৃত করলাম, নিজেই দুই–একটা লাইন লিখে দিই, যাতে অন্যরা আমাকে কোট করতে পারে:
কিসের মধ্যে কী?
পান্তাভাতে ঘি!
পান্তাভাতে ঘি নয়,
নয়কো এটা বিনয়,
পান্তার সাথে সরষে তেল,
১১টায় পান্তাবেল।
কাঁচা মরিচ চলতে পারে,
শুকনো হলে স্বাদটা বাড়ে,
পুড়িয়ে লঙ্কা ডলে খাই,
ভেতর বলে আরও চাই।
লবণ কিন্তু নিতেই হবে;
পান্তার স্বাদ জমবে তবে।
ইলিশের সঙ্গে পান্তার কোনো সম্পর্ক নেই। পান্তার সঙ্গে লবণ, মরচি, পেঁয়াজ, শর্ষের তেল, ভর্তা, ডালচচ্চড়ি, কষা মাংস, ডিমভাজা—সবই চলে। তবে বেচারা ইলিশকে ক্ষমা দিন।
এইবার শেষ ছড়াটা লিখি:
কান্তা আমার কান্তা
পান্তা খুবই উপকারী
এই কথা কি জানতা?
কান্তা আমার কান্তা
পান্তা খেলে প্রাণটা জুড়ায়
তোমার জন্য কলজে পোড়ায়
এই কথা কি জানতা
তোমায় যতই ভালোবাসি
পান্তা যখন একটু বাসি
তোমার চেয়েও সর্বনাশী
মুখে পেটে জোরসে ঠাসি
এই কথা কি মানতা
কানতা আমার কান্তা
তুমিই আমার পান্তা।