
অধুনার নিয়মিত বিভাগ ‘পাঠকের প্রশ্ন’। এই বিভাগের বিশেষজ্ঞ আইনজীবী ব্যরিস্টার মিতি সানজানা। দীর্ঘদিন ধরে তিনি পাঠকদের আইনি প্রশ্নের পরামর্শ দিচ্ছেন। পত্রিকায় কলাম লিখে নানা অভিজ্ঞতা জমা হয়েছে তাঁর। সেই অভিজ্ঞতার কিছু অংশ পাঠকদের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের এই আইনজীবী।
আমি আমার স্ত্রীকে ডিভোর্স দিতে চাই। আমাদের এক বছরের সংসার, পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়েছিল। বিয়ের পর থেকে তাঁর যেমন আমাকে পছন্দ নয়, আমারও তাঁকে পছন্দ নয়। আমাদের কোনো সন্তান নেই। আমার স্ত্রী আমার নামে যাচ্ছেতাই বলে বেড়ান, আমাকে হেয় করেন। আমি একজন শিক্ষক, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করি। তাঁর অনেক টাকার দরকার। আমাকে মামলা ও জেলহাজতের ভয় দেখাচ্ছেন। কখনো কোনো আইনি জটিলতায় পড়িনি। এখন মনে হচ্ছে, একসঙ্গে থাকলে বড় বিপদ হতে পারে। ডিভোর্সের জন্য কী কী পদক্ষেপ নিতে হবে, কার কাছে যেতে হবে, খরচ ও সময় কেমন লাগবে, তা জানার জন্য আপনার দ্বারস্থ হয়েছি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক
আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। যেহেতু আপনার স্ত্রী আপনাকে পছন্দ করেন না এবং আপনিও এই বিয়ে টিকিয়ে রাখতে চাচ্ছেন না, সে ক্ষেত্রে দুই পক্ষকেই একটি সমাধানে আসতে হবে।
যেহেতু আপনি বিচ্ছেদের বিষয়ে জানতে চেয়েছেন, আমি সরাসরি সেই প্রক্রিয়াটাই বর্ণনা করছি। তালাক দেওয়ার বিষয়ে ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইনে বলা হয়েছে, তালাক দিতে চাইলে তাঁকে যেকোনো পদ্ধতির তালাক ঘোষণার পর অন্যপক্ষ যে এলাকায় বসবাস করছেন, সে এলাকার স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান/পৌরসভার মেয়র/সিটি করপোরেশনের মেয়রকে লিখিতভাবে তালাকের নোটিশ দিতে হবে।
সেই সঙ্গে তালাক গ্রহীতাকে উক্ত নোটিশের নকল প্রদান করতে হবে। এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে যে তালাকের নোটিশটি কত সময়ের মধ্যে পাঠাতে হবে। আইনে বলা আছে তখনই/পরবর্তী সময়ে/যথাশিগগির সম্ভব।
নোটিশ পাঠানোর কাজটি ডাকযোগেও হতে পারে, আবার সরাসরিও হতে পারে। ডাকযোগে রেজিস্ট্রি করে এডি (অ্যাকনলেজমেন্ট ডিউ) সহযোগে পাঠালে ভালো হয়।
চেয়ারম্যান বা মেয়রের কাছে যে তারিখে নোটিশ পৌঁছাবে, সেদিন থেকে ৯০ দিন পর বিবাহবিচ্ছেদ বা তালাক কার্যকর হবে। এ নোটিশ পাওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে সালিসি পরিষদ গঠন করে সমঝোতার উদ্যোগ নিতে হবে। নোটিশ পাওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে সালিসের কোনো উদ্যোগ নেওয়া না হলেও তালাক কার্যকর বলে গণ্য হবে।
এ বিষয়ের শুরুতে আপনাকে অবশ্যই একজন ভালো আইনজীবীর পরামর্শ নিতে হবে। আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি আপনাকে খরচের বিষয়ে অবগত করবেন।
আপনি জানিয়েছেন আপনার স্ত্রী মামলা ও জেলহাজতের ভয় দেখাচ্ছেন। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত)–র ১৭ ধারায় বলা আছে, যদি কোনো ব্যক্তি কারও ক্ষতিসাধনের উদ্দেশ্যে ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে এই আইনের অন্য কোনো ধারার অধীন মামলা বা অভিযোগ করার জন্য ন্যায্য বা আইনানুগ কারণ নেই জেনেও মামলা বা অভিযোগ করেন, তাহলে উক্ত ব্যক্তি সাত বছর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
ফৌজদারি কার্যবিধি ২৫০ ধারায়ও মিথ্যা মামলার শাস্তির বিধান রয়েছে। ২৫০ ধারায় বলা আছে, ম্যাজিস্ট্রেট যদি আসামিকে খালাস দেওয়ার সময় প্রমাণ পান যে মামলাটি মিথ্যা ও হয়রানিমূলক, তাহলে বাদীকে কারণ দর্শানোর নোটিশসহ ক্ষতিপূরণের আদেশ দিতে পারেন ম্যাজিস্ট্রেট।
দণ্ডবিধির ১৯১ ধারা থেকে ১৯৬ ধারা পর্যন্ত মিথ্যা সাক্ষ্যদান, মিথ্যা সাক্ষ্য সৃষ্টি এবং মিথ্যা সাক্ষ্যদানের শাস্তি সম্পর্কে বলা আছে। আপনি তাঁকে এ ধরনের বেআইনি কাজ থেকে বিরত থাকতে বলুন। এরপরও তিনি এমন হুমকি দিলে সেসব কথা উল্লেখ করে আপনি নিকটবর্তী থানাকে অবহিত করে একটি সাধারণ ডায়েরি করে রাখতে পারেন। পরবর্তী সময় পরিস্থিতি বুঝে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারবেন।
আশা করি, আপনার প্রশ্নের উত্তর পেয়েছেন।
পাঠকের প্রশ্ন পাঠানো যাবে ই–মেইলে, ডাকে এবং প্র অধুনার ফেসবুক পেজের ইনবক্সে। ই–মেইল ঠিকানা: adhuna@prothomalo.com (সাবজেক্ট হিসেবে লিখুন ‘পাঠকের প্রশ্ন’)
ডাক ঠিকানা : প্র অধুনা, প্রথম আলো, প্রগতি ইনস্যুরেন্স ভবন, ২০–২১ কারওয়ান বাজার, ঢাকা ১২১৫। (খামের ওপর লিখুন ‘পাঠকের প্রশ্ন’)
ফেসবুক পেজ: fb.com/Adhuna.PA